শহীদ ডা. মিলনের নিঝুম মুখচ্ছবি

১৯৯০ এর ৬ ডিসেম্বর স্বৈরশাসক এরশাদের পতন ঘটে। তার ঠিক কয়েকদিন আগেই ২৭ নভেম্বর টিএসসি’র মোড়ে স্বৈরশাসক এরশাদের লেলিয়ে দেয়া সশস্ত্র গুন্ডাবাহিনীর গুলিতে শহীদ হন ডা. শামসুল আলম খান মিলন। এই গুন্ডাবাহিনীর প্রধান হিসেবে সন্দেহ করা হয় গোলাম ফারুক অভি এবং তার দলবলকে।

মিলন তখন ছিলেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের প্রভাষক। রাজনীতির দিক থেকে ছিলেন জাসদপন্থী। সাংগঠনিক দিক থেকে ছিলেন বাংলাদেশ মেডিক্যাল এসোসিয়েশন এর যুগ্ম-সম্পাদক। ডা. মিলনের জন্ম ১৯৫৭ সালের ২১ অগাস্ট। নটরডেম কলেজের সাবেক এই ছাত্র ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে ১৯৮৩ সালে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করে চিকিৎসা পেশায় যোগ দেন।

নব্বইয়ে এরশাদবিরোধী আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন শেষ চেষ্টা হিসেবে গোলাম ফারুক অভিকে কারাগার থেকে বের করে আনা হয়। তাকে সন্তানতুল্য সম্বোধন করে, উপহার সামগ্রী প্রদান করে, বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক আন্দোলন ভণ্ডুল করার দায়িত্ব প্রদান করেন এরশাদপত্নী। অভিকে সরকারি এজেন্টরা পর্যাপ্ত অস্ত্রও সরবরাহ করে। এটাই সে সময়ের সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য জনশ্রুতি।

ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন ডাক্তারদের পেশাগত রাজনীতিতে একটি সুপরিচিত নাম। টিএসসি মোড়ের সেদিনের পরিস্থিতি সম্পর্কে সঠিকভাবে অবগত ছিলেন না ডা. মোস্তফা জালাল। চোখ-কান খোলা রাখা এবং সবসময় আন্দোলনের গতি প্রকৃতির উপর নজর রাখা ডা. জালাল ধারণাও করতে পারেননি যে এমনটি ঘটে যাবে। নিরাপত্তাহীন ছিলেন তিনি নিজেও। অনেকেই বলেন জালাল এবং মিলন দুজনকেই নিকেশ করার চেষ্টা করেছিল এরশাদের গুন্ডাবাহিনী। ভাগ্যক্রমে ডা. জালাল বেঁচে যান।

ডা. জালাল এবং ডা. মিলন ছিলেন দুটি আলাদা রিকশায়। টিএসসি’র মোড়ে মিলনকে দেখতে পেয়ে জালাল বললেন- মিলন আমার রিকশায় চলে এসো, একসাথে যাই। মিলন নিজের রিকশা ছেড়ে দিয়ে জালালের সাথে একই রিকশায় চড়ে বসেন। রিকশা কিছুদূর যেতেই মিলন বলে ওঠেন- “জালাল ভাই, দেখেন তো, আমার কী হয়েছে”। ডা. জালাল দেখতে পান ডা. মিলনের শরীর রক্তে ভেসে যাচ্ছে। মিলন গুলিবিদ্ধ। তাকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সহকর্মী চিকিৎসকদের আপ্রাণ চেষ্টার পরও তাকে বাঁচানো যায়নি। নিজের কর্মক্ষেত্রেই সহকর্মীদের হাতের উপর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন তিনি।

তার মৃত্যুতে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলন দাবানলে রূপ নেয়। ডাক্তাররা শুরু করেন অবিরাম কর্মবিরতি। গণপদত্যাগ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। জরুরি অবস্থা জারি করে স্বৈর সরকার। কিন্তু সেই জরুরি অবস্থা ভঙ্গ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে আসে ছাত্রছাত্রীদের মিছিল। নয় বছরের রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পেয়ে মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে ঢাকার রাস্তায় বেরিয়ে আসেন নাগরিকরা। সারাদেশে বিভিন্ন জায়গায় নিরাপত্তারক্ষীদের সাথে সংঘর্ষে প্রাণ দেন আরও অনেকে। এভাবেই মিলনের মৃত্যুর ভিতর দিয়ে এরশাদের পতনের শেষ অধ্যায় রচিত হয়। ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন এরশাদ।

বাংলাদেশে চিকিৎসা পেশা নেহায়েতই অর্থ রোজগারের পেশা নয়। এটা একজন চিকিৎসকের জন্য রীতিমত ব্যক্তিগত এবং যৌথ সংগ্রামের বিষয়। এ বিষয়ে ডাক্তার মিলন সবসময়ই সচেতন ছিলেন। সবাই যে একই মাত্রায় পেশাগত ভূমিকা রাখতে পারছেন তা নয়। কিন্তু রোগীর প্রতি সহানুভূতিশীল, পেশার প্রতি সংবেদনশীলতা এবং ক্রমাগত উচ্চতর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জনগণকে সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। রাষ্ট্রের দিক থেকেও নতুন নতুন মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং বিশেষায়িত ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠা ডাক্তার মিলনের আত্মত্যাগেরই ফসল বললে ভুল বলা হবে না। কারণ, সামরিক শাসনের সময় অপ্রয়োজনীয় খাতে যে ব্যয় হতো সেটা কমিয়ে এনে জনকল্যাণে ব্যয় করার জন্য সকল মহলের দিক থেকেই চাপ অব্যহত ছিল। বাংলাদেশের চিকিৎসক সমাজও সেই আন্দোলনের পুরোভাগেই ছিলেন। জাতীয় ঔষধ নীতি কিংবা স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে তারা তাদের জোরালো মতামত রেখেছেন। ডা. মিলন ছিলেন জনমুখী একটি জাতীয় চিকিৎসা ব্যবস্থা আন্দোলনের অগ্রবর্তী একজন। তিনি জানতেন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ছাড়া সেই লক্ষ্যে পৌঁছানো অসম্ভব।

মিলন নিহত হওয়ার দিন সন্ধ্যাতেই রমনা থানায় একটি মামলা দায়ের হয়। তখন শাহবাগ থানা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। পুলিশি তদন্তের এক পর্যায়ে গোয়েন্দা কর্মকর্তা বাতেন তদন্তের দায়িত্ব পান। পরবর্তীতে বাতেন-এর হাত থেকে তদন্ত ন্যস্ত হয় ফজলুল করিমের উপর। ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি আলাদত চার্জ গঠন করেন। তদন্ত কর্মকর্তা ফজলুল করিম ৩১ জনকে সাক্ষী করে চার্জশীট প্রদান করেন। কিন্তু আদালত ১৪ জন সাক্ষীকে বৈরী ঘোষণা করেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন এবং অনেক সাক্ষী আদালতে বৈরী ঘোষিত হওয়ায় এটা স্পষ্ট বুঝা যায় যে তদন্ত ছিল প্রভাবিত এবং নিরপেক্ষতাহীন।

মিলনের কোন হাস্যোজ্জ্বল ছবি আমাদের চোখে পড়ে না সহজে। হয়তো পারিবারিক অ্যালবামে আছে। মিলন দেশ নিয়ে, মানুষ নিয়ে চিন্তিত একজন নিঝুম মুখের মানুষ। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় স্থাপিত মিলন স্মারক ভাস্কর্যে যথার্থভাবেই লেখা হয়েছে- নিঝুম স্থাপত্য আজ মিলনের প্রতিবাদী মুখ।

কিন্তু মিলন স্মারক ভাস্কর্যের অযত্ন রীতিমত চোখে পড়ার মত। শহীদের সম্মান তো একদিনের নয়, প্রতিদিনের, প্রতি মুহূর্তের। মিলন স্মারক ভাস্কর্যের চাই সঠিক যত্ন- যেন পথিকের চোখ পড়ে, নত হয়ে আসে মাথা। মিলনের ত্যাগের কাছে আমরা নতমস্তকে কৃতজ্ঞতা জানাই।