প্রভাবশালী নেতা, মন্ত্রী-এমপির নিয়ন্ত্রণ: তৃণমূল আ’লীগে পকেট কমিটি

সম্মেলনের মাধ্যমে তৃণমূল আওয়ামী লীগে স্বচ্ছ ভাবমূর্তির নেতাদের নিয়ে কমিটি গঠনে হাইকমান্ডের নির্দেশনা মানছেন না দায়িত্বপ্রাপ্ত অধিকাংশ নেতা। তারা স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা, এমপি-মন্ত্রীদের আস্থাভাজন ও বলয়ভিত্তিক নেতাদের কমিটিতে স্থান দিচ্ছেন।

এতে বাদ পড়ছেন দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ত্যাগী নেতাকর্মীরা। এসব কমিটির মাধ্যমে প্রভাবশালীদের হাত ভারি হচ্ছে। তৃণমূলে শেখ হাসিনার নিবেদিতপ্রাণ কর্মী ও শক্তি দুটোই কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সার্বিকভাবে দলের কোনো লাভ হচ্ছে না।

এ ধরনের কমিটি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সোমবার কুষ্টিয়ার খোকসা-কুমারখালীতে দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। লালমনিরহাটে এই ইস্যুতে দু’পক্ষের সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ গুলি ও টিয়ারগ্যাস ছুড়েছে। সিলেট সদর উপজেলায় দফায় দফায় বৈঠক করেও কমিটি করা সম্ভব হয়নি।

২০ নভেম্বর সম্মেলনকে কেন্দ্র করে নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী শহিদ উল্যাহ খান সোহেল ও বর্তমান সাধারণ সম্পাদক একরামুল করিম চৌধুরী এমপির সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এ সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

১৬ নভেম্বর কমিটি ঘোষণা নিয়ে ফরিদপুরের নগরকান্দা-সালথা উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে সংঘর্ষে সম্মেলন স্থগিত করে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ। নগরকান্দার কেদালিয়া স্কুলমাঠে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

বেশিরভাগ এলাকায় নির্বাচন পাশ কাটিয়ে পকেট কমিটি ঘোষণা দেয়ায় স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরোধ চলছে। সারা দেশে তৃণমূল আওয়ামী লীগের সম্মেলনের খোঁজ নিয়ে জানা গেছে এসব তথ্য।

আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা গেছে, দলে স্বচ্ছ ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনতে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত ব্যাপক পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ইতিমধ্যে তিনি চাঁদাবাজ, টেন্ডার ও দখলবাজ, ক্যাসিনো-জুয়া কারবারি, মাদক ব্যবসায়ী, দলে ও সরকারে বিভেদ সৃষ্টিকারীসহ নানা অপকর্মে জড়িতদের দলে জায়গা দেয়া হবে না বলে উল্লেখ করেন।

আওয়ামী লীগের বিভাগীয় ৮ সাংগঠনিক টিমের নেতাদের এ নির্দেশনা মেনে তৃণমূল কমিটি গঠনের নির্দেশনাও দেয়া হয়। একই সঙ্গে তৃণমূলে সৎ, আদর্শবান, জনপ্রিয় ও স্বচ্ছ ভাবমূর্তির নেতাদের নিয়ে কমিটি গঠনের কথা বলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি।

কিন্তু নানা কারণে সেই নির্দেশ পালন করছেন না, কিছু কিছু ক্ষেত্রে করতে পারছেন না সংশ্লিষ্ট নেতারা। অধিকাংশ স্থানে দলীয় নেতাকর্মীদের প্রত্যাশিত ভোটের মাধ্যমে কমিটি দেয়া হচ্ছে না। উল্টো স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা, এমপি ও মন্ত্রীদের ইচ্ছামাফিক চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে ঘোষিত কমিটি।

এতে ত্যাগী ও নিবেদিতপ্রাণ আওয়ামী লীগ কর্মীরা হতাশ ও কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন। ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছেন বহুদিনের পরীক্ষিত রাজপথের নেতাকর্মীরা। দলের একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দল এবং সরকারকে আলাদা করার ঘোষণার কথা অনেক দিন ধরেই বলা হচ্ছে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে এবার জেলা-উপজেলা কমিটিগুলোর শীর্ষ দুই পদ থেকে স্থানীয় এমপিদের দূরে রাখার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। এ ধরনের প্রচারণার পর থেকেই মূলত তৃণমূলে পকেট কমিটি দেয়ার প্রবণতা বেড়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য কমিটিতে থাকতে না পারলে তার বিরোধী পক্ষ পদে চলে আসতে পারে।

এতে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দেয়ার আশঙ্কা আছে। এ বিষয়টি মাথায় রেখে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তার আস্থাভাজনদের কমিটিতে রাখার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এ কারণেই কর্মীদের দাবি সত্ত্বেও ভোটে না গিয়ে আলোচনার মাধ্যমে কমিটি দেয়ার চেষ্টা করছেন দায়িত্বপ্রাপ্তরা। এতে অনেক এলাকার জনপ্রিয়, সৎ, নিষ্ঠাবান নেতা বাদ পড়ছেন।

দায়িত্ব পাচ্ছেন এমপির আস্থাভাজনরা। জনপ্রিয় নেতাকে বাদ দিয়ে অন্যদের পদ দেয়ায় বিরূপ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে এমন শঙ্কায় দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা তাৎক্ষণিকভাবে কমিটি ঘোষণা করছেন না।

তারা ওই এলাকা থেকে ফিরে জেলা, উপজেলা বা ঢাকায় এসে বিভিন্ন পদে নেতাদের নাম ঘোষণা করছেন। ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা পর্যায়ে এ ধরনের চাপানো কমিটি বেশি হচ্ছে। তৃণমূল আওয়ামী লীগের এই চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্ত ধীরে ধীরে সহযোগী ও ভাতৃপ্রতিম সংগঠনে সংক্রমিত হচ্ছে।

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক টিমের একাধিক নেতা যুগান্তরকে বলেন, তৃণমূল কমিটি নিয়ে স্থানীয় বর্তমান ও সাবেক এমপিদের মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রকট। তারা কেউ কাউকে ছাড় দিতে চায় না। সাবেক এমপিরা চান- দলে পদ নিয়ে এমপিকে কোণঠাসা করে রাখতে।

এমপি চান মূল স্রোতে পুরনোদের আনলে নিজস্ব কাজ বাধাগ্রস্ত হবে। স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাবশালী নেতাদের দ্বন্দ্বে ভোটের পরিবেশও বিনষ্ট হচ্ছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় কেন্দ্রীয় নেতারাও দু’ভাগ হয়ে পড়ছেন। এতে দলকে কলুষমুক্ত করার ক্ষেত্রে দলের হাইকমান্ডের যে প্রত্যাশা, তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সোমবার টেলিফোনে যুগান্তরকে বলেন, তৃণমূল সম্মেলনে প্রার্থীরা সমঝোতায় এলে দোষ কোথায়? যেখানে সমঝোতা হচ্ছে না সেখানে তো ভোট হচ্ছে। আমাদের দলের নিয়মটা এমনই। অতীতে যেভাবে নেতা নির্বাচিত হয়েছে, এখনও সেভাবেই হচ্ছে। আর প্রভাবশালীদের প্রভাবের কথা ঠিক না।

সিলেকশনের বিষয়ে তিনি বলেন, তৃণমূলের সব জায়গায় আমরা সিলেকশনের মাধ্যমে দলীয় কমিটি দিচ্ছি না। ঐকমত্য হলে সেখানে তাদের মতো করেই একজনের নাম ঘোষণা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, আজ (সোমবার) বান্দরবানেও একইভাবে কমিটি গঠিত হয়েছে। সভাপতি পদে একাধিক প্রার্থী না থাকায় একক প্রার্থীকেই ঘোষণা করা হয়েছে।

সাধারণ সম্পাদক পদে প্রার্থী ছিল চারজন। তাদের সমঝোতা করতে বলা হয়েছে। তারা সমঝোতা করে একজনকে চূড়ান্ত করলে তার নাম ঘোষণা করা হয়। আর সব জায়গায় না চাইলে ভোট করতে হবে কেন? যেখানে দরকার সেখানেই শুধু ভোট হবে। ফেনীতে সভাপতি পদে ভোট হয়েছে।

সাধারণ সম্পাদক বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হয়েছে। সিলেকশনে আমাদের দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। দলীয় নির্দেশনা সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য। যোগ্যরাই কমিটিতে আসছে। এ নিয়ে অভিযোগের সুযোগ নেই।

তৃণমূল সূত্রে জানা যায়, অধিকাংশ স্থানে কমিটি গঠন করতে গিয়ে উপজেলা, জেলা কিংবা কেন্দ্রীয় নেতারা আদর-আপ্যায়নে ডুবে থাকছেন। স্থানীয় এমপি-মন্ত্রীর আশীর্বাদপুষ্ট নেতা এসবের আয়োজন করেন। পরে নেতাকর্মীদের প্রত্যাশিত নির্বাচন বন্ধ করে প্রভাবশালীদের সুপারিশে কমিটি দেয়া হচ্ছে।

কিছু এলাকায় কমিটি ঘোষণা না করেই ফিরে আসেন নেতারা। পরে উপজেলা, জেলা এমনকি ঢাকা থেকে প্রভাবশালী নেতাদের ইচ্ছামতো কমিটি ঘোষণা করা হয় যা তৃণমূলের মতামতের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

সোমবার কুষ্টিয়া জেলার খোকসা উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে সিলেকশনে কমিটি গঠন করা হয়েছে। এতে সভাপতি বাবুল আক্তার এবং সাধারণ সম্পাদক ও খোকসা পৌরসভা মেয়র তারিকুল ইসলামের নাম ঘোষণা করেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সদর উদ্দিন খান।

এ সময় পাশেই বসে ছিলেন আওয়ামী লীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাইদ আল মাহমুদ স্বপন, বন ও পরিবেশ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন, কার্যনির্বাহী সংসদ সদস্য এসএম কামাল। সম্মেলনের মাধ্যমে ঘোষিত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতির আস্থাভাজন।

সম্মেলনে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সদর উদ্দিন খান ও কুষ্টিয়া-৪ (খোকসা-কুমারখালী) আসনের সংসদ সদস্য সেলিম আলতাফ জর্জের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে কমপক্ষে ১৫ জন আহত হন এবং খোকসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তারা চিকিৎসা নেন।

উপজেলা আওয়ামী লীগের একজন সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, উপজেলা সম্মেলনে নেতাকর্মীদের একটাই দাবি ছিল- ভোটের মাধ্যমে নেতা নির্বাচিত করা।

কিন্তু কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতিতে জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি সদর উদ্দিন খান তার নিজের মতো করে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণা করেন। বিষয়টি আমরা কেউ মেনে নিতে পারিনি। কেন্দ্রীয় নেতাদের সামনে মুখ চেপে সহ্য করলেও অন্য নেতাকর্মীদের মধ্যে চাপা ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

সবার সমঝোতা সিদ্ধান্তের মাধ্যমে খোকসা উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে জানিয়ে খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাইদ আল মাহমুদ স্বপন সোমবার যুগান্তরকে বলেন, একাধিক প্রার্থী থাকলেও সেখানে সমঝোতা হয়।

আমরা প্রথমে সমঝোতার চেষ্টা করি। কাজ না হলে ভোটের প্রস্তুতি ছিল। কিন্তু খোকসা উপজেলায় সমঝোতা হওয়ায় ভোটের প্রয়োজন হয়নি।

আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিলকে ঘিরে ইতিমধ্যে দলটির চারটি সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কৃষক লীগ, শ্রমিক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও যুবলীগে দ্বিতীয় অধিবেশনে আলোচনার মাধ্যমে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক পদে নেতার ঘোষণা দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।

এদিকে সোমবার সিলেট সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন হলেও কমিটি ঘোষণা হয়নি। কমিটি গঠনে কাউন্সিলরদের মতামত প্রাধান্য না দিয়ে সমঝোতার চেষ্টা করেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র:যুগান্তর