আরো ৪ এমপির সাক্ষাৎ আলোচনায় খালেদার চিকিৎসা, জামিন

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন দলের আরো চার এমপি। গতকাল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে তারা খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তার স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নেন । আগের দিন দলের তিন এমপি খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে জানিয়েছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন জামিন পেলে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাবেন। গতকাল সাক্ষাতের পরও এমপিরা জানিয়েছেন খালেদা জিয়া খুবই অসুস্থ। এই মুহুর্তে তার উন্নত চিকিৎসার দরকার। তার জামিনের বিষয়টি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয় বলেও তারা উল্লেখ করেছেন। দলীয় এমপিদের সাক্ষাতের পর এখন খালেদা জিয়ার জামিনের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। তার জামিন নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনার অংশ হিসেবে গতকাল আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে কথা বলেন বিএনপি দলীয় এমপি হারুনুর রশিদ।
এদিকে ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন, তিনি বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও অবহিত করেছেন। যদিও তিনি জানিয়েছেন এটি আদালতের বিষয়। দলীয় সূত্র জানিয়েছে, সরকারের সঙ্গে কোন সমঝোতা নয়, খালেদা জিয়ার অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তার জামিন নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।

সংসদ সদস্য হারুনুর রশিদ মানবজমিনকে বলেন, আমরা খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে জানিয়েছি। এ বিষয়ে আমরা সরকারে সঙ্গে আলোচনা করছি। আদালতে জামিন চাইছি। উনি যে মামলায় বন্দি রয়েছেন এটাতো রাজনৈতিক মামলা। বাংলাদেশের ইতিহাসে হাজার হাজার রাজনৈতিক মামলা হয়েছে এবং পরবর্তীতে জামিনে মুক্তির পর মামলাগুলো খালাশ হয়ে গেছে। আর খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে সরকারের সঙ্গে কোন সমোঝতা হচ্ছে না।
প্রধানমন্ত্রী এবং ওবায়দুল কাদেরের কাছে জামিনের বিষয়টি জানানোর পর তারা পজেটিভ কোন সাড়া দিয়েছে কিনা জানতে চাইলে হারুন বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে জানানোর বিষয়টিতো আর আজকে নতুন নয়। আমরা এর আগেও পার্লামেন্টে বলেছি। আজ (বুধবার) ওবায়দুল কাদের সাহেবকেও ম্যাডামের শারিরীক সমস্যার কথা জানিয়েছি। এবং উনার জামিনের বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য বলেছি। উনারা বিষয়টি আমাদের জানাবে বলেছেন।

আপনি বলেছেন খালেদা জিয়া মুক্তি পেলে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাবেন। এই কথার সাথে উনার প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে কোন সম্পৃক্ততা আছে কিনা জানতে চাইলে হারুন বলেন, না এই কথার সাথে প্যারোলে মুক্তির কোন সম্পর্ক নেই। এটা পরিস্কার বিষয় উনি জামিনে মুক্ত হলে তার শারিরীক চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাবেন। উনার যে অবস্থা সেটার জন্য তার উন্নত চিকিৎসা দরকার।
এদিকে বুধবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, দুর্নীতি মামলায় কারাবন্দি খালেদা জিয়া জামিন পেলে যে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে চান, সে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকে জানানো হয়েছে। বিএনপির সেই সংসদ সদস্য নিজেও প্রধানমন্ত্রীকে বলেছেন। জামিন পেলে চিকিৎসকরা যদি খালেদাকে বিদেশে নেয়ার পরামর্শ দেন, তখনই সরকার বিষয়টি দেখবে। খালেদা জিয়ার সঙ্গে সরকারের কোন শত্রুতা নেই।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল মানবজমিনকে বলেন, সংবিধানেই বলা আছে, একজন বয়স্ক নারী, শিশু জামিনের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন। তাই সাংবিধানিকভাবেই খালেদা জিয়া জামিন পাওয়ার যোগ্য। তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং সিনিয়র সিটিজেন তিনি। কিন্তু সরকার নানা কৌশলে তার জামিন দিচ্ছে না।
খালেদা জিয়ার জামিন নিয়ে সরকারের সঙ্গে কোন সমঝোতা বা আলোচনা হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, সরকারের সঙ্গে আলোচনা যাই হচ্ছে তা ম্যাডামের জামিনের বিষয়ে এবং তা প্রকাশ্যে। এই নিয়ে গোপনে কোন আলোচনা হচ্ছে না। আর প্যারোলের বিষয় সম্পূর্ণ ম্যাডামের ব্যক্তিগত ব্যাপার। রোগীর সুস্থতার জন্য রোগীই ভাল বলতে পারবেন কোন পদ্ধতিতে গেলে ভাল হয়। জীবনে অনেক দুর্যোগ মোকাবেলা করার অভিজ্ঞতা উনার আছে। তাই এই ক্ষেত্রে উনি যথাপোযুক্ত সিদ্ধান্ত নেবেন এমনটাই আমরা বিশ্বাস করি। তবে আমরা এটা নিয়ে কোনো রাজনীতি করতে চাই না।

এদিকে গতকাল বিকালে বগুড়া-৬ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম মোহাম্মদ সিরাজের নেতৃত্বে বিএসএমএমইউতে খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করেন ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের সংসদ সদস্য জাহিদুর রহমান জাহিদ, বগুড়া-৮ আসনের সংসদ সদস্য মোশাররফ হোসেন এবং সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। প্রায় এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে খালেদা জিয়ার সঙ্গে সময় কাটান তারা। সাংবাদিকদের জিএম সিরাজ বলেন, আজ ১৮ মাস হলো দেশনেত্রী একটা সাজানো মামলায় ফরমায়েশি রায়ে বন্দি। ম্যাডাম জিয়ার শারিরীক অবস্থার বিষয়ে ইতিমধ্যে নেতৃবৃন্দ দেশবাসীকে জানিয়েছেন। অত্যন্ত অমানবিকভাবে আজকে ম্যাডামকে বন্দি করে রাখা হয়েছে। তার শরীর অবশ হয়ে গেছে। হাত পা চালাতে পারেন না। মাথার চুল নিজে আচড়াতে পারেন না। বাথরুমে নিজে যেতে পারেন না। সবকিছুতেই অন্যের সাহায্য নিয়ে করতে হয়। আমি এবং আমরা যারা সাতজন সংসদ সদস্য রয়েছি সাংবাদিকদের মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং সংসদ নেতার কাছে বলতে চাই, আপনি নিজে একবার আসুন। আপনি দেখে যান এই দেশের তিন তিনবারের প্রধানমন্ত্রীকে। আমরা নিশ্চিত আপনি যদি বেগম খালেদা জিয়াকে দেখেন তাহলে, আপনার মানবিক বোধ জাগ্রত হবে। আপনার মায়া হবে। আমরা বিশ্বাস করি ওনি রাজনৈতিক বন্দি। তাই ওনার জামিনের জন্য রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত দরকার। আপনি আমলাতান্ত্রিক পরামর্শ না নিয়ে রাজনৈতিক দুরদর্শিতায় আপনি ওনার জামিনের ব্যবস্থা করে দিন। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছাড়া ম্যাডামের মুক্তি হবে না। আমরা সংসদ সদস্য হিসেবে আপনি সংসদ নেতার কাছে আমাদের অনুরোধ আপনি খালেদার জিয়ার মুক্তির পদক্ষেপ নিন।

ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, ওনার অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক। ওনার ডায়াবেটিস খালি পেটেও ১১ থেকে ১২ এর নিচে নামছে না। ওনি মাত্র দুই বেলা খেতে পারেন। তাও সামান্য। তার শারিরীক অবস্থা এতোটাই নাজুক যে ওনি হাত নাড়তে পারছেন না। কোন সাহায্য ছাড়া নিজে চলতে পারছেন না। এছাড়া ওনার এখানে সেরকম কোন চিকিৎসাও হচ্ছে না। বিশেষায়িত হাসপাতালে ওনার চিকিৎসা প্রয়োজন।

দুর্নীতির দুই মামলায় দণ্ড নিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া গত বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে কারাগারে রয়েছেন। ৭৪ বছর বয়সী খালেদাকে চিকিৎসার জন্য গত ১লা এপ্রিল থেকে রাখা হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেষ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে।
সুপ্রিম কোর্ট ও নিম্ন আদালত মিলে খালেদার বিরুদ্ধে এখন ১৭টি মামলা বিচারাধীন। আইনজীবীদের ভাষ্য, এর মধ্যে দুটি মামলায় (জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট ও জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা) জামিন পেলেই তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পেতে পারেন।