রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্যে মিয়ানমার নিরাপদ নয়:জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্তকারী

জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্তকারী ইয়াংঘি লি এ মন্তব্য করে জানিয়েছেন, রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন-নির্যাতন বন্ধে কার্যকর বিধি-ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে নেপিদো ব্যর্থ হয়েছে। শুক্রবার সাধারণ পরিষদে বিলি করা এক প্রতিবেদনে এই অভিযোগ করেছেন জাতিসংঘের নিয়োগকৃত মিয়ানমার বিষয়ক এই তদন্তকারী। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এখনও উত্তর রাখাইনে থেকে যাওয়া রোহিঙ্গারা আতঙ্কজনক পরিবেশে বসবাস করছে। এপি, ইউএনবি।

রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে বাংলাদেশ-মিয়ানমার প্রত্যাবাসন চুক্তি সম্পন্ন হয়। একই বছরের ৬ জুন নেপিদোতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে মিয়ানমার ও জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর মধ্যেও সমঝোতা চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী, গত বছরের ১৫ নভেম্বর প্রথমবারের মতো রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। তবে আবারও হামলার মুখে পড়ার আশঙ্কায় রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরতে অস্বীকৃতি জানায়। দ্বিতীয় দফায় গত ২২ অগাস্ট রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের তারিখ নির্ধারিত হলেও সেই উদ্যোগও ব্যর্থ হয়। সম্প্রতি শেষ হওয়া জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের পার্শ্ববৈঠকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চীনের সঙ্গে যৌথ ওয়ার্কিং কমিটি গঠনে সম্মত হয় মিয়ানমার ও বাংলাদেশ।

এমন প্রেক্ষাপটে শুক্রবারের প্রতিবেদনে জাতিসংঘের তদন্তকারী ইয়াংহি লি বলেন, রাখাইনে থেকে যাওয়া রোহিঙ্গারা তাদের গ্রামের বাইরে যেতে পারছে না, জীবিকা উপার্জন করতে পারছে না। ফলে তাদেরকে নির্ভর করতে হচ্ছে সেখানে প্রবেশের সুযোগ পাওয়া সীমিত মানবিক সাহায্যের ওপর। তিনি বলেন, যখন এই পরিস্থিতি বিরাজ করছে তখন শরণার্থীদের স্থায়ীভাবে ফিরে যাওয়া নিরাপদ নয়।

২০১৭ সালের ২৫ অগাস্টে রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার ঘটনার পর পূর্বপরিকল্পিত ও কাঠামোগত সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে নতুন করে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সাত লাখেরও বেশি মানুষ। তাদের সঙ্গে রয়েছেন ১৯৮২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত নানা অজুহাতে নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচার জন্যে বাংলাদেশে পালিয়ে আশ্রয় নেওয়া আরও অন্তত সাড়ে তিন লাখ রোহিঙ্গা। সব মিলে বাংলাদেশে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। আর এখনও রাখাইনে থেকে গেছে আরও কয়েক লাখ রোহিঙ্গা।

শুক্রবারের প্রতিবেদনে জাতিসংঘের তদন্তকারী ইয়াংঘি লি মিয়ানমারে রোহিঙ্গা গ্রামের বসতি গণনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, প্রশাসনিক নথি থেকে রোহিঙ্গাদের নিশ্চিহ্ন করতে এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে আর এতে তাদের ফিরে আসার সম্ভাবনা আরও সংকুচিত হবে। লি জানান, তিনি এখনও রোহিঙ্গাদের মারধর, হত্যা, বাড়িঘর ও চালের গুদাম পুড়িয়ে দেওয়ার খবর পাচ্ছেন।

মিয়ানমার সরকার ও সেনাবাহিনী বরাবরই মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। তাদের দাবি বিদ্রোহী হামলার প্রেক্ষিতে বৈধ অভিযান চালাচ্ছে তারা।

ইয়াংঘি লি মিয়ানমার সেনাবাহিনীর মালিকাধীন সব কোম্পানি ও ৬ জন শীর্ষ সেনা কর্মকর্তা আর তাদের পরিবারের সদস্যদের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার জন্যে জাতিসংঘ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। মিয়ানমার বিষয়ক স্বাধীন আন্তর্জাতিক তথ্য অনুসন্ধানী কমিশন এদেরকেই ২০১১ সাল থেকে সংগঠিত গুরুতর অপকর্মের জন্যে দায়ি করেছে।

ইয়াংঘি লি উল্লেখ করেন, স্বাধীন কমিশন তাদের রিপোর্টে বলেছে, মিয়ানমার সরকার উন্নয়নের অজুহাতে উত্তর রাখাইনের চিরাচরিত পুরো পরিবেশ বদলে দিতে সমন্বিত প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।