বাংলার ঘরে নতুন শাইলকের আবির্ভাব: সা কা ম আনিছুর রহমান খান

পবিত্র কোরআন শরীফে সুদ আদান প্রদান হারাম করা হয়েছে । বিদায় হজের ভাষণে মহানবী ( সাঃ আঃ ) বলেছেন , ‘……সাবধান কোন মানুষের প্রতি অত্যাচার করো না! অত্যাচার করো না! অত্যাচার করো না! …আমি তোমাদের কাছে যা রেখে যাচ্ছি দৃঢ়তার সাথে তা অবলম্বন করলে তোমরা কদাটিৎ পথভ্রষ্ট হবে না ; তা হচ্ছে-আল্লাহর কিতাব ও তার রসুলের আদর্শ।…হে লোক সকল ! শয়তান নিরাশ হয়েছে , সে আর কখনও তোমাদের দেশে পূজা পাবে না। কিন্তু সাবধান, অনেক বিষয় তোমরা ক্ষুদ্র মনে করে থাক অথচ শয়তান তারই মধ্যবর্তীতায় অনেক সময় তোমাদিগের সর্বনাশ সাধন করে থাকে।; ঐগুলি সম্বন্ধে খুব সতর্ক থাকবে ’ …সুদ হারাম করা হলো। খাতক শুধু আসল ফেরত দেবে; আর এর শুরু হবে আমার চাচা আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব থেকে ।……’।‘ তবুও মুসলমান সমাজে সুদের কারবার চলছে ।

শেক্সপিয়ারের নাটকের কুসিদজীবী শাইলকের কথা শিক্ষিত সমাজ আজো মনে রেখেছে প্রজন্ম পরম্পরায়৤ । সুদসহ ঋণের অর্থ পরিশোধ করতে না পারলে খাতকের শরীর থেকে গোশত কেটে নেওয়া হবে; এটাই ছিল ঋণদাতার সাথে খাতকের ঋণ আদান-প্রদানের চুক্তি৤। সময় মতো খাতক ঋণ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়৤ । বিষয়টি আদালতে গড়ায় । ঝানু আইনজীবী পরশিয়া বললেন গোশত কেটে নেবেন ঠিক আছে , আমার মক্কেল তা মেনে নিবে কারণ সে এইমর্মে চুক্তিতে আবদ্ধ। ; তবে গোশত কাটার সময় এক ফোঁটা রক্ত ঝরাতে পারবেন না;। চুক্তিতে রক্ত ঝরানোর কথা নাই ।৤ মোক্ষম যুক্তি।৤ পরশীয়ার কথা এড়ানোর কোন পথ নাই।; তাই চুক্তিটি বাস্তবায়িত হতে পারলো না। ৤ নিষ্ফল এক চুক্তির ফলাফল নিয়ে রিক্ত হাতে ফিরে যেতে হলো শাইলককে।৤

বাংলাদেশে এখনও মহাজনী প্রথা , দাদন প্রথা বিভিন্ন প্রকারে চালু আছে। ৤ স্বাধীনতার পর কাবুলীওয়ালারা চলে গেলেও তাদের স্থান পূরণ করে আছে নতুন কাবুলীওয়ালা ৤ । শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক বৃটিশ শাসন আমলে অবিভক্ত বাংলার প্রধান মন্ত্রী থাকাকালে ‘ঋণ শালিশী বোর্ড ‘ প্রতিষ্ঠা করে বাংলার ঋণভারে জর্জরিত প্রজা ও কৃষকদেরকে ঋণভার থেকে মুক্ত করেছিলেন।৤ ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দের পূর্ববঙ্গ জমিদারী দখল ও প্রজাস্বত্ব আইন (১৯৫১খ্রিষ্টাব্দের আইন নং ২৮) কার্যকর হলেও জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত হয়েছে বটে কিন্তু জোতদারী শোষণ বন্ধ হয়নি৤ ।জমির ব্যক্তিগত মালিকানার সর্বোচ্চসীমা এবং সমুদ্রে জাগা চরের মালিকানা সংক্রান্ত বিষয়ে ধণিক বণিক প্রভাবশালী কায়েমী স্বার্থবাদী মহলের অধিপত্য ও প্রভাব প্রতিপত্তি এখনও সদম্ভে বিরাজমান। ৤ এর সাথে যুক্ত হয়েছে ক্ষুদ্র ঋণদাতার নামে ‘বেসরকারী সংস্থা‘ ( NGO )৤ এসব সংস্থা ব্যাংকের কাছ থেকে সুদে ঋণ নিচ্ছে এবং তা ক্ষুদ্রঋণ নামে গরিব মানুষের মাঝে বিতরণ করছে। ;তাদের কাছ থেকে সুদ নেওয়া হচ্ছে প্রায় ২৮% হারে। [ কখনো কখনো , কোথায়ও কোথায়ও , সুযোগ বুঝে তারও বেশী ]। গরিবেরা যখন তা পরিশোধ করতে পারছেনা ; ।তখন তাদের উপর পুলিশ চড়াও হচ্ছে, ব্যক্তিগত অনুরোধে , পিটুনি দেওয়া হচ্ছে।৤ ঋণদানের সময় খাতকের কাছ থেকে দস্তখত করিয়ে রাখা ব্যাংকের চেক ব্যবহার করে আদালতে মামলা করা হচ্ছে।৤ এভাবে এনজিওদের হাতে গরিব জনগণ শোষিত ও নির্যাতিত হচ্ছে বলে ব্যাপক অভিযোগ আসছে৤ প্রতিনিয়ত অভিযোগ আসছে সুদের টাকা আদায় করার জন্য কিছু কিছু এন জি ও গুন্ডা বাহিনী লালন করছে এবং পুলিশের সাথেও গড়ে তুলছে সখ্যতা৤ । গরিবের রক্ত চুষে সুদ আদায় করে এ সকল সংস্থা অঢেল সম্পদের মালিকানা অর্জন করছে ৤ এরপর নিজ প্রতিষ্ঠানের সম্পদ নিজেরাই আত্মসাৎ করছে বিভিন্ন কেনা কাটায় ‘ভূয়া‘ ভাউচার ব্যবহার করে ৤ অনেক ক্ষেত্রেই অস্থিত্বহীন দোকানের নাম ব্যবহার করে তৈরী করা হচ্ছে এসব ভাউচার৤ ‘ক্ষুদ্রঋণ নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ‘ ( Micro credit Regulatory Authority ) , ‘পল্লী-কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন‘ ( Polli-Kormo Sohayak Foundation , PKSF ) সহ বেশ কিছু সংস্থা এসব বিষয়ে ‘বে-সরকারী সংস্থা‘ সমূহের কর্মকান্ড দেখভাল করে থাকেন৤ এসব কর্তৃপক্ষ ও ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তাদের অধিকাংশই সততা ও নিয়মনিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করে থাকেন৤ তাঁরা তাদের ‘পরিদর্শন‘ ও ‘নিরীক্ষা‘ প্রতিবেদনে অনেক সময়ই এসব অনিয়ম ,অসততা এবং সংস্থার কর্মকর্তাদের অযোগ্যতা ও দুর্নীতির বিষয়ে সুস্পষ্টভাবেই উল্লেখ করেছেন বলে জানা যায় ৤ সেই সাথে আরো জানা যায় যে এই সব প্রতিবেদন আমলে নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও ফাউন্ডেশন যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করে নাই ৤ যার কারণে এইসব বে-সরকারী সংস্থা থেকে দ্ররিদ্র জনগোষ্ঠির জীবন ও জীবিকার ক্ষেত্রে কোন উন্নতি হয়নি৤ তবে সংস্থার কর্মকর্তাদের শনৈ শনৈ উন্নতি হয়েছে ৤ মাঠ পর্যায়ের কর্মী ও সহায়ক কর্মীগণ সময়সূচীর তোয়াক্কা না করে কাজ করে গেলেও তাদের ভাগ্যের কোনই ইতিবাচক পরিবর্তন হয়নি৤

এইসব সংস্থাগুলো বিদেশী অনুদানের অর্থে বিভিন্ন প্রকল্প পরিচালনা করে থাকে৤ এখানেও আর্থিক সততার অভাব ও ভাউচার নিয়ে অনিয়মের ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে ৤ আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের কারণে কালো তালিকাভুক্ত ব্যক্তিরাও পুনরায় প্রকল্প পরিচালনার জন্য বিদেশী অনুদানের অর্থ বরাদ্দ পেয়েছেন বলে রটনা রয়েছে ৤ এটা পাবার জন্য মূল কর্তৃত্ব নিজের হাতে রেখে বরাদ্দ পাবার জন্য নিকট স্বজনদের নাম ব্যবহার করা হয়েছে৤ এ জন্য আবার ‘লবিষ্ট‘ নিয়োগ করে থাকে তারা৤ এইসব ‘লবিষ্ট‘গণ উল্লিখিত সংস্থাগুলোতে ‘প্রশিক্ষক‘ হিসাবে কাজ করেন এবং অস্বাভাবিক ও বহুগুণ বেশী পারিশ্রমিক গ্রহণ করে থাকেন ৤ বিনিময়ে তারা বিদেশী অনুদানের অর্থ উক্ত সংস্থাগুলোকে পাইয়ে দেবার জন্য তৎপর হন৤ বাধা আসতে পারে এরূপ তথ্য কৌশলে গোপন করেন ৤ অনেক ক্ষেত্রেই তারা সফল হন৤ এর ফলে বিদেশীগণ কর্তৃক দেশের দরিদ্র , হত দরিদ্র মানুষের জন্য যে অর্থ এ দেশে পাঠান তা উক্ত মানবগোষ্ঠির কোন কাজে লাগে না৤ কুসিদজীবী সংস্থাগুলোর উপর পর্যায়ের কতিপয় ব্যক্তি আত্মসাৎ করে নিজেদের ভাগ্য গড়ে নেয়৤ কিন্তু শ্রমজীবী কর্মজীবী পেশাজীবী জনগণ এসব সংস্থা থেকে কোনভাবেই উপকৃত হন না৤

এইসব সংস্থাগুলো আবার বিভিন্ন ব্যাংক থেকেও ঋণ নিয়ে থাকে৤ তা নিতে গিয়ে অনেক সময়ই তারা জমি বা স্থাবর সম্পত্তি বন্ধক রাখে ৤ একই সম্পত্তি একাধিক ব্যাংকের কাছেও বন্ধক রাখা হয়, স্বত্ব অর্জন সম্পর্কিত তথ্য গোপন করে ৤ দলিল জমা দেবার সময় কৌশল অবলম্বন করা হয় ৤ নিঃস্বত্ববান ব্যক্তির কাছ থেকে দলিল করে নিয়েও এটা করা হয় ৤ যেমন নাবালকের সম্পত্তি তার মা এর কাছ থেকে ক্রয় করার দলিল৤ ‘অভিভাবক ও প্রতিপাল্য‘ আইন , ১৮৭৩ ( Guardian and Words Act , 1873 ) ( ১৮৭৩ খ্রিষ্টাব্দের ৮নং আইন ) অনুসারে এখতিয়ারসম্পন্ন আদালতের অনুমতি ছাড়াই এটা করা হয় ৤

এভাবেই কতিপয় ‘বে-সরকারী সংস্থা‘ অবাধে বিধি বিধান উপেক্ষা করে চালিয়ে যাচ্ছে তাদের কর্মতৎপরতা৤ ক্ষতিগ্রস্থ , বঞ্চিত, শোষিত, নিষ্পেষিত হচ্ছে শ্রমজীবী , কর্মজীবী , পেশাজীবী জনগণ ৤ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ ব্যাংক, অন্যান্য তফসিলি ব্যাংক এবং জনগণকে এর প্রতিরোধ ও প্রতিবিধানের জন্য এগিয়ে আসতে হবে৤ ধোপ দুরস্ত সাদা পোষাক পরা এই সব নব্য শাইলকদের খপ্পর থেকে জনগণকে মুক্ত করতে হতে হবে সবাইকে দৃঢ় ও ঐক্যবদ্ধ ৤

লেখকঃ সাবেক জেলা ও দায়রা জজ এবং বর্তমানে অ্যাডভোকেট বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট , হাইকোর্ট বিভাগ , ঢাকা৤
পাক্ষিক আলোর মিছিল ১-১৫ই অক্টোবর ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দ / ১৬-৩০ শে আশ্বিন ১৪২৬ ) এ প্রকাশিত।