এই ‘সাধুত্বের‘ নৈতিক দায় কার : সা কা ম আনিছুর রহমান খান

দেশের চলমান ঘটনাবলী জনগণকে বিস্মিত করেছে প্রতিনিয়ত দেশ উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলেছে মর্মে রাজন্যদের ভাষণ শুনতে শুনতে ক্ষুধাতুর বেকার নির্যাতিত নিগীড়িত জনগণ নিজেদের সুইজারল্যান্ডের অধিবাসী বলে ভাবতে শুরু করে। সুইজারল্যান্ড , সিঙ্গাপুর দেখার সৌভাগ্য তাদের হয়নি। পুঁতিগন্ধময় সড়ক , অস্বাস্থ্যকর বস্তি , বেসরকারী সংস্থা সমূহ কর্তৃক খাতকদের উপর নিপীড়ন চালিয়ে সুদ আদায় , দুনীতির দায়ে পদচ্যূত উপাচার্যকে বরেণ্য শিক্ষাবিদ হিসাবে বিভিন্ন কর্মকান্ড পরিচালনা করতে দেওয়া , দেশী ও বিদেশী অর্থায়নে জনকল্যাণমূলক প্রকল্প এর তহবিল তছরুপাত, সরকারী প্রয়োজনে কেনা কাটার সময় অবিশ্বাস্য মূল্য দেখিয়ে ভুয়া ভাউচার তৈরী করে পরস্পর যোগসাজসে তহবিল তছরূপ ইত্যাকার ঘটনা দেখে এবং শুনে জনগণ ভাবে ঐসব দেশ বোধ হয় এরকমই খুন, গুমের কারণে সন্তানহারা মায়ের আহাজারি , পিতার আর্তনাদ , বোনের কান্নায় বাংলার আকাশ বাতাস আজ বেদনা বিধুর আকাশে শকুন উড়ছে , জমিনে হায়েনা ঘুরছে, জনগণ তাই দিশেহারা ।রাজন্যবর্গ সাধু সেজে জনগণকে সান্তনা দিচ্ছে, নীতি কথা বলছে, কিন্তু বাস্তব প্রতিকারের কোন কার্যকরি উদ্যোগ নিচ্ছে না।

আধুনিক যুগের জুয়া ‘ক্যাসিনো‘ নিয়ে অনেক লোমহর্ষক তথ্য বেরিয়ে আসছে , আসামীরা একে একে ধরা পড়ছে । এই গ্রেফতার নিয়েও অনেক নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে , এই সব জুয়ার আড্ডা থেকে কে কে কত করে মাসোহারা পেতেন সে বিষয়ে গ্রেফতার হওয়া আসামী ও তাদের স্বজনেরা এখন প্রকাশ্যেই কথা বলছে ৤ এতে নাম আসছে রাজন্যদের ৤ এই তথ্য ‘অসত্য‘ মর্মে কোন বিবৃতি রাজন্যগণ এ পর্যন্ত দেন নাই ৤ জুয়ার আড্ডা থেকে কোটি টাকা নেবার অভিযোগ যে সব রাজন্যর বিরুদ্ধে আসছে তারা এ বিষয়ে নিরব কেন ? সংবিধানের ১৮(২) অনুচ্ছেদে জুয়াখেলা নিরোধের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব রাষ্ট্রের উপর অর্পণ করেছে , এই দায়িত্ব সরকারের উপর বর্তায় ৤ কিন্তু সরকারে যারা আছেন তাদের নিয়েই যখন কথা উঠছে , তখন সাংবিধানিক শাসনের মাধ্যমে নৈতিক চেতনায় সম্বৃদ্ধশালী পরিবার ও সমাজের অস্থিত্ব খুজে পাওয়া দুষ্কর৤ নৈতিক চরিত্র সম্পন্ন মানুষ গড়ে তোলার অনুশীলন আজ আর নেই ৤

এক ঘটনার জের শেষ হতে না হতেই শুরু হচ্ছে আর একটি ঘটনার সূত্রপাত ৤ নতুন বিষয় নিয়ে ঝড় উঠছে ব্যাপক আলোচনার ৤ চাপা পড়ে যাচ্ছে পদ্মাসেতুসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে অনিয়মের প্রসঙ্গ৤ দেশের মেধাবী সন্তানেরা নিশ্চিত অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হচ্ছে ৤ নামকরা উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সন্তানদের ভর্তি করাতে পারলে মা-বাবা স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলে৤ তারা নিজ নিজ ধর্ম বিশ্বাস মতে আল্লাহ , ঈশ্বর বা প্রভূর দরবারে শোকর গুজার করে৤ মনে ভাবে খেয়ে না খেয়ে সন্তানের শিক্ষার খরচ চালাতে পারলে আর কোন চিন্তা করতে হবে না৤ সে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়ে সুখ শান্তি সম্বৃদ্ধির মাঝে জীবন যাপন করতে পারবে , মা বাবা তো বটেই বংশের মুখ উজ্জ্বল করবে ৤ স্বজন ও পাড়া প্রতিবেশীরাও এতে গর্বিত হয় ৤ নিজেদের সন্তানদের উৎসাহিত করে প্রতিবেশীর সন্তানের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির কথা বলে৤ কিন্তু যখন উচ্চ শিক্ষারত সেই সন্তানের লাশ বাহী কফিন আকস্মিকভাবে বাড়িতে পৌছে তখন সবার সব স্বপ্ন আশা আকাংখা গর্ব গৌরব নিমিষে ধূলিসাৎ হয়ে যায় ৤

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মীর মোশতাক এলাহী সালেক ( ১৯৮০ খ্রিঃ) , শাহজাহান সিরাজ ( ১৯৮৪ খ্রিঃ) সহ অনেক ছাত্রের লাশ এভাবেই বাড়ি ফিরে গেছে ৤ তখন ছাত্র-ছাত্রীদের উত্তাল বিক্ষোভের মুখে সরকার , বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলেছিলেন এরূপ ঘটনা আর ঘটবে না৤ কিন্তু তারপরও ছাত্র-ছাত্রী হত্যার ঘটনা ঘটেছে , বন্ধ হয়নি ৤ ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দে শাজাহান সিরাজের শাহাদাত বরণের পর পরই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশনের নাম ফলকে ‘শহীদ শাজাহান সিরাজ রোড‘ উৎকীর্ণ করে দেওয়া হয়েছিল ৤ কর্তৃপক্ষ প্রতিশ্রুতি দিয়ে ছিলেন শাহজাহান সিরাজের মহান আত্মদান স্মরনীয় করে রাখা হবে, স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে শাজাহান সিরাজ এর সংগ্রামী চেতনা হবে আগামী প্রজন্মের দিশারী ৤ কিন্তু এসব কথা ছিল উত্তেজনা প্রশমনের জন্য ছলনাময় বাক্য মাত্র৤ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশনে উৎকীর্ণ ‘শহীদ শাজাহান সিরাজ রোড‘ নামটি মুছে ফেলা হয়েছে ৤ শিক্ষাঙ্গণ এখন ছাত্র-ছাত্রী নিপীড়নের আখড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে ৤ ‘র্যাগ‘ নামে নতুন প্রথা চালু হয়েছে, এই র্যাগের নামে নবাগত ছাত্র ছাত্রীদের উপর শারীরিক মানসিক নৈতিক নিপীড়নের যে সব বর্ণনা আজ প্রকাশিত হচ্ছে তা যার-পর-নাই লোমহর্ষক৤ কিভাবে কোন নৈতিক শিক্ষায় অগ্রজাগণ তাদের অনুজাদেরকে কথিত ‘বড় ভাই‘দের কাছে ‘যাবার‘(!) নির্দেশ দিতে পারেন ? প্রতিবাদমুখর ছাত্রছাত্রীগণ দাবী তুলেছে এসব প্রথা বন্ধ করতে৤ তারা ‘গণ রুম‘ ও ‘গেষ্ট রুম‘ বন্ধ করার দাবী দেওয়ালে লিখে প্রচার করছে ৤ সকলের কাছেই এটা দৃষ্টি গোচর হচ্ছে কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এসব বিষয়ে একেবারেই নিঃরব৤ নতুন নতুন কোর্স ( নৈশ কোর্সসহ ) চালুর মাধ্যমে শিক্ষা সম্প্রসারণের উদ্যোগ বন্ধ করার জন্য উদ্যোগ নিচ্ছে কতিপয় ‘শিক্ষক‘৤ তারা একথা ভুলে যান শিক্ষাাঙ্গণের মালিক এ দেশের জনগণ , শিক্ষকেরা বেতনভোগী কর্মচারী মাত্র৤ শিক্ষা সংকোচনের লক্ষ্য নিয়ে ছাত্র-ছাত্রী ও জনগণকে বিভ্রান্ত করার এখতিয়ার তাদের নাই ৤ তবুও শিক্ষা সংকোচনকামী শিক্ষকদের দাপট ও অপতৎপরতা অব্যাহত আছে৤

বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে এসেই সাম্য মৈত্রী ভ্রাতৃত্ব স্বাধীনতার বাণীর অনুশীলন করতে উদ্বুদ্ধ হয়ে থাকে ছাত্রছাত্রীগণ৤ কিন্তু যখন উপাচার্য ভবনের সদর দরজার সামনে ছাত্র পরিচয়ধারী কতিপয় যুবক ‘ জবাই করা‘র শ্লোগান দেয় এবং এই শ্লোগানদাতাদের পুলিশ নিরাপত্তা বিধান করে তখন বিস্ময় এবং আতংকের অন্ত থাকে না৤ এদের ফিরিয়ে দিতে বা নিবৃত্ত করতে পুলিশ অক্ষম এটা কখনো বিশ্বাসযোগ্য নয় ৤ এই তো সেদিনই দেখলাম শহীদ মিনার অভিমুখে অগ্রসরমান শান্তিপূর্ণ মিছিল পুলিশ থামিয়ে দিল৤ এই মিছিলের পুরোভাগে ছিলেন প্রবীণ রাজনীতিবিদ, বাংলাদেশের সংবিধানের প্রণেতা ডঃ কামাল হোসেন; স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনকারী , ‘ডাকসু‘এর সাবেক সহ-সভাপতি জননেতা আ স ম আবদুর রব : ‘ডাকসু‘এর আরেক সাবেক সহ-সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না প্রমুখ ঐক্যফ্রন্ট নেতৃবর্গ ৤

‘বুয়েট‘এর ছাত্র হত্যার বিষয়টি তদন্তাধীন , তাই এ বিষয়ে বাইরে কথা বলা অনৈতিক৤ এতে তদন্ত বিঘ্নিত হতে পারে, তদন্তকারী কর্মকর্তা বিভ্রান্ত ও দ্বিধান্বিত হতে পারে৤ তবে এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই ‘উপাচার্য‘ হলেন তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ছাত্র-ছাত্রীর অভিভাবক৤ একজন ছাত্র নিহত হয়েছে জানার পর তিনি কেন লাশ দেখতে , জানাজা পড়তে , দাফন করতে আসলেন না৤ এখানেও কি সরকার তাকে বাধা দিয়েছে , বা নিষেধ করেছে ? পদের মায়াটাই কি বড় হয়ে গেলো ! অভিভাবক হিসাবে দায়িত্ব পালনে যদি অক্ষম হন, বিবেক ও নৈতিক বোধ , ধর্মীয় বিধান অনুসরণের তাগিদ যদি তাকে কার্য সাধনে অনুপ্রাণিত না করে তাহলে কেন পদ আঁকড়ে থাকতে চান ! পরবর্তীতে যখন সাধু হয়ে কথা বলেন , শপথ পড়ান ; তখন তিনি সপারিষদ আসলেই কি ‘সাধু‘ বলে সবার কাছে বিবেচিত হবেন৤

বাংলাদেশের পোষাক শিল্প আজ ধ্বংসের মুখে ৤ এই খাত আমাদের অর্থনৈতিক জীবনে গতি সঞ্চার করেছে ৤ শিল্পের জন্য আবশ্যকীয় উপকরণ ( গ্যাস , ফার্নেস ওয়েল ইত্যাদি) এর মূল্যবৃদ্ধি করার কারণে উৎপাদিত পণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে ৤ আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পণ্য প্রতিযোগিতায় হেরে যাচ্ছে৤ শিল্প কারখানা বন্ধ করে মালিক মহল পুঁজি পাট্টা নিয়ে পাড়ি জমাচ্ছে বিদেশে ৤ শ্রমিক কর্মচারীগণ হয়ে যাচ্ছে বেকার ৤ তাদের ঘরে নিত্য অনশন৤
পেঁয়াজ উৎপাদনে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ ৤ যে পরিমাণ পেঁয়াজ উৎপন্ন হয় তা দিয়ে দেশের চাহিদা পূরণ করার পরও উৎবৃত্ত থাকে মর্মে হিসাব প্রকাশিত হয়েছে ৤ পবিত্র ঈদুল আজহার সময়ে রাজশাহীতে পেঁয়াজের পাইকারী দাম ছিল এক শত টাকা ধারা ( অর্থাৎ পাঁচ কেজি পেঁয়াজের দাম টাকা এক শত মাত্র)৤ ঈদের কিছুদিন পরেই এই দাম প্রতি কেজি কেন কি কারণে এক শত টাকার উর্ধে উঠে গেল! ছয় গুণ দাম বেড়ে যাওয়া কখনোই স্বাভাবিক হতে পারে না৤ জনশ্রুতি আছে কতিপয় ব্যবসায়ী অসৎ উদ্দেশ্যে কারসাজি করে এই দাম বাড়িয়েছে ৤ সরকার এই ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে পারছে না কেন ?

এতসব ঘটনার পরও রাজন্যবর্গ বলছেন দেশের উন্নতি ক্রমবর্ধমান৤ দেশ না কি সিঙ্গাপুর সুইজারল্যান্ড হয়ে যাচ্ছে ; অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে কিছুদিনের মধ্যে পিছে ফেলে দিবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে৤ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নিহত হয়ে থাকে এসব কথা বলে বোঝাতে চান আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নিহত হওয়া নিয়ে গুরুত্ব দেওয়া বা হৈ চৈ করার কিছু নাই ৤ তবে যার সন্তান হারিয়েছে সেই বোঝে বেদনা ৤ এসব রাজন্যগণ সাধু হয়ে কথা বলছেন, তারা ইতিহাসের চর্চা করে জনগণকে তা বোঝাতে চান৤ কিন্তু এই ‘সাধুত্ব‘ এর মূল্য জনগণের কাছে কতটুকু ? এই জনগণ এই বাংলার মাটিতেই গণবিরোধী স্বৈরশাসকদের উত্থান পতন পরিণতি সবই দেখেছে ৤ তাদেরকে ইতিহাস শুনিয়ে লাভ নাই৤ ‘ সাধু‘ সেজে পাড় পাবার আশা খুবই ক্ষীণ৤

লেখকঃ সাবেক জেলা ও দায়রা জজ ৤ বর্তমানে অ্যাডভোকেট , বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট , ঢাকা৤