যেভাবে রাজধানীতে অধিকাংশ ফুটবল ক্লাবগুলো রূপ নিলো ক্যাসিনোতে

আশি থেকে নব্বই দশক পর্যন্ত ছিলো রাজধানীতে ফুটবলের জনপ্রিয়তা। আবাহনী ও মোহামেডানের খেলা মানে দোকানপাঠ বন্ধ হয়ে যেতো। এরপর ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে ফুটবল খেলার জগত নিষ্প্রভ হতে থাকে। গত বুধবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান মতিঝিল, ফকিরেরপুল এলাকায় যে কয়েকটি ‘ক্যাসিনো’তে পরিচালিত হয় সেগুলোর বেশিরভাগই ফুটবল ক্লাবের। গতকাল শুক্রবার অভিযান পরিচালিত হয়েছে কলাবাগান ক্লাবে। যেহেতু বাংলাদেশে ক্যাসিনোর কোনো অনুমোদন নেই তাই ক্যাসিনোগুলো চলছে তাও প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়েই অথবা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালীদের পৃষ্ঠপোষকতায়।রাজধানীর মতিঝিলে অবস্থিত বাংলাদেশে ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) ভবন। তাই এর আশে পাশে ফুটবল ক্লাব গড়ে উঠবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এসব ক্লাবগুলোই ভেতরেইএখন গড়ে উঠেছে ক্যাসিনো । ভেতরে ফুটবল খেলোয়ারদের কোনো কার্যক্রম নেই বরং এতদিন পর্যন্ত ছিলো জুয়ারীদের আনাগোনা। বয়স্ক থেকে শুরু করে স্কুল কলেজের ছেলেরাও ভীড় জমিয়েছেন ক্যাসিনোতে। অথচ প্রশাসন বলছে তারা এসব এতোদিন জানত না!

ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ও ওয়াণ্ডারর্স ক্লাব ফুটবলে একটা সময় দাপুটে দল হিসেবে খেললেও এখন তারা ভালো খেলে ক্যাসিনোতে।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে তৈরি হয়েছিল মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়া চক্র। এখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়া এই ক্লাবের মূল কাজই হয়ে দাড়িয়েছে জুয়ার আসর বসানো।এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘এসব ক্লাবে দীর্ঘকাল ধরেই জুয়ার চর্চা ছিল। কিন্তু অনুমোদনহীন ক্যাসিনো কীভাবে হলো তার সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। তবে তারা এতদিন নিশ্চুপ ছিলেন।এখন হাইকমাণ্ডের নির্দেশে অভিযান পরিচালনা করছেন।’

মতিঝিলের ক্লাবগুলোর সাথে জড়িত কয়েকজন কর্মকতা জানান, আবাহনী মোহামেডানসহ অন্য প্রায় সব ক্লাবেই জুয়ার প্রচলন ছিলো আশির দশক থেকেই এবং সেটি করা হতো মূলত ক্লাবের পরিচালনা ব্যয় নির্বাহের জন্য।তখন ক্লাবের সংগঠকরা রাজনীতিতে খুব একটা সক্রিয় ছিলেন না বরং ক্লাবগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা ছিলো, ফলে খেলাধুলাতেও ক্লাবগুলো বেশ ভালো করেছিল। তখন মূলত ওয়ান-টেন ও হাউজি নামে দুই ধরণের জুয়া খেলা হতো। সপ্তাহে তিন থেকে চারদিন হতো। ক্লাবের বার্ষিক দাতাদের বাইরের বড় আয় আসত এই হাউজি থেকেই। আবাহনী ক্লাবের এক শীর্ষ পর্যায়ের সদস্য জানান, ধানমন্ডির কলাবাগান ক্লাবের হাত ধরেই ৭/৮ বছর আগে রাজধানীতে ক্যাসিনো প্রবেশ করে বলে জানা গেছে।এরপরই স্লট মেশিন, জুয়ার আন্তর্জাতিক মানের বিশেষ বোর্ড এগুলো আসতে শুরু করে ক্লাবগুলোতে। প্রথমে সব ক্লাবই বাকারা নামে একটি খেলা দিয়ে শুরু করে। পরে যোগ হয় রুলেট নামে আরেকটি খেলা।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের উপপরিচালক মুকুল চাকমা বলেন, তিনি সেগুনবাগিচা এলাকায় অবৈধ মাদক সেবনের খবর পেয়ে একটি অভিযান চালান বছর দুয়েক আগে এবং অভিযানে সেখানেই ক্যাসিনোর অস্তিত্ব পান। পরে সেটি বন্ধও হয়ে যায় বলে জানান তিনি।তিনি জানান, সেগুনবাগিচায় একটি বন্ধ হলেও পরবর্তীতে মতিঝিল, কলাবাগান, তেজগাঁও এবং এলিফ্যান্ট রোড, বনানীতে জমজমাট হয়ে উঠে কয়েকটি ক্যাসিনো।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক নিয়ামুল বশির বলেন, ‘ক্যাসিনোগুলোর ধরণ দেখেই বোঝা যাচ্ছে সমাজের প্রভাবশালীরাই এসব ক্যাসিনো নিয়ন্ত্রণ করছেন।এমনকি দুই একজন মন্ত্রীর নামও শোনা যাচ্ছে।’
সূত্র:আমাদের সময়.কম