রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর গণহত্যা : অবশেষে আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা

রাখাইনে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর গণহত্যা চালানোর জন্য জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালতে বিচারের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে মিয়ানমার। নেদারল্যান্ডসের হেগে ‘দি ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস’ (আইসিজে)-এ মিয়ানমারের বিরুদ্ধে এ মামলা করেছে ওআইসিভুক্ত দেশ গাম্বিয়া। সোমবার (১১ নভেম্বর) গাম্বিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল আবুবকর তামবাদউ বিষয়টি জানিয়েছেন।

হেগ-এ অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে তামবাদউ বলেন, ‘জেনোসাইড কনভেনশনের আওতায় আমরা মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা করেছি। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা সংক্রান্ত আবেদনও জমা দিয়েছি আমরা।’

এ সময় তিনি আরও বলেন, ‘মিয়ানমারকে তার নিজ দেশের মানুষ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আচরণের জন্য জবাবদিহি করানোই আমাদের লক্ষ্য। আমাদের চোখের সামনে গণহত্যা হবে, আর আমরা তা দেখেও কিছু না করলে আমাদের প্রজন্মের জন্য তা খুবই লজ্জার ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে।’

যেসব বেসরকারি সংস্থা এ উদ্যোগকে সমর্থন করছে তাদের মধ্যে আছে নো পিস উইদাউট জাস্টিস, ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর কন্সটিটিউশনাল অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস, দি ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন ফর হিউম্যান রাইটস, গ্লোবাল জাস্টিস সেন্টারে ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো সংস্থাগুলো।

ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অফ জাস্টিস বা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে প্রথম জেনোসাইড কনভেনশন মামলা হয়েছিলো সার্বিয়ার বিরুদ্ধে ১৯৯৩ সালে এবং তাতে প্রমাণ হয়েছিলো যে সার্বিয়া বসনিয়া হার্জেগোভিনিয়ায় গণহত্যা প্রতিরোধে ব্যর্থ হয়েছিলো।

কানাডা, বাংলাদেশ, নাইজেরিয়া, তুরস্ক এবং ফ্রান্স জোর দিয়ে বলেছে যে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার গণহত্যা চালিয়েছে। ইসলামী দেশসমূহের সংগঠন ওআইসি তার ৫৭টি সদস্য দেশকে উৎসাহিত করেছে যেন তারা মিয়ানমারকে আদালতে নিয়ে আছে।

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীও অভিযোগ করেছেন যে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা চালিয়েছে এবং তিনিও মিয়ানমারকে আদালতে তোলার প্রয়াস নেবার আহ্বান জানান।

রাখাইনে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর জাতিগত নিধন, গণহত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করেছে ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসির) সদস্য গাম্বিয়া। সোমবার জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালতে মিয়ানমারকে বিচারের মুখোমুখি করতে এই মামলা করা হয়েছে।

এদিকে, গাম্বিয়ার এমন পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে কানাডার তরফ থেকে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর সহিংসতা, যৌন নিপীড়ন, ঘৃণামূলক বক্তব্য, গণহত্যা, পদ্ধতিগত বৈষম্যের বিরুদ্ধে এই পদক্ষেপ মিয়ানমারকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে সহায়তা করবে। বিশেষ করে ২০১৭ সালের আগস্টে রোহিঙ্গাদের ওপর দমন নিপীড়নের কথা তুলে ধরা হয়েছে।

গাম্বিয়া ও মিয়ানমার দুটি দেশই ১৯৪৮ সালের জেনোসাইড কনভেনশনে স্বাক্ষর করেছে। কনভেনশন অনুযায়ী সদস্য দেশগুলো শুধু গণহত্যা থেকে বিরত থাকাই নয়, বরং এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধ করা এবং এমন অপরাধের জন্য শাস্তি বিধানেও বাধ্য।

এই মামলায় গাম্বিয়াকে আইনি সহায়তা দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ফোলে হোয়াগ। প্রতিষ্ঠানটির আশা, আগামী মাসেই এই মামলার প্রথম শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের মুখোমুখি হচ্ছে মিয়ানমার।

এর আগে জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যার জোরালো প্রমাণ তুলে ধরা হয়। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে কানাডার হাউস অব কমন্সে ওই প্রতিবেদনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের গণহত্যার বিষয়টিকে স্বীকৃতি দেয়া হয়।

গাম্বিয়ার এমন পদক্ষেপে তাদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে কানাডার তরফ থেকে বলা হয়েছে, আমাদের অংশীদারদের সঙ্গে একত্রে থেকে আমরা গাম্বিয়ার এমন পদক্ষেপকে সমর্থন করে যাব।

তাছাড়া আন্তর্জাতিক আদালতের বিধি অনুসারে, জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত এক দেশ অন্য দেশের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গের অভিযোগ তুলতে পারে।
গাম্বিয়ার দায়ের করা ৪৬ পৃষ্ঠার আবেদনে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রাখাইনে গণহত্যা, ধর্ষণ ও তাদের আবাস ধ্বংসের অভিযোগ আনা হয়েছে।

যদি আন্তর্জাতিক আদালত এ মামলা বিচারের জন্য গ্রহণ করে, তবে রোহিঙ্গাদের হত্যা-নিপীড়নের জন্য সমালোচনার মুখে থাকা মিয়ানমার প্রথম আন্তর্জাতিক কোনো আদালতে বিচারের মুখোমুখি হবে।

২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সমর্থিত স্বাধীন আন্তর্জাতিক তথ্য-অনুসন্ধানী মিশন সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে “গণহত্যা ঠেকানো, তদন্ত করা এবং এর শাস্তির আইন করার ক্ষেত্রে তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে মিয়ানমার।
Source:USB