ভোটার তালিকা হালনাগাদ করতে বাড়ি বাড়ি যাওয়া-না যাওয়া নিয়ে ইসিতে মতভেদ

ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রমে পরিবর্তন আসছে। হালনাগাদে বাড়ি বাড়ি যাওয়া বন্ধ করার চিন্তা করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ ক্ষেত্রে ভোটার হতে হলে নির্ধারিত নিবন্ধন কেন্দ্রে আসতে হবে। এদিকে ভোটার হালনাগাদে বাড়ি বাড়ি যাওয়া-না যাওয়া নিয়ে নির্বাচন কমিশনারদের মধ্যে মতভেদ দেখা দিয়েছে। একাধিক নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, বাড়ি বাড়ি না গিয়ে নির্ধারিত স্থানে ভোটার করা যেতে পারে। আবার কেউ বলেছেন অনলাইনে ভোটার হওয়ার সুযোগ দেওয়ার কথা। একজন নির্বাচন কমিশনার বাড়ি বাড়ি না যাওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেছেন, বাড়ি বাড়ি না গেলে মৃত ভোটারের তথ্য পাওয়া যাবে না। বাংলাদেশ প্রতিদিন

এ নিয়ে নির্বাচন কমিশনারদের মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রম যুগোপযোগীকরণ এবং ভোটার নিবন্ধন-সংক্রান্ত ফরমসমূহ পুনর্বিন্যাসকরণ কর্মশালায় নতুন কর্মপন্থা নিয়ে প্রস্তাব করেছেন ইসি কর্মকর্তারা। ভোটার তালিকা হালনাগাদে নাগরিকদের তথ্য সংগ্রহে ভবিষ্যতে ‘ডিজিটালাইজড’ কর্মপন্থা বের করার সুপারিশ এসেছে। সে ক্ষেত্রে তথ্য সংগ্রহ ও নিবন্ধন কাজ চলমান রেখে এলাকাভিত্তিক ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ চালুর প্রস্তাবও এসেছে। ইসির কর্মকর্তারা বলছেন, ২০০৭-২০০৮ সালে ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রণয়নের কাজ শুরু হয়। এর পর থেকে নতুন ভোটারদের তথ্য সংগ্রহ, মৃতদের বাদ দেওয়াসহ হালনাগাদ কাজ চলে বাড় বাড়ি গিয়ে। ২০০৯, ’১২, ’১৪, ’১৫ ও ’১৭ সালে হালনাগাদ করা হয়। বর্তমানে ১০ কোটি ৪২ লাখের বেশি ভোটার রয়েছে। একই সঙ্গে এবারের হালনাগাদে চার বছরের (১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সী) তথ্য সংগ্রহ চলছে। বাড়ি বাড়ি যাওয়া নিয়ে নির্বাচন কমিশনারদের মতভেদ : বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ভোটার হালনাগাদ কার্যক্রম ডিজিটালাইজ করা এবং পরবর্তী কর্মপদ্ধতি ঠিক করতে দুই দিনব্যাপী একটি কর্মশালা করে ইসি। কর্মশালায় বাড়ি বাড়ি না গিয়ে নাগরিকদের তথ্য সংগ্রহে কী ধরনের নিবন্ধন ফরম করা প্রয়োজন, আইন-বিধিমালায় কী ধরনের সংশোধন, পরিবর্ধন, পরিমার্জন প্রয়োজন- এসব বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে নির্বাচন কমিশনাররা তাদের মতামত উপস্থান করেন। নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বলেন, ভোটার তালিকার বর্তমান ব্যবস্থায় তথ্য সংগ্রহ ও বায়োমেট্রিক গ্রহণ কার্যক্রম এবং ভোটার তালিকা আইন, ২০০৯ ও ভোটার তালিকা বিধিমালা, ২০১২-এর অসংগতি দূরীকরণ একসঙ্গে সম্পন্ন করার প্রয়োজন রয়েছে। এজন্য নানাবিধ সংশোধন, সংযোজন ও পরিবর্তন অপরিহার্য। এ ছাড়া ভোটার তালিকা হালনাগাদের পদ্ধতি যুগোপযোগী করার জন্য বিদ্যমান ফরমগুলো সহজতর করা আবশ্যক। নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘একসময় আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে যে কোনো ব্যক্তি একাধিক জায়গায় ভোটার হতে পারতেন। সঠিক ভোটার তৈরি করতে হলে ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনতে হবে। সেই সঙ্গে প্রযুক্তির ব্যবহার করতে হবে।

আমরা তা করেছি। প্রথম যখন আমরা শুরু করি, মানিকগঞ্জে পাইলট প্রজেক্ট করেছিলাম।’ তিনি বলেন, ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা মানে নতুন ভোটারদের অন্তর্ভুক্ত করা, মৃত ব্যক্তিদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া এবং একজন ভোটারকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যাওয়া তথা স্থানান্তর করা। বাড়ি বাড়ি না গেলে কী সমস্যা হতে পারে- সে বিষয়ে এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, কেন্দ্রে এসে নতুন ভোটার হওয়া যাবে। কিন্তু যারা মারা গেছেন তাদের তথ্যটা কি কেন্দ্রে পাওয়া সম্ভব্য হবে? এজন্য কী পদক্ষেপ নেওয়া যায় সে বিষয়টি ভাবতে হবে। আবার যেসব ভোটার এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন তাদের কি ভোটার করার নির্ধারিত কেন্দ্রে আনা সম্ভব্য হবে? হিজড়াদের ভোটার করতে হবে। এজন্য অনেক সমস্যা আছে। আগামীতে ভোটার তালিকা হালনাগাদের কাজে প্রযুক্তি কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম বলেন, ‘ঘরে ঘরে ভোটার করতে যাওয়ার দিন শেষ হয়েছে। আমরা সেই জায়গা থেকে বেরিয়ে আসতে চাই। ভোটার হালনাগাদে কেন আমাদের বাড়ি বাড়ি যেতে হবে। যাদের ওপর দায়িত্ব থাকে তারা আদৌ বাড়ি বাড়ি যায় কি না? কেননা মনিটরিংয়ের বিষয়টা দুর্বল।’ তিনি বলেন, ‘ভোটার তথ্য ফরমটা সংক্ষিপ্ত করা যায় কি না। ভোটার তালিকায় নির্ভুল তথ্য যুক্ত করতে পঞ্চম শ্রেণির সার্টিফিকেট কাজে লাগানো যেতে পারে। অনেক বাসায় তথ্য সংগ্রহকারীরা ঢুকতে পারেন না।

নাগরিকদের ভোগান্তি কমাতে আইনের সংস্কার প্রয়োজন হলে আমরা তা-ই করব। প্রাইমারির শিক্ষকদের নিয়োগ দিয়ে ভোটার তালিকার জন্য বাড়ি বাড়ি যাওয়ার বিষয়টা আমরা চাই না। এর সঙ্গে অর্থেরও একটা ব্যাপার জড়িত। বাড়ি বাড়ি না গিয়ে, যে কেন্দ্রে ভোটার নিবন্ধনের কাজ করছি, সেখানেই যদি আমরা ভোটার করার জন্য আনার ব্যবস্থা করি তাতে সময় কম লাগবে। ব্যয়ও কমবে।’ নির্বাচন কমিশনার শাহাদাত হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘ইসি আইনের মধ্যে চলে। আমাদের এখতিয়ারের মধ্যে যা আছে, প্রয়োজনে আমরা আইনি পরিবর্তন করতে পারি কি না।’ ভোটার হালনাগাদে বাড়ি বাড়ি যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তথ্য সংগ্রহকারীরা বাড়ি বাড়ি আর যেতে চান না। এজন্য আমরা এমন কিছু করতে পারি কি না যে বাড়ি বাড়ি না গিয়েই তালিকা তৈরি করা যাবে।’ তথ্য সংগ্রহ ও নিবন্ধনের কাজ একসঙ্গে করার পরামর্শ দেন তিনি। তিনি বলেন, ‘যারা প্রবাসী তাদের আমরা ভোটার হতে অনলাইনে রেজিস্ট্রেশন করার সুযোগ দিচ্ছি। যারা ভোটার হওয়ার যোগ্য আমরা তাদের অনলাইনে ভোটার হওয়ার সুযোগ দিতে পারি।’ তিনি বলেন, ভোটারদের ঠিকানা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তাই সেই বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।

একগুচ্ছ পরামর্শ কর্মকর্তাদের : পর্যায়ক্রমে সব নাগরিকের হাতে জাতীয় পরিচয়পত্র তুলে দিতে চায় কমিশন। প্রাথমিকভাবে ১০ বছর বয়সী, পরে শূন্য থেকে পাঁচ বছর বয়সীদেরও জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এজন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা কঠিন। থানা বা উপজেলা পর্যায়ে স্থায়ীভাবে নিবন্ধন কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। ইসির কর্মকর্তারা বলেন, ভোটার তালিকা হালনাগাদের সময় আইনে থাকলেও কিছু তথ্য সংগ্রহকারীর যেমন ভোটারদের বাড়িতে না যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে, তেমনি বাড়িতে গেলেও ভোটারদের পাওয়া যায় না। অনেক ক্ষেত্রে ঢাকা শহর বা অন্যান্য বিভাগীয় শহরে বাড়িতে প্রবেশের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েন তথ্য সংগ্রহকারীরা। বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের তথ্য সংগ্রহ করার সনাতন পদ্ধতির পাশাপাশি এলাকাভিত্তিক নিবন্ধন কেন্দ্র খুলে ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ দেওয়া যেতে পারে। এখানে তথ্য ফরম পূরণ করা, নাগরিকদের চোখের আইরিশ ও ১০ আঙুলের ছাপ নেওয়ার কাজ করার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। ‘ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রম যুগোপযোগীকরণ এবং ভোটার নিবন্ধনসংক্রান্ত ফরমসমূহ পুনর্বিন্যাসকরণ’-সংক্রান্ত কর্মশালায় নতুন উদ্যোগ নেওয়ার একগুচ্ছ প্রস্তাব এসেছে।