বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের বহিঃচত্বর , সনদ এবং কিছু কথা:সা কা ম আনিছুর রহমান খান

মানুষ জন্ম গ্রহণ করে অবয়ব নিয়ে। বেড়ে উঠার সাথে সাথে সে শিখতে থাকে এই পৃথিবীতে কিভাবে চলতে হবে। এভাবেই সে অর্জন করতে থাকে জ্ঞান। চলন বলল পোষাক আষাক এ সব বিষয়েই সে শিক্ষা লাভ করে। পরিবার ও সমাজ থেকে শুরু হয় তার শিক্ষা জীবন। জীবন যাপন ও জীবিকা অর্জনের জন্যও তাকে শিক্ষা অর্জন করতে হয়। এ জন্য তাকে যেতে হয় শিক্ষা অঙ্গনে। তাই শিক্ষাঙ্গনকে বলা মানুষ গড়ার আঙিনা। শিক্ষাঙ্গনগুলো আবার স্তরে স্তরে বিন্যস্ত। প্রাথমিক বিদ্যালয় , মাধ্যমিক বিদ্যালয় , উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় , মহাবিদ্যলয় ও বিশ্ববিদ্যালয়। আমাদের দেশে মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য রয়েছে উচ্চবিদ্যালয় সমূহ। উচ্চ মাধ্যমিক ও ¯স্নাতক ( পাস ও সম্মান ) শিক্ষার জন্য রয়েছে মহাবিদ্যালয় সমূহ। ¯স্নাতক সম্মান ও ¯স্নাতকোত্তর বিষয়ে শিক্ষা ও অধিকতর উচ্চশিক্ষার জন্য রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়। অনেক মহাবিদ্যলয়কে বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে রূপান্তরিত করে সেখানে স্নাতকোত্তর বিষয়ে পাঠ দানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বৈজ্ঞানিক ও কারিগরী শিক্ষার জন্য রয়েছে বিশেষায়িত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহ। বৃত্তিমূলক শিক্ষার জন্য রয়েছে পৃথক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

শিক্ষা মানুষের জন্মগত অধিকার। এর নিশ্চয়তা বিধানের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে সুস্পষ্টভাবে ঘোষিত হয়েছে ঃ ‘ রাষ্ট্র (ক) একই পদ্ধতির গণমুখি ও সার্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সকল বালক-বালিকাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা দানের জন্য ; (খ) সমাজের প্রয়োজনের সহিত শিক্ষাকে সঙ্গতিপূর্ণ করিবার জন্য এবং সেই প্রয়োজন সিদ্ধ করিবার উদ্দেশ্যে যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও সদিচ্ছায়িত নাগরিক সৃষ্টির জন্য ; (গ) আইনের দ্বারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিরক্ষরতা দূর করিবার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন। ’

সাংবিধানিক নির্দেশনা থাকলেও গণমুখি ও সার্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থা আমরা পরিপূর্নভাবে পাইনি। গ্রামীণ জনপদে মান সম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দেখা পাওয়া খুবই দুষ্কর। সরকারী পর্যায়ের পাশাপাশি বে-সরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও চলে আসছে। সচল ও স্বচ্ছল মহাবিদ্যালয় সমূহ সরকার প্রাদেশিকীকরণ করে পাকিস্তান আমলে। বে-সরকারী বিদ্যালয় মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকাগণ তাদের বেতন সরকার থেকেই পেয়ে থাকেন। তারপরও কিন্তু মান সম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের খোঁজে মানুষ তাদের সন্তান ও পোষ্যদেরকে রাজধানীতে পাঠায়। এতে রাজধানী শহর ঢাকা বাড়তি জন সংখ্যার ভারে ভারাক্রান্ত হচ্ছে। তবুও শিক্ষার জন্য মানুষের রাজধানীমুখি স্ত্রোত থামে নাই। অবস্থাপন্ন ও সামর্থবান পরিবারের সন্তান ও পোষ্যরা এজন্য যাচ্ছে বিদেশে।

সম্মানজনক কর্মসংস্থানের আশায় উচ্চ শিক্ষার প্রতি তরুন তরুনীরা আকৃষ্ট হচ্ছে। সরকারী বিশ্ববিদ্যালয় সমূহে আসন সংখ্যা সীমিত থাকায় অনেকেই ভর্তি হতে না পেরে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। যাদের আর্থিক সঙ্গতি নাই , তারা এখানেই লেখাপড়ার পাট চুকিয়ে দিচ্ছে । এই চাহিদার দিক বিবেচনা করেই কতিপয় শিক্ষাবিদ বে-সরকারী বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ নেন। সরকার এই উদ্যোগকে স্বাগত জানায় এবং আইনগত পথ তৈরী করে দেয়। শুরু হয় বে-সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের পথ চলা। আজকে সারা দেশে সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের চাইতে বে-সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাই অধিক। ছাত্র রাজনীতি না থাকায় এবং জবাবদিহিতার বিষয় কড়াকড়িভাবে অনুসরন করায় বে-সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন ‘সেসন জট’ নাই। সে কারণে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাত্র ছাত্রীরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই শিক্ষা জীবন শেষ করে প্রবেশ করছে কর্ম জীবনে। তাই অভিভাবকেরাও তাদের পোষ্যদেরকে বে-সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাচ্ছে শংকা মুক্ত মনে। জনগণের আকাংখা ও অভিব্যক্তি বিবেচনা করে অনেক বে-সরকারী বিশ্ববিদ্যালয় দেশের বিভিন্ন স্থানে বহিঃচত্বর চালু করে। ঢাকার বাইরে বসবাসকারী মধ্যবিত্ত নি¤œবিত্ত ঘরের সন্তান ও পোষ্যরা এর ফলে উচ্চ শিক্ষা লাভের সুযোগ পায়। এরই ফাঁকে অভিযোগ উঠে এসব বে-সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন কোনটা সনদ বিক্রির কার্যক্রম শুরু করেছে।ঢাকা ও ঢাকার সন্নিকটে নিজস্ব ক্যাম্পাসে অবস্থানকারী কোন কোন বে-সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধেও ‘সনদ’ বিক্রির সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে । এটা অত্যন্ত গর্হিত কাজ। এই অনৈতিক কাজ থেকে সংশ্লিষ্টদের বিরত রাখার জন্য সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন কার্যকরী ব্যবস্থা নেবে এটাই স্বাভাবিক। সেটা প্রথম অবস্থাতেই নেওয়া উচিত। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন এ বিষয়ে উদাসীন বলেই মনে হচ্ছে । তাদের এই উদাসীনতার পিছনে কোন রহস্যজনক কারণ রয়েছে বলে গুঞ্জন শোনা যায় ।

বহিঃচত্বর চালু হবার ফলে ঢাকার বাইরে বসবাসকারী মেধাবী ছাত্র ছাত্রীগণ উচ্চ শিক্ষা লাভের সুযোগ পায়। নি¤œবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান ও পোষ্যদের জন্য এটা একটা সুবর্ণ সুযোগের সৃষ্টি করে দেয় , উচ্চ শিক্ষা লাভের। বেশ কিছু দিন ধরে আওয়াজ উঠেছে বহিঃচত্বর সমূহ থাকবে না। এ নিয়ে অনেক কিছুই ঘটে যাচ্ছে। কিন্তু এই সব বহিঃচত্বর সমূহে অধ্যয়নরত ছাত্র ছাত্রীদের কথা কি কেউ একবার বিবেচনা করে দেখেছেন ? বহিঃচত্বর সমূহ চালু করা হয়েছে ব্যবসায়িক ভিত্তিতে। একজন পরিচালক এর দায়িত্বে থাকেন। আর্থিক স্বচ্ছলতাই তার এই যোগ্যতার মাপকাঠি। ব্যবসায়িক লাভ-ক্ষতির দিক হিসাব করেই তারা এই দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন এবং এই খাতে পুঁজি বিনিয়োগ করেছেন। ভর্তির সময়েও তারা অভিনব কৌশল অবলম্বন করে থাকেন। যার মাধ্যমে কোন ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি হবে তাদেরকে বলা হয় লিংক ম্যান। এই লিংকম্যানেরাই এরূপ কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রী ও তাদের অভিভাবকদেরকে উদ্বুদ্ধ করে ভর্তির জন্য। ভর্তি হলে লিংকম্যানেরা একটা কমিশন পায়। এ্টা নৈতিকভাবে কখনোই সমর্থন যোগ্য নয় ; তবুও এটা চলছে। এসব বহিঃচত্বরে ভর্তির জন্য স্থানীয় খবরের কাগজ সমূহে বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়। এদের শিক্ষার মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ২০০৯ খ্রিষ্টাব্দে একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের বহিঃচত্বরে আদালতের মোহরাররা অধ্যাপনা করছে বলে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের একটি রাজকীয় জেলায় মামলাও হয়েছিল। একজন ছাত্র সনদ না পেয়ে মামলা দায়ের করে , তখন মামলার বিপরীতে পাল্টা মামলাও হয়। এর শুনানীর সময়ে এরুপ অনেক তথ্য বেরিয়ে আসে।

সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে কোমলমতি ছাত্র ছাত্রীগণ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয় উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য। তাদের অভিভাবকেরা এজন্য অর্থ ব্যয় করেন অকাতরে , সন্তান ও পোষ্যদের ভবিষ্যৎ মঙ্গলের আশায়। বহিঃচত্বর হঠাৎ করেই বন্ধ হয়ে গেলে তাদের শিক্ষা জীবনের অতিবাহিত সময় ফিরিয়ে দেবে কে ? আবারও বলছি শিক্ষাঙ্গনের মান সমৃন্নত রাখা এবং এর অন্যথা হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়ে তা রোধ করা তো সরকার এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের দায়িত্ব। আগামী দিনের নাগরিকদের মনে প্রজ্জ্বলিত আশার আলো ম্লান হয়ে যাক এটা কখনোই কাম্য হতে পারে না। তাই বহিঃচত্বর বন্ধ করার কথা বিবেচনার সময় এতে অধ্যয়নরত ছাত্র ছাত্রীদের ভবিষ্যৎ শিক্ষা জীবন এবং পুনর্বাসনের বিষয়টিও সক্রিয় বিবেচনায় রাখতে হবে। এটাও খেয়াল রাখা দরকার ঢাকার বাইরে মফস্বল অঞ্চলে যে সমস্ত বহিঃচত্বর চালু করা হয়েছিল তাতে শিক্ষাদান করতেন মান-সম্মত শিক্ষাবিদ এবং অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ব্যক্তিগণ। শুধু পুঁথিগত বিদ্যাই নয় প্রায়োগিত বিদ্যাও সঠিক ও শুদ্ধ শিক্ষার জন্য প্রয়োজন। এই দুইয়ের সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে যে শিক্ষা দেওয়া হয় সেটাই প্রকৃত ও কার্যকরী শিক্ষা। বহিঃচত্বর সমূহে এই সমন্বয় করা হয়েছে। পক্ষান্তরে স্থায়ী চত্বরের কথা বলে যে সব বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন পেয়েছে তারাও শিক্ষাদান কর্মসূচী ভাড়া করা ভবনে পরিচালনা করছে। এই ভবনে রয়েছে ব্যাংক , মোবাইল ফোনের খরিদ্দার সেবা প্রদানকারী দপ্তর, রেস্টুরেন্ট, ভিডিও ক্যাসেটের দোকান প্রভৃতি। তাহলে এই স্থায়ী চত্বরের সাথে বহিঃচত্বরের পার্থক্য কোথায় ? এটা খুজতে গিয়ে দেখা যায় যে স্থায়ী চত্বরে শিক্ষাদান করছে সদ্য পাশ করা এবং চাকুরীর সন্ধানেরত ব্যক্তিগণ। কিছু নামজাদা শিক্ষাবিদের নাম শিক্ষকের তালিকায় থাকলেও তারা অধিক সময় অবস্থান করেন বিদেশে বা নিজ প্রকৃত কর্মস্থলে । তারা ক্লাস নেবার সুযোগ পান না, প্রয়োজনবোধও করেন না। ছাত্রছাত্রীদের আকর্ষণ করার জন্যই এইসব শিক্ষাবিদদের নাম ব্যবহার করা হয়। এই সব স্থায়ী চত্বর পরিচালনাকারী পুথিঁগত বিদ্যাসম্পন্ন এমন ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া গেছে যারা অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র সহকারী সচিবকে অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিববের চাইতে অধিক গুরুত্ব ও পদমর্যাদা সম্পন্ন বিবেচনা করেন। এই সব বিশ্ববিদ্যালয় নিজেদের প্রচারণার লক্ষ্যে ব্যানার টাঙিয়ে দেন রাস্তাঘাটে। এ নিয়ে অনেক সময়ে জনক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

সাম্প্রতিককালে পদ্মার তীরবর্তী একটি প্রাচীন শহরে অবস্থিত একজন খ্যাতিমান আওলিয়ার দরগাহ শরীফে এরূপ একটি ব্যানার কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই টাঙিয়ে দেওয়া হয়। এতে মুসুল্লীদের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এই অবস্থায় তা সরিয়ে দেওয়া হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে স্থায়ী চত্বর খোলার জন্য অন্যের জমি জবর-দখল করা হয়েছে, মসজিদের জন্য ওয়াকফ করা সম্পত্তির প্রতিও নজর দেওয়া হয়েছে। এভাবে দেখা যাচ্ছে স্থায়ী চত্বরের কথা বলে যা করা হয়েছে তা শিক্ষাক্ষেত্রে কোন ইতিবাচক অবদান রাখতে পারে নাই। অভিযোগ উঠেছে রাজধানীতে বিলাসবহুল জীবনযাপনকারী কিছু ব্যক্তি নিজেদের স্বার্থে স্থায়ী চত্বর বাধ্যতামূলক করার আওয়াজ তুলেছিলেন। তারাই বাধ্য করেন বহিঃচত্বর বন্ধ করার। ছাত্রছাত্রীগণ এতে ঢাকামুখি হয়। সেখানেও তো ভাড়া করা ভবনে প্রাগুক্ত পরিবেশে শিক্ষাদান চলে। চাকুরীরত অনেকেই নিজ কর্মস্থলে গর-হাজির থেকে এই সব বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাদান করে বাড়তি আয় করেন। এই সব অভিযোগগুলো কি অমূলক? বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে দেখা যাচ্ছে স্থায়ী চত্বর ও বহিঃচত্বরের আওয়াজ এবং এ সংক্রান্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত শিক্ষা ক্ষেত্রে কোন ইতিবাচক অবদান রাখে নাই। মফস্বল এলাকার ছাত্রছাত্রীদের জন্য তা কোন আর্শীবাদ বয়ে আনে নাই। সাংবিধানিক অধিকার থেকে তারা এভাবে বঞ্চিত হয়েই চলেছেন। সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে বর্ণিত গণমুখি ও সার্বজনীন শব্দ দুটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের সমস্ত আন্দোলন সংগ্রামে শিক্ষা ক্ষেত্রে এই শব্দ দুটি ব্যবহৃত হয়েছে এবং সে কারণেই সংবিধানে শিক্ষা সংক্রান্ত নীতির ক্ষেত্রে এই শব্দ দুটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ১১-দফা দাবীর প্রথম দাবীতেই বলা হয় ঃ ১(ক) স্বচ্ছল কলেজগুলোকে প্রাদেশিকীকরণের নীতি পরিত্যাগ করিতে হইবে এবং ইতিমধ্যে যেসব কলেজ প্রাদেশিকীকরণ করা হইয়াছে সেগুলিকে পূর্বাবস্থায় ফিরাইয়া আনীতে হইবে, তৃতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ ছাত্রদের উচ্চ ক্লাসে ভর্তি বন্ধের সিদ্ধান্ত বাতিল করিতে হইবে। কারিগরি, প্রকৌশল, চিকিৎসা ও কৃষি ছাত্রদের দাবী মানিতে হইবে। ছাত্র বেতন কমাইতে হইবে। নারী শিক্ষার প্রসার করিতে হইবে এবং শিক্ষা-সংকোচন নীতি পরিহার করিয়া শিক্ষার ব্যাপক প্রসার করিতে হইবে। (খ) কুখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় কালাকানুন সম্পূর্ণ বাতিল করিতে হইবে। বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পূর্ণ স্বায়ত্বশাসন প্রদান করিতে হইবে। (গ) শাসক গোষ্ঠির শিক্ষা-সংকোচন নীতির প্রামাণ্য দলিল ‘জাতীয় শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট’ ও ‘হামুদুর রহমান কমিশন রিপোর্ট’ বাতিল করিতে হইবে এবং ছাত্র সমাজ ও দেশবাসীর স্বার্থে গণমুখী ও বৈজ্ঞানিক শিক্ষা ব্যবস্থা কায়েম করিতে হইবে।
এর মূল মর্মের প্রতিফলন আমরা আলোচিত ক্ষেত্রে ঘটাতে পারি নাই। ফলে গরিব ও শ্রমজীবী কর্মজীবী পেশাজীবী ঘরের সন্তানদের জন্য শিক্ষার ব্যাপক আলোকে অবগাহন করার সুযোগ উন্মোচিত হতে পারে নাই।
আমরা উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি বিদ্যা শিক্ষায় বুৎপত্তি লাভকারী প্রাজ্ঞ ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে রাজনৈতিক আনুগতদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে সব ক্ষেত্রের বিদ্যাপীঠগুলোতে। আকন্ঠ দুর্নীতিতে আকন্ঠ নিমজ্জিত হবার ক্রণে ব্যাপকভাবে গণ ধিক্কৃত ও সমালোচিত হলেও শিক্ষা সংক্রান্ত উচ্চ পদ পেতে কোন সমস্যা হচ্ছে না। এর কারণে শিক্ষাঙ্গনে শুরু হয়েছে নৈরাজ্য । কেউ প্রতিবাদী ছাত্রদের বশে রাখার জন্য ছাত্রদের মধ্যে কোটি টাকা বিতরণ করছে । বিপরীত দিকে শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ সুষ্ঠ রাখতে নীতিবান ও দৃঢ় শিক্ষাবিদের কাছে অন্যায় আবদার হাসিল করতে ব্যর্থ হয়ে শিক্ষাবিদকেই নিক্ষেপ করছে জলাশয়ে । মনে পড়ে স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই এই রূপ পথভ্রষ্ট ছাত্রদের দ্বারা সম্মানিত অধ্যাপকগণ ঘেরাও এর মধ্যে পড়েন। খবরটি তাৎক্ষণিক বঙ্গবন্ধুর কাছে পৌছে যায়। বঙ্গবন্ধু দেরী না সব কর্মসূচী স্থগিত করে চলে যান ঘটনা স্থল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে । তিনি অধ্যাপকদের কে ঘেরাও অবস্থা থেকে মুক্ত করেন এবং ঘেরাওকারী ছাত্র নামধারীদের কঠোর ভাষায় ভৎর্সনা করেন। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের কথা বলতে গেলে এই ঘটনার কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে। কিন্তু সেদিনও ঐ ‘ঘেরাওকারীগণ’ বঙ্গবন্ধুর এই নির্দেশনা অনুসরণ করে নাই । তারা ‘ডাকসু’ ব্যালট ছিনতাই করে নির্বাচন পন্ড করে দিয়েছে । কিছু পরে নিজেরা অন্তর্কোন্দলে লিপ্ত হয়ে খুনোখুনি পর্যন্ত করেছে । মহসিন হলের সাত খুনের ঘটনা আজ ইতিহাসের কলংকিত অধ্যায় হয়ে আছে । আমাদের শিক্ষার মান দ্রুত নেমে যাচ্ছে ।

বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় এখন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে বলে জনশ্রুতি আছে । সেদিন ছাত্র ছিল আজ তারই শিক্ষক , অভিজ্ঞতার বিষয় বিবেচনায় নাই । বেতনের বিবেচনা করে এগুলো করা হচ্ছে , এসব যারা করছেন প্রচার মাধ্যমে তারা আবার প্রচার মাধ্যমে গিয়ে ‘আলাপচারিতা’ অনুষ্ঠানে নীতি কথা শুনাচ্ছেন জাতিকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করার বিধি সম্মত অভিজ্ঞতা না থাকলেও উপাচার্য হবার আকাঙ্খা বাস্তবায়নের জন্য গোটা বিশ্ববিদ্যালয়কে জিম্মি করার ঘটনার কথা জনগণের মাঝে ছড়িয়ে পড়েছে । শিক্ষার মান সেভাবেই নেমে যাচ্ছে । এই ধারা অব্যাহত থাকতে দিলে জাতি হিসেবে আমাদের অগ্রগতি স্থবির হয়ে যাবে।

পাবলিক ও বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সংকট মোচনের জন্য ‘ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন’ , ‘দুর্নীতি দমন কমিশন’ ( দুদক) সহ সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিত্বকে দৃঢ় ও আপোষহীনভাবেই আজ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
লেখক: সাবেক জেলা ও দায়রা জজ। বর্তমানে সদস্য বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট আইনজীবী সমিতি, পরিচিতি নং ৫৮৯৪ , ঢাকা ।
aniskamal44@yahoo.com