দুই শহীদ বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লা কায়সার ও জহির রায়হানের পরিবারের মধ্যে সম্পত্তির হিসাব নিয়ে সম্পর্কের অবনতি

দেবদুলাল মুন্না : সম্প্রতি জহির রায়হানের নাতনি ভাষা রায়হান ফেসবুকে এক পোস্টে সম্পত্তি দখলের অভিযোগ তোলেন। তার দেয়া পোস্টে তিনি অভিযুক্ত করেন শহীদুল্লা কায়সারের স্ত্রী পান্না কায়সার, মেয়ে অভিনেত্রী শমী কায়সার ও ছেলে অমিতাভ কায়সারের বিরুদ্ধে। শহীদুল্লা কায়সার ও জহির রায়হান আপন দুই ভাই। মুক্তিযুদ্ধের সময় শহীদ হন। জহির রায়হানের নাতনি ভাষা রায়হান হলেন জহির রায়হানের ছেলে বিপুল রায়হানের মেয়ে।

ভাষা অভিযোগ করেন, গুলশানের বারিধারার এক বিঘা জমি এবং গুলশান আড়ংয়ের পেছনের তিন বিঘা জমি তার দাদার (জহির রায়হান) টাকায় কেনা হলেও সেই সম্পত্তিগুলো পান্না কায়সার, শমী কায়সার ও অমিতাভ কায়সার দখল করে রেখেছেন।রায়হান পরিবারের এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গণমাধ্যমে একটি বিবৃতি পাঠান শহীদুল্লা কায়সারের ছেলে অমিতাভ কায়সার।

অমিতাভ কায়সার গত ২০ সেপ্টেম্বর এক বিবৃতিতে বলেছেন, শহীদুল্লাহ কায়সার ৩ বার লম্বা সময় জেলে থেকেছেন। তৎকালীন সরকারের জন্য তিনি ছিলেন হুমকিস্বরুপ। অন্য আরো অনেকর মতো তিনি ভারতে চলে যাননি। দেশে থেকে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করার। আজ যে কথাগুলো জহীর রায়হান তনয় বিপুল রায়হান এবং তার মেয়ে ভাষা বলছে, তা শুধুমাত্র শহীদুল্লাহ কায়সারের নামটিতে দাগ লাগানোর জন্য এবং তার পরিবারকে ছোট করার জন্য।’ এদিকে গণমাধ্যমে পাঠানো অমিতাভ কায়সারের বিবৃতির জবাবে ফেসবুকে আরেকটি বিবৃতি দেন জহির রায়হানের ছেলে বিপুল রায়হান।

সেখানে জানান, ‘আগাগোড়া ভুল বানানে ভুল শব্দচয়নে ভুল তথ্য পরিবেশন, “শহীদুল্লাহ কায়সার”, আদতে আমার জ্যাঠার নাম “ শহীদুল্লা কায়সার”। অমিতাভ তাঁর চাচার নাম লিখেছেন “জহীর রায়হান”, আদতে আমার বাবার নাম “জহির রায়হান”। ‘আমি স্তম্ভিত! সত্যগোপন ও মিথ্যাচার করতে গিয়ে তিনি এসব কী বলছেন? নিছক সম্পত্তির লোভে তিনি (অমিতাভ) যে তার বাবা শহীদুল্লা কায়সারকে চরম অপ্রিয় প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিচ্ছেন!!’ গত ২২ সেপ্টেম্বর জহির রায়হানের নাতনি ভাষা রায়হান ফেসবুকে আরেকটি পোস্টে লেখেন, ‘ যারা সম্পত্তির জন্য মহান মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। যারা সম্পত্তির জন্য এরকম সাংঘাতিক সব কথা বলতে পারেন , আদর্শের জায়গা থেকে তারা আমাদের পরিবারের অংশ হতে পারেন না এবং এই আদর্শের সামনে রক্তের সম্পর্কের কোন দাম হতে পারে না। রায়হানদের সততা , আদর্শ , মানবিকতা , মেধা এবং দেশপ্রেম এই সবকিছুর বিপরীত মেরু কায়সাররা , যেটা জেনে আমরা নিজেরাই বিস্মিত এবং লজ্জিত , তাই আজ থেকে রায়হান – কায়সারদের এক পরিবার বলবেন না।’

উল্লেখ্য, শহীদুল্লা কায়সার ও জহির রায়হানের চাচাত ভাই ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবিরের লেখা এক কলামে বড়ভাই শহীদুল্লা কায়সারের নামে গুলশানে জহির রায়হানের টাকায় জমি কেনার তথ্য উঠে এসেছে। ২০১৬ সালের ২৬ মার্চ একটি জাতীয় দৈনিকে ‘একাত্তরের গণহত্যা ও জহির রায়হান’ শিরোনামে কলামে তিনি লেখেন, ‘বড়দা (শহীদুল্লা কায়সার) দৈনিক সংবাদ এর নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন। তাঁর বেতনের অর্ধেক যেত পার্টি তহবিলে (কমিউনিস্ট পার্টি)। বিয়ের পর বড়দার ভবিষ্যৎ ভেবে গুলশানে তাঁর নামে জমি কিনেছিলেন। কায়েতটুলীর পৈতৃক বাড়িতে বড়দা থাকবেন বলে একতলাকে দোতলা করেছিলেন।’

গতকাল বুধবার জহির রায়হানের ছেলে বিপুল রায়হানের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, তিনি এসব মিথ্যাচারে অসুস্থ হয়ে সপ্তাহ খানেক আগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। গতকাল ফিরেছেন বাসায়।তিনি তার মেয়ে ভাষা রায়হানের সাথে কথা বলার অনুরোধ করেন। ভাষা রায়হান বলেন ‘ সম্পত্তি নিয়ে দুই পরিবারের মধ্যে এমন অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটায় আমরা সত্যি বিব্রত। আজ (গতকাল) বিপুল রায়হান ফ্রান্স থেকে ফিরেছেন। দাদা ( শাহরিয়ার কবির ) সুচন্দাদিসহ আমাদের পরিবারের যারা মুরব্বী রয়েছেন তারা শিগগিরই একসাথে বসে সিদ্ধান্ত নেবেন সম্পত্তি ফিরে পাওয়ার ব্যাপারে কি পদক্ষেপ নেওয়া যায়।’