গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা:স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে না করার প্রস্তাব

নির্বাচন ব্যবস্থাপনার ওপর মানুষের আস্থা কমছে। এ কারণে ভোটারদের মধ্যে নির্বাচনবিমুখতা দেখা দিচ্ছে। উপজেলাসহ সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে ভোটার উপস্থিতি কমেছে; যা গণতন্ত্রের জন্য সহায়ক নয়। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গুণগত পরিবর্তন দরকার। ‘নির্বাচনে আস্থা ফেরানোই বড় চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। তারা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন দেয়া বা দলীয় প্রতীকে ভোট গ্রহণ না করারও সুপারিশ করেন। ইনিশিয়েটিভ ফর দ্য প্রমোশন অব লিবারেল ডেমোক্রেসি (আইপিএলডি) এ গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে। শনিবার রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় সংগঠনটির কার্যালয়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

সংগঠনের সভাপতি সাবেক সংসদ সদস্য প্রকৌশলী মোহাম্মদ ফজলুল আজিমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে মূল প্রবন্ধ পড়েন সাবেক সচিব আবদুল লতিফ মণ্ডল। বক্তব্য দেন সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান ড. সা’দত হুসাইন, সুপ্রিমকোর্টের সাবেক রেজিস্ট্রার ইকতেদার আহমেদ, স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ, সিনিয়র সাংবাদিক মো. রিয়াজউদ্দিন আহমেদ প্রমুখ।

আলোচনায় ড. সা’দত হুসাইন বলেন, নির্বাচনে ভোটারদের বিমুখতা দূর করতে নির্বাচন কমিশন (ইসি) কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিতে পারে। যেসব স্থানে নির্বাচনে একক প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেন, সেখানে তদন্ত করে এর কারণ বের করে প্রতিকারের উদ্যোগ নিতে পারে। ভোট কেন্দ্রগুলোতে সকালে ব্যালট পেপারসহ নির্বাচনী সামগ্রী পাঠাতে পারে। উপজেলা বা স্থানীয় সরকারের অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচনে রাজনৈতিক দল মনোনয়ন দিতে পারে কিন্তু প্রার্থীদের দলীয় প্রতীক না দেয়ার মতো প্রস্তাব করতে পারে। এসব পদক্ষেপ নিলে নির্বাচনের ওপর মানুষের কিছুটা আস্থা ফিরে আসবে।

তিনি বলেন, সবকিছুতে একটি বড় পরিবর্তনের সংস্কৃতিক দেখা যাচ্ছে। বেশিরভাগ মানুষ বাড়তি আয়ের চেষ্টা করছেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অনৈতিক পন্থায় এ বাড়তি আয় করছেন। নির্বাচনে এ বাড়তি টাকার খেলা হচ্ছে, যা সুষ্ঠু নির্বাচনের অন্তরায়। মূল প্রবন্ধে আবদুল লতিফ মণ্ডল বলেন, বাংলাদেশে অংশগ্রহণমূলক, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বিষয়ে শাসক দল ছাড়া অন্যসব রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজসহ বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে একটি ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার ও ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননের বক্তব্যে নির্বাচন নিয়ে মানুষের বিমুখতার বিষয়টি আবার আলোচনায় উঠে এসেছে।

তিনি বলেন, উপজেলা নির্বাচনে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। মসজিদে ঘোষণা দিয়েও ভোটারদের কেন্দ্রে আনা যায় না। এটা শুধু নির্বাচন নয়, গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক। জাতীয় নির্বাচনের প্রভাব স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও পড়েছে।

আবদুল লতিফ মণ্ডল বলেন, গণতন্ত্র রক্ষা ও এর বিকাশের চ্যালেঞ্জে আমাদের জয়ী হতেই হবে। এর জন্য দরকার জাতীয় নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে নির্দলীয়ভাবে নির্বাচন করা ও দলীয় মনোনয়ন দেয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল করা। প্রকৌশলী মোহাম্মদ ফজলুল আজিম বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে করায় সহিংসতা বেড়ে গেছে। এখন জনপ্রতিনিধি পদটিকে জনসেবার বদলে অফিস অব প্রফিট বা লাভজনক পদ মনে করছে। এ সংস্কৃতির পরিবর্তন দরকার।

তিনি বলেন, দলগুলোতে জনসাধারণের ভাগ্য উন্নয়নের চেয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার বা টিকে থাকার আলোচনা বেশি হয়। সেটিও পরিবর্তন আসা দরকার। ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, উন্নয়নের নামে এক ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ চলছে। এর প্রমাণ হচ্ছে এক ঘণ্টা বৃষ্টি হলেই নগরী পরিত্যক্ত ডোবায় পরিণত হচ্ছে। তিনি বলেন, যুবসমাজ রাজনীতিতে প্রবেশ বা রাজনীতি থেকে সুষ্ঠুভাবে বাহির হওয়ার পথ পাচ্ছে না। এ যেন রাজনীতিতে ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। তিনি বলেন, বড় ধরনের সাংস্কৃতিক পরিবর্তন হচ্ছে। কিন্তু তা থেকে আমরা শিক্ষা নিচ্ছি না।

মো. রিয়াজউদ্দিন আহমেদ বলেন, নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ফিরে না এলে গণতন্ত্র ব্যাহত হবে। সমাজে জবাবদিহিতা ও সুশাসনের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। এ অবস্থার পরিবর্তন রাজনীতিবিদদেরই করতে হবে। ইকতেদার আহমেদ বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব না, তা প্রমাণিত হয়েছে। নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে ভাবতে হবে। তিনি বলেন, সংবিধান ও আইন মেনে চলা সবার কর্তব্য। সংবিধান লঙ্ঘনকারীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।