‘রাষ্ট্র অমানবিক বলেই মানুষ সহিংস হয়ে উঠছে’

‘আমাদের জন্য অভিশপ্ত কথা হচ্ছে, রাজনীতি থেকে ধর্মকে বিচ্ছিন্ন করা যায়নি। ধর্মীয় দলগুলো তো করেই, বুর্জোয়া বড় রাজনৈতিক দলগুলোও ধর্মকে ব্যবহার করছে। অথচ, সংবিধানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ হবে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। কোনো বিশেষ ধর্মকে রাষ্ট্র লালন করবে না।’

বলছিলেন, লেখক, গবেষক ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। সম্প্রতি ভোলায় তৌহিদি জনতা ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষের প্রেক্ষাপটে তিনি জাগো নিউজ-এর কাছে এমন মন্তব্য করেন।

রাষ্ট্র ব্যবস্থার সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্র তার অবস্থান থেকে অনেক দূরে সরে এসেছে। এখন ধর্মকে সবাই ব্যবহার করে। এতে করে ধর্মবাদীদের জন্য খুব সুবিধা হয়। এ কারণেই মানুষ অসহিষ্ণু হচ্ছে। মানুষ ক্রমশই ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে। গুজব আর ক্ষোভের প্রকাশ সর্বত্রই দেখতে পাচ্ছি। ভোলায় যে পরিস্থিতি দেখলাম, বুয়েটে আবরার হত্যাকাণ্ডেও তাই দেখতে পেলাম।’

‘মানুষের মনে অনেক অভিযোগ, অনেক রাগ। মত প্রকাশের সব পথ বন্ধ। রাজনৈতিক, গণতান্ত্রিক মত প্রকাশের কোনো পথ নেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে শত্রু মনে করছে মানুষ। বিচার বিভাগের ওপর কোনো আস্থা নেই,’- যোগ করেন এই অধ্যাপক।

মানুষের মাঝে ক্ষোভ প্রকাশের আরেকটি কারণ ‘মাদরাসা শিক্ষার অনুন্নয়ন এবং এখনকার শিক্ষার্থীদের বেকারত্ব’- উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাজনৈতিক কারণে মাদরাসা শিক্ষার বিস্তার ঘটাচ্ছে, কিন্তু সে শিক্ষাকে যুগোপযোগী করা হচ্ছে না। মাদরাসা থেকে হাজার হাজার তরুণ বেরিয়ে আসছে। তাদের কর্ম করার শক্তি আছে। অথচ তারা বেকার। রাষ্ট্র তাদের কর্মের কোনো সুযোগ দিতে পারছে না। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যে তারা উপেক্ষিত হচ্ছে, তা বুঝতে পারছে। এ কারণেই তারা বিক্ষুব্ধ।’

অনিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তি ব্যবস্থার সমালোচনা করে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘ডিজিটালাইজেশনের নেতিবাচক প্রভাবে সহিংসতা বাড়ছে। কোনো প্রকার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জারি না করে প্রযুক্তিকরণের যে ফলাফল, এখন আমরা তাই দেখতে পাচ্ছি। আমরা সম্প্রতি যে সহিংসতা দেখতে পেলাম, তার বেশিরভাগই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ছড়ানোর মধ্য দিয়ে হয়েছে।’

সহিংসতায় রাষ্ট্রকেই দায়ী করে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্র মানুষকে সন্তুষ্ট রাখতে পারেনি। বরং মানুষের অধিকার হরণ করছে প্রতিনিয়ত। মানুষের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। রাষ্ট্র অমানবিক বলেই মানুষ সহিংস হয়ে উঠছে। উন্নয়নের গল্প শোনানো হয়। প্রবৃদ্ধি বাড়ছে, আয় বাড়ছে, অবকাঠামোগত উন্নয়ন হচ্ছে বটে। কিন্তু এগুলোকে মানবিক উন্নয়ন বলা যাবে না।’

‘এ কারণেই মানুষের মধ্যে মনুষত্ব লোপ পাচ্ছে। অপরাধ করলে শাস্তি হয় না, এ ধারণা এখন প্রতিষ্ঠিত। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং জবাবদিহি থাকলে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না। রাজনৈতিক চিন্তার উন্নয়ন না ঘটলে এ সংকট থেকে মুক্তি মিলবে না।’

এএসএস/জেডএ/জেআইএম