ঐতিহাসিক ৭ই নভেম্বর :সা কা ম আনিছুর রহমান খান

দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব অর্জন ও রক্ষা এবং জনগণের মুক্তির জন্য যারা অকুতোভয়ে জীবন দিতে পারেন তারা চির অমর। শ্রেণী সংগ্রাম ত্বরান্বিত করে সামাজিক বিপ্লবের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে উদ্দীপ্ত কর্নেল আবু তাহের বীর উত্তম এভাবেই লাভ করেছেন অমরত্ব। ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দের ৭ই নভেম্বরের ‘সিপাহী গণ-অভ্যুত্থানে’র মহানায়ক তাহেরকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা হয় ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ই জুলাই, শনিবারে। ১৯ তারিখে স্বজনদের সাথে শেষবারের মতো তাকে দেখা করতে দেওয়া হয় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। প্রিয়তমা স্ত্রী লুৎফাকে সেদিন তিনি বলেছিলেন,‘ তুমি এমন মন খারাপ করলে চলবে ? আমি তো মৃত্যুকে ভয় পাই না। দেখো আমার এই মৃত্যুর জন্য একসময় তুমি গর্ববোধ করবে। সবাই তো আছে। আমি সবার মাঝে বেঁচে থাকব দেখো। জানো ক্ষুদিরামের পর আমিই প্রথম এভাবে মরতে যাচ্ছি।’ অনুজ বেলালকে তিনি বলেন,‘ মন খারাপ করবে না। আমরা যে মিশন শুরু করেছি তাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে, পারবে না? ’
বাংলার জনগণ তাদের মুক্তির লক্ষ্যে লড়াই করে আসছে যুগ যুগ ধরে। এটা ভাত কাপড়ের লড়াই, বাঁচার লড়াই। শাসন ক্ষমতায় যারা এসেছে তারা জনগণের মুক্তির জন্য নয়, নিজেদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক আরাম আয়েশ এবং ভোগ বিলাসের জন্যই বেশী মনোযোগী ছিল। উন্নয়ন মূলক কাজে জনগণের স্বার্থেও চাইতে তাদের সযতœ তীক্ষ্ন নজর ছিল কমিশনের দিকে। সে কারণেই শ্রমজীবী কর্মজীবী পেশাজীবী মানুষের কোন কল্যাণ এই সব শাসকদের দ্বারা সাধিত হয় নাই। এদের অর্থনৈতিক সামাজিক রাজনৈতিক মুক্তির জন্য লড়াই ছাড়া ভিন্ন কোন পথ নাই। এই মুক্তির লড়াইয়ের একটি ধাপ ছিল ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ‘মুক্তিযুদ্ধ’। মুক্তিযুদ্ধের মূল নিয়ামক শক্তি ছিল ‘নিউক্লিয়াস’। মুক্তিযুদ্ধকে জনগণের প্রকৃত মুক্তির লক্ষ্যে পরিচালনার জন্য এরাই গঠন করেন‘মুজিব বাহিনী’। যুদ্ধোত্তরকালে এরাই দাবী করেন ‘জাতীয় বিপ্লবী সরকার’ গঠনের। শেখ মুজিবের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ এ দাবীতে সাড়া দেন নাই। তিনি গঠন করেন দলীয় সরকার। ডাক দেন ‘স্বনির্ভর’ বাংলাদেশ গড়ার। এ লক্ষ্য অর্জিত হয় নাই; অচিরেই জনগণের মাঝে আওয়াজ উঠে ‘স্বনির্ভর’ হয়ে গেছে ‘শণির ভর’। ‘শৃঙ্খলা বাহিনী’সহ প্রজাতন্ত্রের সকল কর্ম বিভাগে নিয়ম-শৃঙ্খলা , নিয়ন্ত্রণ ও আনুগত্যের ধারাবাহিকতা বিপন্ন হয়ে পড়ে। জনপদগুলো মৃত্যুর বিভীষিকাপুরীতে পরিণত হয়। জনজীবনে ছড়িয়ে পড়ে রক্ষী বাহিনী এবং ‘লালঘোড়া’র আতংক। দুর্ভিক্ষে মৃত্যুবরন করতে থাকে মানুষ। আওয়ামী লীগ সরকার লংগর খানা খুললেও সেখানে দলীয় নেতাদের লুন্ঠনের কারণে এর সুফল থেকে দুর্ভিক্ষ পীড়িত জনগণ বঞ্চিত হয়। স্বাধীনতা-উত্তরকালে স্বাধীনতার রূপকার সিরজুল আলম খান, স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনকারী আ স ম আবদুর রব, স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠক শাহজাহান সিরাজসহ বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ উদাত্ত কন্ঠে ঘোষণা করেন ঃ ‘আমরা লড়ছি সামাজিক বিপ্লবের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য।’ বাংলার বীর জনগণ এই ঘোষণার মধ্যে দেখতে পায় মুক্তির নিশানা। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠা অটুট জাতীয় ঐক্য বিপন্ন হয়ে পড়ে। পারস্পরিক অবিশ্বাস আর সন্দেহ মুক্তিযোদ্ধাদের করে দেয় বহুধা বিভক্ত। এ সবই ঘটে ‘জাতীয় বিপ্লবী সরকারে’র বদলে দলীয় সরকার গঠনের কারণে। অকুতোভয়ে জীবনবাজি রেখে মেহনতি মানুষের মুক্তির পতাকা এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি, বিপ্লবী গণবাহিনী, বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা। গণ-বিপ্লব সংঘঠনের দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে তৎপরতা চালিয়ে যেতে থাকে ‘কেন্দ্রীয় সাংগাঠনিক কমিটি’ (ঈঙঈ)। দলীয় সরকার গঠন করে শেখ মুজিব দেশ চালাতে পারেন নাই। এরপর গঠন করেন এক দলীয় সরকার। সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর ৩৪ ধারায় বলা হয় ঃ ‘ সংবিধানে যাহা বলা হইয়াছে , তাহা সত্ত্বেও এই আইন প্রবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে,
(ক) এই আইন প্রবর্তনের অব্যবহিত পূর্বে যিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি-পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন, তিনি রাষ্ট্রপতি পদে থাকিবেন না এবং রাষ্ট্রপতির পদ শূণ্য হইবে;
(খ) জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হইবেন এবং রাষ্ট্রপতির কার্যভার গ্রহণ করিবেন এবং উক্ত প্রবর্তন হইতে তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি-পদে বহাল থাকিবেন যেন তিনি এই আইনের দ্বারা সংশোধিত সংবিধানের অধীন রাষ্ট্রপতি-পদে নির্বাচিত হইয়াছেন।’
সাংবিধানিক পন্থায় নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মহম্মদ উল্লাহকে সরিয়ে এভাবে আইন পাসের মাধ্যমে বাংলাদেশের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী রাষ্ট্রপতি হয়ে যান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এই পদে আসীন হবার জন্য তিনি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোন ভাবেই নির্বাচিত হন নাই। যে জনগণ তাকে ফাঁসির মঞ্চ থেকে ছিনিয়ে ‘বঙ্গবন্ধু’ অভিধায় ভূ’ষিত করেছিল , তাকে বরণ করে নিয়েছিল নেতারূপে, সেই জনগণের উপর তিনি আস্থা রাখতে পারেন নাই। সে জন্যই তিনি রাষ্ট্রপতি পদের জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্বাচন এড়িয়ে যান সুকৌশলে। সঠিক বটে সেদিন জনগণের হৃদয় থেকে তিনি সরে গিয়েছিলেন অনেক দূর। তিনি জনবিচ্ছিন্ন হয়ে যতই ক্ষমতার কাছে যেতে চেয়েছেন জনতা ততই তাঁর থেকে দূরে সরে গেছে। স্তাবকেরা তার দলীয় সরকার প্রতিষ্ঠা ও পরবর্তীতে একদলীয় সরকার প্রতিষ্ঠার কার্যক্রমের স্তুতি গেয়েছে কিন্তু ভুলটা ধরিয়ে দেয় নাই। সংসদের ভিতরে ও বাইরে আন্দোলন করেছে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল। ‘এক নেতা ,এক দেশ’ আওয়াজ তুলে স্তাবকেরা নেতা বন্দনায় ব্যস্ত তখন জনগণের হয়ে কথা বলেছে জলিল-রবের নেতৃত্বাধীন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল। চতুর্থ সংশোধনীর বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ জানান জাতীয় সংসদে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলীয় সংসদ সদস্য ময়েন উদ্দিন আহমেদ মাণিক।
দলীয় সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে নিয়ম-শৃঙ্খলার যে অবনতির সূচনা হয়েছিল , এক দলীয় সরকার গঠনে তা চ’ড়ান্ত রূপ লাভ করে। এর ফলেই শেখ মুজিব সপরিবারে নিহত হন এবং ক্ষমতাচ’্যত হয় আওয়ামী লীগ তথা ‘বাকশাল’। ক্ষমতা কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতাদের হাতেই থাকে। নিজ দলটাই যে বিশৃঙ্খলাপূর্ণ ও ষড়যন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দু ছিল তা ১৫ই আগষ্ট,১৯৭৫খ্রিঃ তারিখে জাতির সামনে তো বটেই আন্তর্জাতিক অংগনেও প্রকাশিত হয়ে পড়ে। বিশৃঙ্খল এই পরিস্থিতিতে সেনাপ্রধানের পদ নিয়ে বিরোধ তুঙ্গে উঠে। বিশৃঙ্খলা মারাত্মক আকার ধারণ করে ১৯৭৫ সালের নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নিহত হন চার নেতা। এই সময় এক অফিসার তার অধীনস্থ সৈনিকদের আরেক অফিসারের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর নির্দেশ দিতে থাকে। দেশ রক্ষার চাইতে নিজেদের পদ ও পদবীই তাদের কাছে বড় বলে বিবেচিত হয়। দেশরক্ষার প্রত্যয়ে উদ্দীপ্ত সৈনিকেরা এই সব হুকুমের কারণে একে অন্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায়। দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব হয়ে পড়ে বিপন্ন। দেশপ্রেমিক সৈনিকেরা এই সব কর্মকান্ডের সাথে যুক্ত হতে অস্বীকার করে। তারা ভাইয়ের রক্তে নিজেদের হাত রঞ্জিত করবেনা বলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কতিপয় উচ্চাভিলাসী অফিসারের ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের জন্য সৈনিকেরা পরস্পর ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে লিপ্ত হতে অস্বীকার করে।তারা বিষয়টি নারায়নগঞ্জে গিয়ে কর্নেল তাহেরকে অবহিত করে। এই ক্রান্তিলগ্নে কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বাধীন ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’ দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং শৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ম শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ব্রতী হয়।
৭ই নভেম্বরের সিপাহী গণ-অভ্যুত্থানের প্রস্তুতি পর্বে ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’ একটি লিফলেট বিতরণ করে ঢাকা সেনা নিবাসে। পরিকল্পনা ও নির্দেশনা ছিল কর্নেল তাহেরের। এর মুসাবিদা করে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার অন্যতম নেতা ট্যাংক রেজিমেন্টের হাবিলদার বারী ও নায়েক সুবেদার জালাল। মুসাবিদাটি চু’ড়ান্ত করেন বিপ্লবী গণ-বাহিনীর উপ-প্রধান হাসানুল হক ইনু। তাঁর সাথে ছিলেন আনোয়ার হোসেনসহ আরও কয়েকজন। লিফলেটে বলা হয়।
‘ সৈনিক ভাইয়েরা , আমরা আর ধনিক শ্রেনীর হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহৃত হইতে চাই না। নিগৃহীত, অধিকারবঞ্চিত সিপাহীরা আর কামানের খোরাক হইবে না। আসুন আমরা একটি অভ্যুত্থান ঘটাই। আমাদের এই অভ্যুত্থান শুধু মাত্র নেতৃত্বের পরিবর্তনের জন্য হইবে না বরং এই অভ্যুত্থান হইবে সমাজের দরিদ্র শ্রেনীর স্বার্থ রক্ষার জন্য। এই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়া আমরা ঔপনিবেশিক আমলের রীতি নীতি বদলাইয়া ফেলিয়া সশস্ত্র বাহিনীকে জনগণের স্বার্থ রক্ষাকারী একটি বাহিনীতে পরিণত করিব। আমরা রাজবন্দিদের মুক্ত করিব, দুর্নীতিবাজদের অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করিব। মনে রাখিবেন এই সিপাই আর জনতার ভাগ্য এক। তাই সিপাই জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করিতে হইবে। সিপাই সিপাই ভাই ভাই সূতরাং সিপাইদের ঐক্যবদ্ধভাবে অফিসারদের এই ক্ষমতার লড়াইকে রুখিয়া দাঁড়াইতে হইবে। যদি অফিসারেরা নির্দেশ দেয় আরেক সৈনিক ভায়ের বিরুদ্ধে বন্দুক ধরিবার তাহা হইলে আপনারা কন্দুক ধরিবেন না। আসুন ঐক্যবদ্ধভাবে বিদ্রোহ করি।’
এই লিফলেটটি জিন্দাবাজারের একটি প্রেস থেকে ছাপান জেএসডির রাজনৈতিক প্রকাশনার দায়িত্বেরত শামছুদ্দিন পেয়ারা। কর্নেল তাহেরের নির্দেশ মতো দশ হাজার লিফলেট ছাপিয়ে ঢাকা সেনা নিবাসের প্রথম গেটের গার্ড রুমের সিড়িতে রেখে আসেন। বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্যগণ তা সেনানিবাসে বিলি করে।
( তথ্য সূত্রঃ শাহাদুজ্জামান প্রণীত এবং মওলা বাজার ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘ ক্রাচের কর্নেল’ ; চতুর্থ মুদ্রণ , সেপ্টেম্বর ২০১২ খ্রিষ্টাব্দ। পৃষ্ঠা ঃ ২৬৮ ও ২৬৯।)
পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টাতে থাকে। দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং জনগণের জান মান মাল এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য অভ্যুত্থান ঘটানো অপরিহার্য হয়ে পড়ে। যার লক্ষ্য হবে শোষণ বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে মেহনতি মানুষের মুক্তি সাধন। সিপাহী এবং জনতা সম্মিলিতভাবে ঘটাবে এই অভ্যুত্থান। সেই লক্ষ্যে কাজ শুরু করে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি, বিপ্লবী গণ-বাহিনী, বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা এবং ‘কেন্দ্রীয় সাংগাঠনিক কমিটি’ (ঈঙঈ)। বিপ্লবী গণ-বাহিনী ও বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা এই উভয় সংগঠনের প্রধান ছিলেন কর্নেল আবু তাহের, বীর উত্তম।
আবু ইউসুফ খানের বন্ধু প্রকৌশলী আনোয়ার সিদ্দীকির গুলসানের বাসায় বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্যদের সাথে বৈঠক করেন তাহের। তিনি জানান যে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের অনুমোদনক্রমে ৭ই নভেম্বর তারিখে সেনাবাহিনী ও জনগণের যৌথ উদ্যোগে অভ্যুত্থান ঘটানো হবে। অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেবে ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’। জনজীবনে শৃংখলা ফিরিয়ে আনার জন্যই এই অভ্যুত্থান ঘটানো হবে। এরপর গঠন করা হবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। কর্নেল তাহের নিম্নরূপ কর্মসূচী ঘোষণা করেন অভ্যুত্থানের জন্যঃ
১. রাত বারোটায় ফাঁকা গুলি ছুড়ে বিপ্লবের সূচনা করা হবে।
২. জীবন বাঁচানোর অনিবার্য প্রয়োজন ছাড়া কাউকে গুলি করা যাবে না।
৩. খালেদ মোশাররফকে গ্রেপ্তার করা হবে।
৪. জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করা হবে এবং নিয়ে আসা হবে এলিফ্যান্ট রোডের বাসায়।
৫. সৈনিকেরা বিপ্লবের পক্ষে শ্লোগান দিয়ে ট্রাকে ট্রাকে শহর প্রদক্ষিন করবে।
৬. প্রতিটি ট্রাকে অন্তত একজন সৈনিক সংস্থার লোক থাকবে।
৭. ৭ তারিখ সকালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সৈনিকদের সমাবেশ হবে।
৮. বিপ্লবের পর বেতার টেলিভিশনে নেতাদের বক্তব্য প্রচার করা হবে।
৯. কোন লুটপাটে অংশগ্রহণ করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
১০. বিপ্লবের পর বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার ইউনিট এবং নেতাদের নিয়ে বিপ্লবী পরিষদ বা রেভ্যুলেশন কমান্ড কাউন্সিল গঠন করা হবে।
১১. সামরিক অফিসারদের বিপ্লব সমর্থন করার আহ্বান জানানো হবে। যারা করবে না তাদেও গ্রেফতার করা হবে।
১২. কর্নেল তাহের বিপ্লবের সর্বাধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
সিপাহী গণ-অভ্যুত্থান সফল হবার সাথে সাথে সিপাহীদের ১২-দফা দাবী দাওয়া প্রণয়ন করা হয়।
সিপাহীদের দাবী দাওয়া তারাই তৈরী করে তাহেরের পরামর্শ মতো। এই দাবীনামা পরিমার্জন করে দেন সিরাজুল আলম খান, কর্নেল আবু তাহের ও হাসানুল হক ইনু। এটাই সিপাহীদের ১২-দফা দাবী নামে খ্যাত। দাবীগুলো নি¤œরূপঃ
(এক) আমাদের বিপ্লব নেতা বদলের জন্য নয়, বিপ্লব হয়েছে সাধারণ মানুষের স্বার্থের জন্য। এতদিন আমরা ছিলাম ধনীদের বাহিনী, ধনীরা তাদের স্বার্থে আমাদের ব্যবহার করেছে। পনেরোই আগষ্ট তার প্রমাণ। তাই এবার ধনীর দ্বারা বা ধনীদের স্বার্থে অভ্যুত্থান করিনি, আমরা বিপ্লব করেছি জনগণের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে। আমরা জনতার সাথেই থাকতে চাই, আজ থেকে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী হবে গরিব শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষাকারী গণবাহিনী।
(দুই)। অবিলম্বে রাজবন্দিদের মুক্তি দিতে হবে।
(তিন)। রাজনৈতিক নেতাদের সাথে আলোচনা না করে কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।
(চার।) অফিসার এবং জওয়ানদের ভেদাভেদ দূর করতে হবে। অফিসারদের আলাদাভাবে নিযুক্ত না করে, সামরিক শিক্ষা এবং যোগ্যতা অনুযায়ী সামরিক বাহিনী থেকেই পদ মর্যাদা নির্ণয় করতে হবে।
(পাঁচ।) অফিসার ও জওয়ানদের এক রেশন এবং একই রকম থাকার ব্যবস্থা করতে হবে।
(ছয়)। অফিসারদের জন্য আর্মির কোন জওয়ানকে ব্যাটম্যান হিসাবে নিযুক্ত করা যাবে না।
(সাত।) মুক্তিযুদ্ধ, গণঅভ্যুত্থান এবং আজকের বিপ্লবে যারা শহীদ তাদের পরিবারের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
(আট।) ব্রিটিশ আমলের আইন কানুন বদলাতে হবে।
(নয়)। দুর্নীতিবাজদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করণ ও বিদেশে যারা টাকা জমিয়েছে সেই টাকা ফেরত আনতে হবে।
(দশ)। যে সমস্ত সামরিক অফিসার ও জওয়ানদের বিদেশে পাঠানো হয়েছে, তাদের দেশে ফেরত আনতে হবে।
(এগারো)। জওয়ানদের বেতন সপ্তম গ্রেড হবে, ফ্যামিলি অ্যাকোমেডেশন ফ্রি দিতে হবে।
(বারো)। পাকিস্তান ফেরত সামরিক বাহিনীর লোকদের আঠারো মাসের বেতন দিতে হবে।
অভ্যুত্থানের সফলতার সাথে সাথে মেজর এম এ জলিল, আ স ম আবদুর রব, শাহজাহান সিরাজ, ডঃ আখলাকুর রহমান, এম এ আউয়াল প্রমুখ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের নেতৃবৃন্দ মুক্তি লাভ করেন। প্রতিক্রিয়াশীলদের প্রতিভ’ খন্দকার মোশতাকের অনুগতরা এই বিপ্লবের উদ্দেশ্য সাধনে বাধা সৃষ্টি করে। তারাই রক্তপাতের সূচনা করে এবং রক্তপাত ঘটায়। দোষ চাপায় কর্নেল তাহের , জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি, বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার উপর। জনগণের মুক্তিপথের প্রতিক’লতা দূর করার জন্য রাজনৈতিকভাবে এগিয়ে যেতে থাকে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল। এখানেও বিশ্বাসঘাতকদের প্রাদুর্ভাব ঘটে। আকস্মিকভাবে কারারুদ্ধ হন মেজর এম এ জলিল, আ স ম আবদুর রব, কর্নেল তাহের, শাহজাহান সিরাজ, ডঃ আখলাকুর রহমান, মাহমুদুর রহমান মান্না প্রমুখ নেতৃবৃন্দ। তথাকথিত ট্রাইব্যুনালে তাদের গোপনে বিচার হয়। তড়িঘড়ি করে কর্নেল তাহেরকে ফাঁসি দিয়ে হত্যা করা হয়। কর্নেল তাহের ক্ষমা ভিক্ষা করেন নাই। তার পক্ষ থেকে তার ফাঁসির আদেশ রদের প্রার্থনা নামঞ্জুর করেন রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম। এটা করতে দেশের প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালনকারী আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের হাত এতটুকু কাঁপেনি। অথচ ঐ সময়ে দেশের প্রধান বিচারপতি ছিলেন বলেই দুর্যোগময় জাতীয় সংকটে রাষ্ট্রপতি হিসাবে খন্দকার মোশতাক আহমেদের বদলে তার নাম প্রস্তাব করেছিলেন কর্নেল তাহের। সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ এবং দন্ডবিধির ৫৫এ ধারা অনুসারে এই মৃত্যুদন্ড মার্জনা, বিলম্বন ও বিরাম মঞ্জুর করার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির আছে । একই আইনে এইরূপ মৃত্যুদন্ড মওকুফ , স্থগিত বা হ্রাস করার ক্ষমতাও রাষ্ট্রপতির আছে। শেষোক্ত ক্ষেত্রে দন্ডিতের ক্ষমা প্রার্থণার আবশ্যকতা নাই। দন্ডবিধির ৫৪ ধারা অনুসারে এরুপ ক্ষমতা সরকারের রয়েছে। এ ক্ষেত্রেও অনুরূপ দন্ড কমিয়ে দেবার জন্য দন্ডিতের সম্মতির আবশ্যকতা নাই। এই আইনগত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও এর সুবিধা থেকে সেদিন কর্নেল তাহের বঞ্চিত হন। যারা তা করলো তাদের পরিণতিও জনগণ দেখেছে।
তাহেরকে ফাঁসি মঞ্চে হত্যা করে ; জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল , বিপ্লবী গণ-বাহিনী ও বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার নেতাকর্মীদের কাউকে হত্যা, কাউকে কারারুদ্ধ করে কি দেশের কোন কল্যাণ সাধিত হয়েছে? আজ বাংলাদেশে মানুষে মানুষে , শ্রেণীতে শ্রেণীতে বৈষম্য বেড়েছে। এই দেশে শত কোটি টাকার মালিক সৃষ্টি হয়েছে। হতদরিদ্র নিঃশ্বের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। গ্রামীণ জনগণের শিক্ষা চিকিৎসার কোন আধুনিক সুযোগ নাই। কর্ম-সংস্থানের সুযোগ নাই। ভুখা আর বেকারের সংখ্যা পাকিস্তান আমলের চাইতেও দ্রুত গতিতে বাড়ছে। একজন শ্রমিক মাসে বেতন পায় ছয় হাজার টাকা, মালিক শ্রেণীর লোকেরা একাই একবেলা ছয় হাজার টাকা মূল্যের খাবার খায়। জাতীয় বাজেটের ৬৫% অর্থ ব্যয় হয় ঢাকা মহানগরীতে, ২০% চট্টগ্রাম মহানগরীতে আর বাকী ১৫% অর্থ ব্যয় হয় উক্ত দুই মহানগরী ব্যতিত সারা দেশে। ক্ষমতাশালীদের হাতে ‘ইচ্ছাকৃত’ ব্যয়ের জন্য অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে। চাকুরী পাবার ক্ষেত্রে মেধার চাইতে আর্থিক সামর্থ্য ও রাজনৈতিক পরিচিতি অগ্রাধিকার পাচ্ছে। নব্য স্বাধীন দেশে এই পরিস্থিতি যাতে সৃষ্টি না হয় সে লক্ষ্যেই ‘নিউক্লিয়াসে’র প্রতিষ্ঠাতা, স্বাধীনতার রূপকার সিরাজুল আলম খান, স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনকারী আ স ম আবদুর রব, স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠক শাহজাহান সিরাজসহ মুক্তিযোদ্ধাগণ ‘জাতীয় বিপ্লবী সরকার’ গঠনের ডাক দিয়েছিলেন। তাদের এই আহ্বানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সারা দেন নাই।একই লক্ষ্য অর্জনে এগিয়ে গেছে জাসদ। তাদেরই উদ্যোগে সংঘটিত হয় ‘সিপাহী গণ-অভ্যুত্থান’। সেই বিজয়ও ছিনিয়ে নেয় প্রতিক্রিয়াশীলেরা। তারপর গোপন বিচার , তাহেরের মৃত্যুদন্ড, জাসদ নেতাদের কারাদন্ডের বিবরণ সবারই জানা।এখন প্রশ্ন হচ্ছে শেখ মুজিব দলীয় সরকার গঠন করার ফলে কি জনগণ কাঙ্খিত মুক্তি পেয়েছে ? দলীয় সরকার গঠনের ফলশ্রুতিতে মুক্তিযোদ্ধাগণ বহুধা বিভক্ত হয়ে গেলো। রক্ষী বাহিনী , মুজিববাদী গুন্ডা বাহিনীর হতে নিহত হলো ৬৭ হাজার মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযোদ্ধা সিরাজ শিকদার ‘শৃঙ্খলা বাহিনী’র হেফাজতে থাকা অবস্থায় নিহত হলেন। বঙ্গবন্ধু নিজে সপরিবারে নিহত হলেন। কারাগারে নিহত হলেন তাজউদ্দিন আহমেদ, এ এইচ এম কামরুজ্জামান, সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী। নিহত হলেন সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফ, সেক্টর কমান্ডার জিয়াউর রহমান, সেক্টর কমান্ডার মঞ্জুর আহমেদ। এই রক্তক্ষয় আজো শেষ হয়নি। সেক্টর কমান্ডারদের যারা বেচে থাকলেন তারা কি মুক্তি যুদ্ধের চেতনা সত্যিকারভাবে লালন করেছেন ? যদি তা হতো তাহলে সুবিধাবাদী রাজনীতিবিদদের মতো তাদেরকেও ক্ষমতা বদলের সাথে সাথে দল বদলিয়ে মন্ত্রীত্ব নিতে দেখা গেলো কেন ? মন্ত্রী সভায় মওলানা আবদুল মান্নান, আজিজুল হক নান্না মিয়া, মওলানা নুরুল ইসলামের পাশে তাদের কাউকে নির্দ্বিধায় বসতে দেখা গেলো কেনো? মুক্তিযুদ্ধকালে মওলানা আবদুল মান্নান, আজিজুল হক নান্না মিয়া, মওলানা নুরুল ইসলামের ভ’মিকার কথা তো সবারই জানা। কাউকে দেখা গেলো অর্থ কেলেংকারী মামলায় কারাবরন করতে, তাও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের দাবীদার আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। বিডিআর এর ঘটনা তো সেদিনের ব্যাপার। ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে ব্যক্তি পরিবার ও দলীয় অহমিকা , দাম্ভিকতা থেকেই দলীয় সরকার গঠন করা হয়। এর কারণেই পরবর্তীকালে দুঃখজনক ও বিয়োগান্তক ঘটনা ঘটেছে। ‘সিপাহী গণ-অভ্যুত্থানে’র মাধ্যমে এ থেকে জাতিকে মুক্ত করে মেহনতি মানুষের মুক্তির পথে এগিয়ে নেবার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্থ করে ‘শৃঙ্খলা বাহিনী’র শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারে নাই ক্ষমতাধরেরা। একের পর এক ‘অভ্যুত্থান’ ঘটেছে। নিহত হয়েছেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ক্ষমতার বদল হয়েছে, কিন্তু ক্ষমতাসীনদের শ্রেণী চরিত্রের বদল হয় নাই। তাই ক্ষুধা দারিদ্র বেকারত্ব থেকে জনগণ মুক্তি পায় নাই। এই মুক্তির আলোকবর্তিকা জ্বালিয়ে ছিল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল। এই মুক্তি অর্জনের লক্ষ্যেই প্রাণ দিতে দ্বিধা করেন নাই কর্নেল তাহের। হাসি মুখে দৃঢ় প্রত্যয়ে কারাবরণ করেছেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের নেতা ও কর্মীগণ। আজ ঐতিহাসিক ভাবে প্রমাণিত হয়েছে ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের দলীয় সরকার, ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দে এক দলীয় সরকার , ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দের আগস্ট ও নভেম্বর মাসে গঠিত সরকারসহ তৎপরবর্তীকালের কোন সরকারই জনগণকে ক্ষুধা দারিদ্র বেকারত্ব থেকে মুক্তি দিতে পারে নাই। ক্ষমতার পালা বদল হয়েছে অনেকবার অনেকভাবে কিন্তু শ্রমজীবী পেশাজীবী কর্মজীবী মানুষের ভাগ্যের পালা রয়ে গেছে তথৈবচ। ক্ষমতাসীন ব্যক্তি ও পরিবারের ভাগ্য বদলেছে, তারা ধনী থেকে আরো ধনী হয়েছে। জনগণ দরিদ্র থেকে হয়েছে হত দরিদ্র। এই পরিস্থিতিই প্রমাণ করে জাসদের সকল সংগ্রাম ছিল জনগণের পক্ষে তাই প্রতি পর্বেই তারা প্রতিক্রিয়ায়াশীল কায়েমী স্বার্থবাদীদের দ্বারা বাধাগ্রস্থ হয়েছে। তা সত্ত্বেও শ্রমজীবী কর্মজীবী পেশাজীবী জনতার মুক্তির লড়াই অবিরাম গতিতে চালিয়ে যেতে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি বদ্ধ পরিকর। এ লড়াই চলছে , এ লড়াই চলবে। কর্নেল তাহেরের আত্মদান এ লড়াইয়ের পথে আলোকবর্তিকা হয়ে পথ দেখাচ্ছে, অনুপ্রেরণা দিচ্ছে। তাই কর্নেল তাহের অমর। শাহাদাতের ৪৩তম বর্ষে কোটি জনতার কন্ঠে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত আওয়াজ ‘ ছিয়াত্তরের ক্ষুদিরাম, তাহের তোমায় লাল সালাম।’
লেখক: সাবেক জেলা ও দায়রা জজ । বর্তমানে অ্যাডভোকেট বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট , হাইকোর্ট বিভাগ । ঢাকা ।
aniskamal44@yahoo.com