নিজ ভূমে পরবাসী : সাজ্জাদুল হাসান

জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত মানবাধিকার সনদের ১৫ ধারায় সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, প্রত্যেকের‌ই একটি জাতীয়তার অধিকার রয়েছে। এই ধারায় আরও বলা হয়েছে, কা‌উকে‌ই যথেচ্ছভাবে তাঁর জাতীয়তা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না, কিংবা কারো জাতীয়তা পরিবর্তনের অধিকার অগ্রাহ্য করা যাবে না।

প্রায় ৭১ বছর আগে ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর মানবাধিকারের এই সার্বজনীন ঘোষণাপত্র সর্বসম্মতিক্রমে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে পাস হয়। ৪৮টি দেশ এই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়। যদিও এই ঘোষণাপত্রের বিরুদ্ধে কোনো ভোট পড়েনি তবে আটটি দেশ- তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন, ইউক্রেন, বেলারুশ, যুগোস্লাভিয়া, পোল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, চেকোস্লোভাকিয়া এবং সৌদী আরব ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকে।

বিশ্বের সকল মানুষের জাতীয়তার অধিকারের সুস্পষ্ট অঙ্গীকার থাকা সত্ত্বেও বাস্তব অবস্থা ভয়াবহ। জাতিসংঘ শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার (ইউএনএইচসিআর) এর এক হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় এক কোটি মানুষ জাতিহীন। অর্থাৎ, কাগজে-কলমে তাদের কোনো জাতীয়তা নেই, এরা কোনো দেশের বৈধ নাগরিক নয়। এই সমস্ত অসহায় মানুষদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ নিজ জন্মভূমি থেকে বিতাড়িত হয়ে শরণার্থী হয়ে বাস করছে অন্য দেশে, অথবা নিজ দেশেই এরা যাপন করছে মানবেতর এক জীবন।

দুঃখজনকভাবে, এই অসহায় জনগোষ্ঠীর অর্ধেকেরও বেশি ফিলিস্তিনি। ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের ত্রাণ কার্য পরিচালনার জন্য জাতিসংঘ কর্তৃক গঠিত ইউএনআরডব্লিউএ (UNRWA) এর এক হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৫৫ লাখ ফিলিস্তিনি কার্যত জাতিহীন। কেউ কেউ মনে করেন, এই সংখ্যা ৮০-৯০ লাখ পর্যন্ত হতে পারে! দুর্ভাগ্যজনক সত্য হচ্ছে, যে ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ মানবাধিকার সনদ ঘোষণা করে সেই বছরই শুরু হয় ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মপরিচয় বিলীন হওয়ার ইতিহাস। অথচ হাজার বছর ধরে ওই ভূখণ্ডে ছিল তাদের বসবাস। করুণ এই ইতিহাসের শুরুটা জানতে আমাদের তাকাতে হবে একটু পেছন ফিরে।

ফিলিস্তিন নামক এই জনপদ ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। মুসলমান, খ্রিস্টান ও ইহুদী- এই তিন ধর্মাবলম্বীদের কাছে ফিলিস্তিনের জেরুজালেম নগরী অত্যন্ত পবিত্র স্থান হিসাবে স্বীকৃত। মুসলমানদের প্রথম কিবলা মসজিদুল আল- আকসা এই জেরুজালেমে অবস্থিত। খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের মতে, জেরুজালেম যীশু খ্রিস্টের পবিত্র জন্মস্থান। আর ইহুদীরা মনে করেন, এ ভূখণ্ড ঈশ্বর কর্তৃক প্রতিশ্রুত ভূমি।

ইউরোপে বসবাসকারী ইহুদীরা গত শতকের শুরুতে বেশ অত্যাচার আর নির্যাতনের শিকার হয়। এরই প্রেক্ষিতে তারা একটি পৃথক ইহুদী রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনা করে, যার সূত্র ধরে শুরু হয় “হোভেভেই জিওন” (জিওনের জন্য ভালোবাসা) নামের আন্দোলন যেটি ‘জিওনিজম’ নামে খ্যাত। জেরুজালেমের উপকণ্ঠে অবস্থিত বিখ্যাত পাহাড় জিওনের নাম অনুসারে আন্দোলনের নামকরণ করা হয়। জিওনিজম দ্বারা উজ্জীবিত হয়ে বহু ইহুদী ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে ফিলিস্তিনে অভিবাসন করে। এক হিসাবে দেখা যায় ১৯০২ থেকে শুরু করে ১৯৪৭ এই ৪৫ বছরে পাঁচ পর্যায়ে প্রায় পাঁচ লক্ষ ইহুদী ফিলিস্তিনে বসবাস শুরু করে। ইহুদী অভিবাসীদের সংখ্যা বাড়তে থাকায় স্থানীয় ফিলিস্তিনি জনগণের মধ্যে অসন্তোষ দানা বাঁধতে থাকে যা ধীরে ধীরে সংঘাতে রূপ নেয়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে তৎকালীন লীগ অব নেশনস ব্রিটেনকে ফিলিস্তিন শাসনের ম্যান্ডেট দেয়। এদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের নাৎসি বাহিনী শুরু করে ব্যাপক ইহুদী নিধন। ১৯৪১ থেকে ১৯৪৫ এই পাঁচ বছরে প্রায় ষাট লাখ ইহুদীকে হত্যা করা হয়। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড হলোকাস্ট হিসাবে ইতিহাসে সুবিদিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ইহুদীদের জন্য একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র গঠনের প্রাসঙ্গিকতা আরও জোরালোভাবে উপস্থাপিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধান কল্পে ১৯৪৭ সালের মে মাসে গঠিত হয় ইউএনএসসিওপি (UNSCOP – United Nations Special Committee on Palestine)। এই কমিটি ১৯৪৭ সালের নভেম্বর মাসে সাধারণ পরিষদে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করে। ফিলিস্তিনকে বিভক্ত করে ইসরায়েল, ফিলিস্তিন আর জেরুজালেম এই তিনটি স্বাধীন ভূখণ্ড গঠনের প্রস্তাব করা হয়। জনসংখ্যার ভিত্তিতে ফিলিস্তিনিরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। ওই সময়ে মোট ২০ লাখ জনসংখ্যার তিন চতুর্থাংশ অর্থাৎ ১৫ লাখ ছিল স্থানীয় আরব মুসলিম আর অবশিষ্ট প্রায় ৫ লাখ ছিল অভিবাসী ইহুদী জনগোষ্ঠী। অথচ দেশ বিভাগের প্রস্তাবে মোট ভূমির প্রায় ৫৭ ভাগ দেয়া হলো ইসরায়েলকে আর ফিলিস্তিনের জন্য প্রস্তাব করা হলো ৪০ শতাংশের কিছু বেশি। এই প্রস্তাবের পক্ষে অবস্থান নেয় ৩৩টি দেশ, ১৩টি দেশ বিরোধিতা করে আর ভোটে বিরত থাকে ১০টি দেশ। ১৯৪৮ সালের ১৪ মে স্বীকৃতি লাভ করে ইসরায়েল নামের নতুন এক রাষ্ট্র।

ফিলিস্তিনি জনগণ তথা বেশিরভাগ আরব রাষ্ট্র স্বভাবতই জাতিসংঘের এই অসম প্রস্তাব মেনে নেয় নি। ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার ঠিক পরের দিন অর্থাৎ ১৫ মে মিশর, জর্দান, সিরিয়া ও ইরাক এই চারটি দেশ সম্মিলিতভাবে আক্রমণ চালায় অখণ্ড ফিলিস্তিনে। শুরু হয় এক রক্তাক্ত যুদ্ধ! জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় ১১ জুন যুদ্ধ বিরতিতে রাজি হয় উভয় পক্ষ। তবে এই যুদ্ধে ব্যাপক ক্ষতি সাধন হয় ফিলিস্তিনি জনগণের। ইহুদী বাহিনী সাত লাখেরও বেশি ফিলিস্তিনিকে তাদের বাড়ি-ঘর থেকে উচ্ছেদ করে। আর এই অসহায় মানুষগুলো আশ্রয় নিতে বাধ্য হয় প্রতিবেশী দেশগুলোতে। ফিলিস্তিনিদের জন্য যে অঞ্চলটি প্রস্তাব করা হয়েছিল তার অর্ধেকেরও বেশি চলে যায় ইসরায়েলের দখলে।

এটি ছিল ফিলিস্তিন আর ইসরায়েলের মধ্যে প্রথম যুদ্ধ যার মধ্য দিয়ে শুরু হয় ফিলিস্তিনিদের দুর্ভাগ্যজনক এক জাতীয় বিপর্যয়। ফিলিস্তিনিরা এই যুদ্ধকে অভিহিত করে ‘নাকাবা’ (বিপর্যয়) হিসাবে। ১৯৬৫ সালে আরব ইসরায়েলের মধ্যে সংঘটিত হয় আরেকটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। এই যুদ্ধেও ইসরায়েল ব্যাপকভাবে জয় লাভ করে। দখল করে নেয় মিশরের নিয়ন্ত্রণে থাকা গাজা এবং সিনাই উপদ্বীপ, জর্দানের কাছ থেকে দখল করে পূর্ব জেরুজালেম সহ পশ্চিম তীর; আর সিরিয়ার কাছ থেকে দখল করে গোলান মালভূমি। প্রায় পাঁচ লাখ ফিলিস্তিনি বিতাড়িত হয় তাদের বাস্তুভিটা থেকে।

এর পরেও বিভিন্ন সময়ে দুই পক্ষের মধ্যে চলেছে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। গত বছর ১৪ মে ভয়াবহ সহিংসতা ঘটে ইসরায়েল অধ্যুষিত গাজায়। নিহত হয় অর্ধশতকের বেশি আর আহত হয় কয়েক হাজার ফিলিস্তিনি। কোটি টাকার প্রশ্ন – এই সংঘাতের শেষ কোথায়?

বিগত সাত দশকের ধ্বংসাত্মক সংঘর্ষ কারো জন্যই সুখকর হয় নি। এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, সব পক্ষের আন্তরিকতা আর আলোচনার টেবিলেই বেরিয়ে আসবে শান্তির বারতা। ১৯৯৩ সালে পিএলও আর ইসরায়েল সরকারের মধ্যে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক অসলো চুক্তি শান্তিকামী মানুষের মনে ব্যাপক আশার সঞ্চার করেছিল। এই চুক্তিকে ভিত্তি করে বিবাদমান সকল পক্ষ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন সহ আরব রাষ্ট্র সমূহের ইতিবাচক ভূমিকাই কেবল নিশ্চিত করতে পারে ফিলিস্তিন তথা মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি।

শান্তি ফিরে আসুক ফিলিস্তিনে, আত্মপরিচয় ফিরে পাক লাখো ফিলিস্তিনি, পবিত্র নগরী জেরুজালেম মুখরিত হোক সকল ধর্মের মানুষের প্রার্থনায়।