‘যার জমি আছে, ঘর নেই’ প্রকল্পে নয়ছয়

পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে প্রধানমন্ত্রীর দেয়া ‘যার জমি আছে ঘর নেই’ গৃহ নির্মাণ আশ্রয়ন প্রকল্প-২ নিয়ে নানা অভিযোগ ওঠেছে। ২৮২টি ঘরের জন্য বরাদ্দ ২ কোটি ৮২ লক্ষ টাকা প্রকল্প বাস্তবায়নের আগেই নিজেদের পকেটে ভরেছেন ঠিকাদাররা। কাজ অসমাপ্ত রেখেই টাকা তুলে নিয়েছেন তারা। অন্যদিকে অনেক সচ্ছল ব্যক্তি ঘর পেলেও পাননি প্রকৃত দাবিদাররা। এছাড়া টাকা বিনিময়ে ঘর বন্টন হচ্ছে- এমন অভিযোগও রয়েছে।

সরজমিনে জানা যায়, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারের অফিস সহকারি কাম-কম্পিউটার অপারেটর মো. মিরাজুল ইসলামের যোগসাজসে দু’জন সাব-ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তিপত্র করেন। ভুক্তভোগীরা ত্রাণের ঘরগুলো ভেঙ্গে নতুন করে ইটের তৈরী পাকা ঘর নির্মাণ করেছেন। অর্থের বিনিময় অনেক স্বচ্ছল ব্যক্তি ত্রাণের ঘর পেয়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে একই পরিবারের নামে দু’টি ঘরও পেয়েছেন।

এখন পর্যন্ত অনেক ঘরের কাজ বাকী আছে বলে জানান, আমড়াগাছিয়া ইউপি চেয়ারম্যান সুলতান আহমেদ। অথচ কাজ সম্পন্ন না করে সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে এ প্রকল্পের ২৮২টি ঘরের প্রায়ই পুরো টাকা উত্তোলন করে নিয়ে গেছে ঠিকাদার ও ইউপি চেয়ারম্যনরা।

সরজমিনে আরও জানা যায়, জুন ক্লোজিং এর নামে অর্থ ফেরৎ যাওয়ার অজুহাত দেখিয়ে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার যোগসাজসে সমুদয় টাকা উত্তোলন করে টাকাগুলো নিজেদের নামে করা নতুন একটি একাউন্টে রাখেন। ওই বছরের আগস্ট মাসে ঘর উত্তোলনের কাজ শুরু করেন। ২৮২টি ঘরের মধ্যে চুক্তি অনুযায়ী কাকড়াবুনিয়া ইউপি সদস্য বারেক মেম্বারের ১০৩টি ও ইউএনও অফিসের কম্পিউটার অপারেটর মিরাজের ভগ্নিপতি মাহবুবুর রহমান মালেক ১০৭টি ঘর নির্মাণের চুক্তি করেন। বাকী ৭২টি ঘর স্ব স্ব ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যানরা নির্মাণ করবেন বলে চুক্তি হয়। কিন্তু পুরো টাকা নিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত ঘর বুঝিয়ে দেয়াতো দূরের কথা, নির্মাণ কাজই শেষ হয়নি।

এছাড়াও পিআইও ও নির্বাহী অফিসারের অফিস সহকারি কাম-কম্পিউটার অপারেটর মো. মিরাজুল ইসলাম দু’জনেই ঠিকাদার ও ইউপি চেয়ারম্যানদের কাছ থেকে প্রতি ঘরে ১০ হাজার টাকা করে মোট ২৮ লাখ ২০ হাজার টাকা ঠিকাদারদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সরকারি নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে হতদরিদ্র ও অসহায় ভূক্তভোগীদের কাছ থেকে উল্টো ঘর নির্মাণের মালামালের পরিবহন খরচ বাবদ ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা করে হাতিয়ে নিয়েছেন স্থানীয় সাব ঠিকাদাররা। এদের মধ্যে কেউ কেউ ভিক্ষা করেও ওই টাকা পরিশোধ করেছেন। এসব অনিয়ম নিয়ে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে একাধিকবার জানানো হলেও তিনি কোন ব্যবস্থা নেননি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মির্জাগঞ্জ গ্রামের লাল মিয়া গোলদার, ছৈলাবুুনিয়া গ্রামের রাসেল মল্লিক এবং মো. হযরত আলী হাওলাদার ত্রাণের ঘর বরাদ্ধ হলেও এখন পর্যন্ত বুঝে পাননি। ভুক্তভোগীরা বলেন, এমন নিম্ন মানের ইট, কাঠ, সিমেন্টের খুঁটি দিয়েছে যে, এখনই তা ভেঙ্গে যাচ্ছে।

দক্ষিণ মির্জাগঞ্জ গ্রামের উপকারভোগী দুলু বেগম বলেন, ঘর বরাদ্দ পেয়ে খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু ইউপি সদস্য মো. ইসমাইল হোসেন আমার কাছ থেকে ৩৫ হাজার টাকা নিয়েছে ঘর পাইয়ে দেয়ার জন্য এবং পরিবহন খরচ বাবদ ঠিকাদার নিয়েছে ৬ হাজার টাকা।

বাসন্ডা গ্রামের ভিক্ষুক সাধনা রানী বলেন, আমার স্বামী ও আমি দু’জনেই ভিক্ষা করি অথচ ঠিকাদারকে পরিবহন খরচ বাবদ ভিক্ষা করে ৬ হাজার টাকা দিয়েছি।

সাব ঠিকাদার মো. আবদুল বারি (বারেক) ও আবদুল মালেক বলেন, প্রতিটি ঘরে বরাদ্দ কম থাকার কারণে উপকার ভোগীদের কাছ থেকে পরিবহন খরচ নেয়া হয়েছে। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার নির্দেশে আমাদের নিতে বলেছেন।

ইউএনও অফিসের অফিস সহকারি কাম-কম্পিউটার মো. মিরাজুল ইসলাম বলেন, তৎকালীন ইউএনও স্যার ও পিআইও স্যারের কাছে ঘর নির্মাণের ফাইল রাখা আছে। সাব-ঠিকাদারা ও ইউপি চেয়ারম্যানরা ইউএনও স্যারের কাছ থেকে ঘর নির্মানের জন্য এক মাসের সময় নিয়েছে।

এ ব্যাপারে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম (অ. দা.) বলেন, ‘যার জমি আছে ঘর নেই’ আশ্রয়ন প্রকল্পের ঘর নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার কথা অনেক আগেই। তবে ২০১৭-১৮ অর্থ বছরের কাজ দু’বছরেও কেন শেষ হয়নি তা আমি জানি না। এমনকি এ প্রকল্পের ফাইলটি আমার অফিসে পাওয়া যায়নি। তবে শুনেছি এ প্রকল্পের ফাইলটি উপজেলা নির্বাহী অফিসারের অফিস সহকারি কাম-কম্পিউটার মো. মিরাজুল ইসলামের কাছে রয়েছে। প্রকল্পের কাজ শেষ করতে ঠিকাদার ও ইউপি চেয়ারম্যানদের নির্দেশ দিয়েছি। আশা করছি আগামী এক মাসের মধ্যে ঘরের কাজ সম্পন্ন হয়ে যাবে এবং ঘর নির্মাণে কোন অনিয়ম হয়ে থাকলে ঠিকাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. সরোয়ার হোসেন বলেন, এ প্রকল্পটি প্রধানমন্ত্রীর একান্ত ব্যক্তিগত প্রকল্প। এ প্রকল্পে যেসব ঘর এখনও অসমাপ্ত রয়েছে সেসব ঘরের তালিকা তৈরি করে কাজ শেষ করার জন্য উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।