মুক্তাদির ছিলেন এক অকোতভয় মুক্তিযোদ্ধা ও সচেতন রাজনৈতিক কর্মী :সুব্রত বিশ্বাস

দেশপ্রেম কারও গায়ে লেখা থাকে না। দেশদ্রোহী হয়ে ও কেউ জন্মগ্রহণ করেন না। সবার মাঝেই সুপ্ত দেশপ্রেম থাকে,তাই বলে প্রতিদিন মানুষের দেশপ্রেমের প্রকাশ ঘটে না।জাতির সংকটকালে একজনের নিঃস্বার্থ কর্মে প্রকাশ পায় তার দেশপ্রেম।আমাদের দেশপ্রেমও তেমনি একদিনে গড়ে ওঠেনি। দীর্ঘ ২৪ বছর পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর বিদ্বেষ, শাসন-শোষণ ও অত‍্যাচার নির্যাতনের বিরুদ্ধে লড়াই সংগ্রামে শান দিয়ে তবেই আমাদের দেশপ্রেম জাগ্রত হয়েছে।একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের
মাধ‍্যমে তার পরিপূর্ণ প্রকাশ ঘটেছে। হাজার হাজার ছাত্র-যুবক তরুন জীবন বাজি রেখে স্বাধীনতা অর্জনে আত্মনিয়োগ করেছে।
সিলেটের ম আ, মুক্তাদির ছিলেন তেমনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তাদির তখন ১৮/১৯ বছরের যুবক।
সিলেট্ শহরের শহরতলীর কদমতলী গ্রামে মুক্তাদিরের জন্ম। প্রাথমিক লেখাপড়া স্থানীয় গ্রামের প্রাইমারী স্কুলে। এস এস সি সিলেট শহরের কেন্দ্রস্থল রাজা জি সি হাই ̄স্কুল থেকে।এইচ এস সি মদন মোহন কলেজ এবং বিএ এ পরীক্ষা সিলেট সরকারী কলেজে।মুক্তাদির যখন ̄স্কুলের কিশোর ছাত্র,পৃথিবী ব‍্যাপী তখন শোষণহীন সমাজব‍্যাবস্থা সমাজতন্ত্রের অপ্রতিরুদ্ধ অগ্রযাত্রা।অন‍্যদিকে ভিয়েতনামসহ এশিয়া -আফ্রিকার দেশে দেশে চলছে সাম্রাজ‍্যবাদ ও ঔপনিবেিশক শাসন শোষনের কবলমুক্তির লড়াই। দুনিয়ার এক তৃতীয়াংশ দেশে উড়ছে সমাজতন্ত্রের পতাকা। সমাজ পরিবর্তনের উত্তাল জোয়ারে উদ্বেলিত বিশ্বের যুব সমাজ।কিশোর মুক্তাদির সেই উদ্বেলিত জোয়ারের প্রভাবের বাইরে ছিলেন না। বড় ভাই আব্দুল মকিত ছিলেন বাম প্রগতিশীল রাজনীতির অনুসারী।প্রতিবেশী আরো অনেকে একই ধারার অনুসারী ছিলেন। পারিপার্শিক অবস্থা ও পরিবেশও পৃথিবীর পিছিয়ে পড়া দেশের ন‍্যায় অশিক্ষা ও দারিদ্রতার করুণ ছাপ। অন‍্যদিকে পাকিস্তানী ̄শাসকগোষ্ঠীর ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণে আমরা ছিলাম শৃঙ্খলিত। স্বাভাবিকভাবে আন্তর্জাতিক পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি কিশোর মুক্তাদিরের অনুসন্ধিৎসু মনকে অনুরণিত করেছে। অপরদিকে পারিপাশিক দৈনতা পীড়িত ও ভাবিত করেছে। এসব ভাবনা-চিন্তা থেকে বড় ভাই ও প্রতিবেশি অনেকের পদাঙ্ক
অনুসরণ করে মুক্তাদির ̄স্কুল ও কলেজ জীবনেই প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন।
’৫২’র ভাষা আন্দোলন থেকে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বাঙালির আন্দোলন-সংগ্রাম
ক্রমবর্ধমান অব‍্যাহত গতিতে এগিয়ে চলে। ৬৮/৬৯-এ সে লড়াই তীব্র আকার ধারণ করে।কিশোর ছাত্র মুক্তাদির সে আন্দোলনে সক্রিয় মাঠকর্মী। সেই আন্দোলন-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় অনুষ্ঠিত হয়’৭০-এর সাধারণ নির্বাচন। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালিরা নিরঙ্কুশ সংখ‍্যাগরিষ্ঠতা পেয়েও ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী। আমরা বাংগালীরা ও তাবেদারী আপোসের বিরুদ্ধে অনঢ়।প্রতিশোধ ̄স্পৃহায় একাত্তরের ২৫শে মার্চ বাঙালিদের ওপর সশস্ত্র আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ে হানাদার বাহিনী।আমরা বাঙালিরাও তখন বাধ‍্য হই তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে।

আমরা বাঙালিরাও তখন বাধ‍্য ̈হই তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে। হাজার হাজার যুবকের সাথে কিশোর মুক্তাদিরও সেদিন ভারতে ট্রেনিং নিয়ে অংশ নেন মুক্তিযুদ্ধে।মেজর সি আর দত্তের নেতৃত্বে যুদ্ধ করেছেন ৪নং সেক্টরে। নিজের জীবন এবং পরিবার পরিজনের নিরাপত্তার কথা চিন্তা না করে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর কবল থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করতে লড়াই করেছেন। কখনও চিন্তা করেননি কিংবা জানতেন না যে তাঁদের দেশপ্রেমের কোন ̄স্বীকৃতি কিংবা ব‍্যাক্তিগত প্রত‍্যাশার প্রয়োজন রয়ছে। যুদ্ধ যখন হয় তখন একটা প্রতিপক্ষ থাকেই। বাংলাদেশের মানুষের শত্রুপক্ষ ছিল পাকিস্তানী সরকার, তাদের সেনাবাহিনী এবং তাদের এদেশীয় সহযোগীরা। তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার মধে‍্যই প্রকাশ পেয়েছিল মুক্তাদির তথা মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বোচ্চ দেশপ্রেম। যুদ্ধে পরিচয় সম্পর্ক হয়েছে বিশিষ্ট ছাত্র ও যুবনেতা
আক্তার হোসেন সহ অনেকের সাথে। যার ও যাদের সাহচর্য ̈ ও সান্ধিধে‍্য ̈পরবর্তীতে মুক্তাদির রাজনীতির পাঠ নিয়ে রাজনীতির মাঠে সμীয় ভূমিকা রাখেন। মুক্তিযুদ্ধের মধ‍্য ̈ দিয়ে তরুণ ছাত্র-যুবক মুক্তিযোদ্ধাদের চিন্তা ও মননে অভাবনীয় রাজনৈতিক সচেতনতা গড়ে ওঠে।
দেশাত্ববোধ এবং বাঙালি সংস্কৃতিবোধের ভাবনীয় বিকাশ ঘটে। আন্তর্জাতিক পরাশক্তির চরিত্রিক
অবস্থান ̄সম্পর্কে ধারণা জন্মে।

স্বাভাবিকভাবে তরুণ মুক্তিযোদ্ধা মুক্তাদিরের চিন্তা-চেতনাও নতুন অবিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হয়েছে।মুক্তিযুদ্ধের তিক্ত অভিজ্ঞতায় দেশ গঠনে উদ্বোদ্ধ হয়েছেন। সবার ন‍্যায় মুক্তাদিরেরও লক্ষ‍্য ̈ ও উদ্দেশ‍্য ̈ ছিল এক এবং অভিন্ন। মোটা ভাত,মোটা কাপড় পরে সুখে শান্তিতে জীবন ধারণ করবে দেশের মানুষ। সাম‍্য ̈-মৈত্রী ও সমতার ভিত্তিতে সুখী-সমৃদ্ধ শোষণহীন একটি ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ প্রতিষ্ঠা পাবে। দীর্ঘদিনের বঞ্চিত ছাত্রদের প্রাণের দাবি একটি একমুখী শিক্ষা ব‍্যাবস্থা গড়ে উঠবে।

এসবের লক্ষে‍্য ̈ দেশ পরিচালিত হবে মুক্তিযুদ্ধের মধ‍্য ̈ দিয়ে অর্জিত রাষ্ট্রের গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষ এই চার মূলনীতি অনুসরণে।

কিন্তু দেশ গঠনের শুরুতেই সকল স্বপ্ন ও পরিকল্পনা হুচট খায়। মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশ পরিচানার মুল পরিকল্পনাকারী তাজউদ্দিন আমহদকে সরিয়ে দেওয়া হয় সরকারের সকল দায়িত্ব থেকে।ভেঙ্গে যায় মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতায়শ গঠনের সকল

ভেঙ্গে যায় মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতায়শ গঠনের সকল দেশ গঠনের সকল ̄স্বপ্ন ও পরিকল্পনা।
দ্বিধা বিভক্তি দেখা দেয় ছাত্র-যুবক ও মুক্তিযোদ্ধাদের মধে‍্য ̈। বিভক্ত হয়ে যায় আওয়ামী
লীগের অঙ্গ সংগঠন ছাত্রলীগ। বঙ্গবন্ধু একটি অংশের পক্ষ অবলম্বন করেনেন।ছাত্রলীগের নিউক্লিয়াস হিসেবে পরিচিত গ্রুপটি চলে যায় বিপক্ষে।এমনি এক পর্যায়ে গঠিত হয় নতুন রাজনৈতিক দল বৈজ্ঞানিক সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ। ছাত্রলীগের নিউক্লিয়াস হিসেবে পরিচিত গ্রুপটি
চলে যায় বিপক্ষে।
এমনি এক পর্যায়ে গঠিত হয় নতুন রাজনৈতিক দল বৈজ্ঞনিক সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ।
তরুণ মুক্তাদির দেশ গঠনের বলিষ্ট নেতৃত্বে হয়ে ওঠেন শিক্ষাঙ্গনে ছাত্র আন্দোলনের নেতা আর
রাজনীতির মাঠকর্মী। আন্দোলন আর সংগ্রাম হয়ে ওঠে জীবনের পায়ে চলার পাথেয়। বিভিন্ন কলেজে গড়ে তোলেন জাসদ ছাত্রলীগের সংগঠন। অপ্রতিরুদ্ধ গতি পায় সিলেটের ছাত্র সংগঠন ও
মাঠ পর্যায়ের আন্দোলন।
পরিচিতি ও প্রভাব সমান্তরাল গতিতে সমাজ ও জনমণে ,স্থান করে নেন। নেতৃত্বে থেকেছেন কলেজ শাখা,জেলা পর্যায় ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে। রাজনীতি ও স্থানীয় প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে সক্রীয় থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এক পর্যায়ে জাসদে বিভক্তি দেখা দিলে যোগ দিয়েছেন
বাসদের সাথে।
জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বাসদের রাজনীতির সাথেই যুক্ত ছিলেন। রাজনীতি ও সংগঠন করতে গিয়ে বিভিন্ন সরকার ও প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে নেমে এসেছে নানা
সরকার ও প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে নেমে এসেছে নানা অত‍্যাচার নির্যাতন।
অত ̈াচার নির্যাতন। ̄স্বার্থ ও প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর ভয়ভীতি ও হুমকির কাছে কখনো আত্মসমর্পন করেননি।কখনো প্রকাশে‍্য ̈ কখনো আত্মগোপনে থেকে আন্দোলন সংগ্রামে
নেতৃত্ব দিয়েছেন। কিন্তু এক পর্যায়ে বাধ‍্য ̈ হয়ে গোপনে পাড়ি দিতে হয় লন্ডনে। লন্ডনে থেকেও দেশের প্রতিটি আন্দোলনে স্বক্রিয় থেকেছেন। নেতৃত্বে দিয়েছে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের
নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ̄স্বাধীনতাবিরোধীর বিরুদ্ধে আন্দোলনে।পাশাপাশি প্রবাসী বাঙালিদের নানা সমস‍্যা নিয়ে সোচ্চার থেকেছেন। কিন্তু দুর্ভাগ‍্য ̈ ৯৭ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর নেমে আসে তার জীবনের সবচেয়ে নিষ্ঠুর ও রম বিপর্যয়। মাত্র ৪৪ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তার অকাল মৃতু ̈ ঘটে।
ছাত্রজীবন থেকেই মুক্তাদিরের লক্ষ‍্য ̈ ছিল সমাজতন্ত্রের দেশের দুঃখী ও অনাহারক্লিষ্ট মানুষের মুখে হাসি ফুটানো। আমৃতু‍্য ̈ মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন ও বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের ভাগন্নোয়নের স্বপ্ন লালন করে গেছেন। শুধু ছাত্র রাজনীতি ও রাজনীতিতেই তার ভূমিকা সীমাবদ্ধ রাখেননি।
আন্দোলন ও সংগ্রামের মধ‍্য দিয়ে গড়ে তুলেছেন এক ঝাঁক অনুসারী, সহকর্মী ও নেতাকর্মী।
তাদের অনেকেই আজ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন দেশে ও বিদেশে।
̄স্মৃতিতে মননে ̄স্বরণে রেখেছেন তাদের প্রিয় নেতা ও সহকর্মী মুক্তাদির ভাইকে।
জন্ম ও মৃতু‍্য ̈ দিবসে তাকে ̄স্বরণ করতে একটুওভুল করেন না। তার ̄স্মৃতি রক্ষায় এবং আগামী প্রজন্মের কাছে স্বরণীয় করে রাখতে গড়ে তোলেছেন মুক্তাদির স্মৃতি ট্রাস্ট। দুঃখের বিষয় মুক্তিযুদ্ধে জীবন বাজি রেখে ঝাঁপিয়ে পড়া এবং মুক্তিযুদ্ধ উত্তর দেশে গঠনে নেতৃত্বদানকারী অসংখ‍্য
মুক্তাদির আজ সরকার ও সমাজের অবহেলায় লোকান্তরিত হওয়ার পথে। দুঃখের বিষয় হলেও সতি‍্য ̈ মুক্তিযোদ্ধাদের নামে গঠিত মুক্তিযোদ্ধা কল‍্যাণ ট্রাস্ট এসব ক্ষেত্রে তাদের কোনও ভূমিকা
আমরা লক্ষ‍্য ̈করিনা। বস্তুত এটি একটি ̄স্বার্থবাদী ট্রাস্টে পরিণত হয়েছে। সরকার দলীয়দের মুখপাত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের দুর্নীতি ও ̄স্বার্থপরতায় বহু অমুক্তিযোদ্ধাকে মুক্তিযোদ্ধা বানিয়েছে। প্রায়ই পত্রপত্রিকায় লক্ষ‍্য ̈ করা যায় অনাহার ও অর্থকষ্টে মুক্তিযোদ্ধাকে রাস্তাঘাটে ভিক্ষাবৃত্তি করতে।
তাদের ভাগে ̈ সরকারের কোন সাহায ̈ জোটেনি। অথচ ট্রাস্টের দায়িত্ব মুক্তিযোদ্ধাদের অভাব-অনটন ও স্বার্থ দেখভাল করা। মুক্তিযুদ্ধ ছাড়াও যেসব মুক্তিযোদ্ধা সমাজে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান
ভূমিকা রেখেছেন তাদের প্রকৃত মূল‍্যায়ন করা।
মুক্তাদিরের ন‍্যায় অবহেলিত অসংখ ̈ মুক্তিযোদ্ধাদের তুলে এনে নতুন প্রজন্ম ও ভবিষ‍্যৎ সমাজের অনুকরনীয় হিসেবে তাদের ̄§ৃতি ধরে রাখা। আশা করি সরকার ও মুক্তিযোদ্ধা কল‍্যাণ ট্রাস্ট এসব ব‍্যাপারে নিরপেক্ষ নজর দিতে সচেষ্ট হবে। পরিশেষে মুক্তাদিরের মৃতু‍্যবার্ষীকিতে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবসা জানাই। বন্ধু ও সহকর্মীদের অকৃত্রিম ভালোবাসায় গড়ে ওঠা মুক্তাদির স্মৃতি ট্রাস্ট অম্লান ও অমর হোক।
লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, কলাম লেখক ও সাংস্কৃতিক কর্মী,নিউইয়র্ক।