হায় বিশ্ববিদ্যালয়! লীনা পারভীন

১৪টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে তদন্তে নেমেছে ইউনিভার্সিটি গ্র্যান্ড কমিশন (ইউজিসি)। ইউজিসির বরাত দিয়ে এ খবর জানিয়েছে পত্রিকাগুলো। কতটা দুর্ভাগা হলে দেশের উচ্চশিক্ষার সেরা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধানদের নিয়ে তদন্ত করতে হচ্ছে। এর ভিতরে আছে আমার প্রাণ প্রিয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নামও। আমার মত অনেকের গর্বের স্থান। জীবনকে চিনতে শিখার স্থান এই বিশ্ববিদ্যালয়। আজকে জীবনের যত যা কিছু শিখেছি তার বেশিটাই শিখেছি এই ক্যাম্পাসে গিয়ে। বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে আমাদের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ১০০ এর মধ্যে না এলেও স্থানীয়ভাবে অভিযুক্ত হয়েছে দুর্নীতিযুক্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে।

অনেকদিন ধরেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি বাণিজ্য, প্রশ্নফাঁস, শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ইত্যাদির অভিযোগ আসছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আলোচনার অন্ত নেই গত কয়েকবছর ধরে। অথচ কোনদিন সেসব অভিযোগ আমলে নেয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি কেউ। ইউজিসি হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবক প্রতিষ্ঠান অথচ তারাই অবহেলা করে গেছে দিনের পর দিন। টনক নড়লো যখন জাহাঙ্গীরনগর, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগে গোটা দেশ কেঁপে উঠলো তখন।
একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বিরুদ্ধে যদি অভিযোগ হয় তিনি চাঁদাবাজি, যৌন হয়রানি, ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধ ব্যবসার সাথে জড়িত তখন নৈতিক অবস্থান থেকেই তাদের সরে যাওয়া উচিত ছিল। তেমনটা আশা করা অবশ্য বোকাদেরকেই মানায়। আমাদের দেশে ক্ষমতা একবার পেলে শত অভিযোগেও ছাড়ার নাম নেয়ার নজির নাই।

একজন ভিসি মানে সেই প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ কর্তাব্যক্তি যার উপর মূল দায়িত্ব থাকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অ্যাকাডেমিক ইস্যুকে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করা। সময়মত অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ক্লাস, পরীক্ষা সমাপ্ত করা, সেশন চালু রাখা, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে রেখে সকলের জন্য স্থিতিশীল ও সহাবস্থান নিশ্চিত করা।

তার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের গুণগত মান ঠিক রেখে গবেষণা ও উন্নয়নকর্ম পরিচালনার নেতৃত্ব দেয়া। অথচ কী ঘটছে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে? এই প্রশ্নের উত্তর এই লেখাতেই রয়েছে। অবাক নয়, লজ্জায় নত হই যখন জানতে পারি যাদেরকে আমরা শিক্ষক বলে সম্মান করে এসেছি এতকাল সেই তাদেরকেই আজকে আসামীর কাঠগড়ায় দেখছি। তাহলে কী শিখালেন তারা আমাদের আর নিজেরাই বা কী শিখেছেন?

দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। অর্থনীতির চাকা তরতর করে উপরের দিকে ধাবিত হচ্ছে। গোটা বিশ্বের প্রধান আকর্ষণ এখন বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী তার কাজের যোগ্যতার স্বীকৃতিও পাচ্ছেন নানা ফোরামে। এমডিজি, এসডিজি অর্জনের খাতায় আমাদের দেশ রয়েছে শীর্ষ অবস্থানে।

আমাদের সেনাবাহিনী শান্তি রক্ষায় সুনামের সাথে লড়ে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। অথচ, বিশ্ববিদ্যালয়ের মত স্বায়ত্ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলো মুখ থুবড়ে পড়ছে দিনে দিনে। নেই কোন আধুনিকতার ছোঁয়া, নাই গবেষণা বা সৃষ্টির নজির। মেধাবীরা আজকে দেশবিমুখ। এসব নিয়ে মাথাব্যথা নেই যাদের তারাই আজকে সংবাদ শিরোনাম।

ভালো লাগতো যদি শিরোনাম হতো দেশের ১৪ টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্তর্জাতিক মানের স্বীকৃতি দিয়েছে কেউ। বঙ্গবন্ধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি বিউটি পার্লার চালান এবং এর হিসাব নিকাশও নিজেই সামলান। যে ভিসির মাথায় বিউটি পার্লারের উন্নয়নের চিন্তা সেই ভিসি কেমন করে প্রতিষ্ঠানের বিউটিফিকেশন নিয়ে কাজ করবেন? অভিযোগ এসেছে তিনি তার পরিবারের একজনকে সেকশন অফিসার হিসেবে নিয়োগ দিয়ে নিয়ম ভঙ্গ করে অযোগ্য একজনকে কেবল শিক্ষকই নয় বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব দিয়েছেন। ছাত্ররা যখন অনেক দিনের পুঞ্জিভূত ক্ষোভকে বাইরে নিয়ে এলো তখনই জানা গেলো সকল অপকর্মের কথা।

তাহলে এখানে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন রাখাই যায়, ইউজিসি এতদিন কী করেছিল? কেন তারা আগে থেকেই বিশবিদ্যালয়গুলোতে কোথায় কে কী করছে তার খোঁজ রাখেনা? তাদের কি কোন মনিটরিং সেল নেই? নাকি তারাও সেসব দুর্নীতির অংশীদার হয়ে যাচ্ছে? আজকাল আর ভরসা রাখার মত কোন জায়গা যেন থাকছে না।

দেশের উন্নয়নকে ধরে রাখতে হলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একটি শক্ত অবস্থান থাকা আবশ্যক। উচ্চশিক্ষার সুবিধা এমনিতেই কম আমাদের দেশে। তার মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া সাধারণ মানুষের সন্তানদের পড়াশুনার আর কোন জায়গা নেই। প্রাইভেটের আলাপ এখানে অপ্রাসঙ্গিক তাই। রাজনীতি থাকবেই। রাজনৈতিক বিশ্বাসের বাইরে কোন মানুষ থাকতেই পারে না। কিন্তু সেই রাজনীতি হতে হবে সামগ্রিকতার বিচারে। সেই রাজনীতির সর্বাগ্রে থাকবে দায়িত্বের প্রতি নিষ্ঠা ও ভালোবাসা। কিন্তু আজকাল হয়ে গেছে উলটো। দায়িত্ব যেন ভর করে আছে রাজনীতির উপর। কেমন করে নিজের পদকে টিকিয়ে রাখা যায় এবং পদ টিকিয়ে রাখার জন্য যা যা করা দরকার তার সবই করছে কেবল আসল দায়িত্বটিকে বাদ দিয়ে।

ক্ষমতা একবার পেলেই ধরে নিচ্ছে সেটি তার পারিবারিক সম্পত্তি। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব, রাষ্ট্রীয় সম্পত্তিকে ব্যবহার করে পারিবারিক উন্নয়নের যে গুরু দায়িত্ব নিয়েছেন আমাদের ভিসিরা সেখান থেকে বের হতে গেলে চলমান তদন্তটি হওয়া উচিত অত্যন্ত কঠিন ও শক্ত। জাহাঙ্গীরনগরের ভিসির বিরুদ্ধে কেবল টাকা লেনদেনের অভিযোগই নয়, এসেছে তার স্বামী ও সন্তানকে অবৈধভাবে ক্ষমতায়নের অভিযোগও।

যেসব ব্যক্তি তার পদের মর্যাদাকে সমুন্নত রাখতে অক্ষম তাদেরকে ভিসি’র মত এত গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব দেয়াটাও এক প্রকার অযোগ্যতারই প্রকাশ। অবিলম্বে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ও বাকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্নীতিমুক্ত করতে না পারলে দেশের মেরুদণ্ডের বাকিটাও খসে পড়বে। আর মেরুদণ্ডহীন রাষ্ট্র একটা সময়ে গিয়ে খুঁড়িয়েও চলতে পারবে না কারণ হাড়ের ক্ষয়রোগ সারাতে দরকার প্রতিকার ও প্রতিরোধমূলক যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ।

লজ্জার হলেও আমাদেরকে অভিযুক্ত ভিসিদের বিরুদ্ধে আনীত প্রতিটা অভিযোগ মনোযোগ ও গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নিতে হবে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ভূমিকা সেটিকে সমুন্নত রাখার জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থাই হতে পারে উপযুক্ত উপায়। ভিসি নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ঢেলে সাজানো এখন সময়ের দাবি। প্রতিটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির একটাই রাজনীতি হবে আর সেটি হচ্ছে “বাংলাদেশ”। এর বাইরে কারও কোন নীতি থাকতে পারে না। দলীয় আনুগত্য থাকতে হবে এই বাংলাদেশ নামক দলটির প্রতি। দুর্নীতিবাজ ও অভিযুক্তদেরকে তাই সত্ত্বর পদ থেকে বিতাড়িত করতে হবে।

লেখক : কলামিস্ট।

এইচআর/পিআর