বুলবুলের আঘাতে সাতক্ষীরায় ১৬ হাজার বাড়ি বিধ্বস্ত

প্রবল শক্তি নিয়ে সাতক্ষীরার শ্যামনগরে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় বুলবুল। শনিবার রাত ৩ টার দিকে বুলবুলের আঘাতে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে সুন্দরবন ও তৎসংলগ্ন জনপদ।

শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. কামরুজ্জামান জানান, ঝড়ের দাপটে গাবুরা ইউনিয়নের ৮০ শতাংশ কাঁচা ও আধাপাকা ঘরবাড়ি বিধ্বস্থ হয়েছে। দুর্গাবাটি, দাঁতিনাখালি ও চৌদ্দরশি বাঁধ মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তিনি আরও জানান, নদীতে এ সময় ভাটা থাকলেও ঝড়ের তাণ্ডবে নদীর পানি বেড়িবাঁধ পর্যন্ত ছুঁয়ে যায়। জোয়ারে নদীর পানি বৃদ্ধি পেলে জরাজীর্ণ বেঁড়িবাধ ভেঙে জলোচ্ছ্বাসের আশংকা দেখা দেয়। তিনি আরও জানান, রাস্তায় গাছ পড়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। পুরো এলাকা বিদ্যুত ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
গাবুরা, পদ্মপুকুর, আটুলিয়া, কাশিমারিসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের শত শত একর চিংড়ি ঘের, আমনধান ও রবি শস্যের ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। তিনি আরও জানান, ঝড় না থামলে উদ্ধার তৎপরতা চালানো সম্ভব হচ্ছে না। এদিকে বুলবুলের আঘাতে কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি। তবে সকালে আশ্রয় কেন্দ্র থেকে বাড়ি ফেরার সময় সাতক্ষীরায় গাবুরায় আবুল কালাম নামের এক ব্যক্তি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। এ ছাড়া বাড়িঘর পড়ে আরো কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।

সাতক্ষীরা জেলা দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক এসএম মোস্তফা কামাল জানান, উপকুলীয় এলাকায় ১৬ হাজার ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। ইতিমধ্যে ২২ হাজার স্বোচ্ছাসেবক, বিজিবি, র‌্যাব, পুলিশ, নৌবাহিনী ও ১০০ জন সেনা সদস্য উপকুলীয় এলাকায় জানমাল রক্ষায় কাজ করছেন। এছাড়া সাতক্ষীরা-মুন্সিগঞ্জ সড়কে ঝড়ে ভেঙে পড়া গাছ সরিয়ে নিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনঃস্থাপনের জন্য সেনাবাহিনীকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
ঘূর্ণিঝড় বুলবুল’র আঘাতে এখন পর্যন্ত ৩ জন নিহত হয়েছেন। খুলনা জেলার দাকোপ ও দিঘলিয়ায় ১ জন করে, পটুয়াখালী জেলার মির্জাগঞ্জে ১ জন ও বরগুনা সদরে ১ জন ও সাতক্ষীরায় মৃত্যু বরণ করেছেন ১ জন।

খুলনা জেলার দাকোপ এলাকায় গাছ পড়ে নিহত হয়েছেন ১ জন। তার নাম প্রমীলা মণ্ডল, বয়স ৫২। তিনি দক্ষিণ দাকোপ গ্রামের সুভাষ মন্ডলের স্ত্রী। রাতে প্রমীলা মন্ডল দক্ষিণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সাইক্লোন শেল্টারে ছিলেন। সারারাত থাকার পর সকাল ৯টা-সাড়ে ৯টার দিকে নিজের বাড়িতে যান। এরপর একটি গাছ তার ওপরে পড়লে মৃত্যু হয় প্রমীলার।

আবার খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার গাছ পড়ে মৃত্যু হয়েছে একজনের। সেনহাটি গ্রামের বাসিন্দা আলমগীর হোসেন সকাল ৯টার দিকে বাসার পাশে অবস্থান করছিলেন।
এসময় একটি সজনে গাছ ভেঙে তার ওপরে পড়লে গুরুতর আহত হন তিনি। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে প্রথমে দিঘলিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। অবস্থার অবনতি হলে তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। এই গাছ চাপায় একই গ্রামের আবদুর রহমান নামে এক ব্যক্তি আহত হয়েছেন।

এদিকে পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে গাছের চাপায় আজ সকালে হামেদ ফকির (৬৫) নামে এক বৃদ্ধ মারা গেছেন। বৃদ্ধ উপজেলার মাধবখালী ইউনিয়নের উত্তর রামপুর গ্রামের মৃত ইয়াসিন ফকিরের ছেলে। থানা পুলিশ জানায়, ঘরের ওপর গাছ পরে তার মৃত্যু হয়।

আর বরগুনা সদর উপজেলার ডিএন কলেজ আশ্রয়কেন্দ্রে হালিমা খাতুন (৬৫) নামে এক বৃদ্ধা মারা গেছেন। তার বাড়ি সদর উপজেলার বানাই গ্রামে।

সাতক্ষীরার গাবুরায় সকালে আশ্রয় কেন্দ্র থেকে বাড়ি ফেরার সময় আবুল কালাম নামের এক ব্যক্তি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।
ঘূর্ণিঝড় বুলবুল-এর তাণ্ডবে লক্ষ্মীপুরের রামগতির চরগজারিয়া ও তেলিরচরে প্রায় অর্ধশতাধিক কাঁচা ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন রামগতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবদুল মোমিন। গাছপালা ও ঘরচাপা পড়ে আহত অন্তত: হয়েছে ১০ জন। আহতদের উদ্ধার করে স্থানীয় ক্লিনিকে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। আজ সকাল ৯টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।

চর আবদুল্লাহ ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান বেলাল হোসেনসহ প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, সকাল ৯টার দিকে হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় শুরু হয়। মূহুর্তের মধ্যে চরগজারিয়া ও তেলির চর এলাকায় ছোট-বড় অন্তত: ২৫টি ঘর বাড়ি বিধ্বস্ত হয়। শতাধিক গাছপালা উপড়ে ও ভেঙ্গে যায়।

এছাড়া নদীর জোয়ারের পানি বেড়ে কিছুকিছু এলাকায় ডুকে পড়েছে। পাশাপাশি ঝড়ো হাওয়া ও বৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে মেঘনার পানি স্বাভাবিকের চেয়ে ২-৩ ফুট উচ্চতায় বৃদ্ধি পেয়েছে।
হুমকির মুখে রয়েছে কমলনগর মাতাব্বরহাট এলাকার নদী তীর রক্ষা বাঁধ। পাশাপাশি বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় রবিশস্য ও ইটভাটার কাঁচা ইটের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করছে জেলা কৃষি বিভাগ ও স্থানীয়রা। তবে এখনও আশ্রয়ন কেন্দ্রে নিরাপদে রয়েছে বিভিন্ন চরাঞ্চলের প্রায় ৩০ হাজার মানুষ। পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত এসব মানুষদের আশ্রয়ন কেন্দ্র না ছেড়ে যেতে বলা হয়েছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরক্তি উপ-পরিচালক কিশোর কুমার মজুমদার জানান, ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের প্রভাবে বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় আমন ধান ও শীতকালীন সবজির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। ক্ষয়ক্ষতির নিরুপণের কাজ চলছে।