গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাঠাচ্ছে চন্দ্রযান-২, তন্নতন্ন করে খোঁজা হচ্ছে ল্যান্ডার বিক্রম

ভারতের মহাকাশ সংস্থা ইসরোর বিজ্ঞানীরা বলছেন ‘মুন মিশন’ ব্যর্থ– এটা বলা যাবে না। কারণ চন্দ্রযানের অরবিটারে পৃথিবীতে তথ্য প্রেরণের জন্য আটটি অত্যাধুনিক গ্যাজেটস রয়েছে। সেই গ্যাজেটগুলি যথাযথ ভাবে কাজ করাতেই বিজ্ঞানীরা মনোবল ফিরে পেয়েছেন। হাতে পেতে শুরু করেছেন তারা ছবি। বিক্রমকে হারিয়ে তাঁদের মনখারাপ হয়েছে ঠিকই। কিন্তু, চন্দ্রযান-২ যে ভাবে কাজ করছে, তাতে উত্‍‌ফুল্ল হয়ে উঠেছেন বিজ্ঞানীরা। চাঁদের চারপাশে ঘুরতে থাকা চন্দ্রযান-২ ইতিমধ্যেই গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রেরণ শুরু করেছে। বেঙ্গালুরুর শ্রীহরিকোটায়, ইসরোর কেন্দ্র জড়ো হচ্ছে সেইসমস্ত তথ্য। আগামী সাড়ে ৭ বছর ধরে, এ ভাবে তথ্য-ছবি পাঠাতে থাকলে, চাঁদ নিয়ে গবেষণায় নয়া দিগন্ত খুলে যাবে বলেই তাঁরা মনে করেন। চাঁদের কক্ষপথে চন্দ্রযান-২ এর অরবিটার খুব ভালো অবস্থায় রয়েছে। পৃথিবী থেকে যে অবস্থায় পাঠানো হয়েছিল, সেই অবিকৃত অবস্থাতেই চাঁদকে কক্ষপথ ধরে প্রদক্ষিণ করছে। তথ্যসংগ্রহে অরবিটারে থাকা অত্যাধুনিক গ্যাজেটগুলিও স্বাভাবিক ভাবে কাজ করছে। সবথেকে বড় কথা চাঁদের কক্ষপথে সেটি সুরক্ষিত রয়েছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া/এনডিটিভি

২,৩৭৯ কেজি ওজনের চন্দ্রযান-২ চন্দ্রপৃষ্ঠরে ১০০ কিলোমিটার উঁচুতে অবস্থান করছে। এর মধ্যে রয়েছে ইমেজিং আইআর স্পেক্ট্রোমিটার। যার কাজ হবে চাঁদের খনিজ মানচিত্র তৈরি করা। সেইসঙ্গে চন্দ্রপৃষ্ঠে জল রয়েছে কি না, সেটা নিশ্চিত করা। এ ছাড়া রয়েছে ডুয়েল ফ্রিকোয়েন্সি সিন্থেটিক অ্যাপারচার রাডার। এর কাজ হবে চাঁদের মেরু অঞ্চলের মানচিত্র তৈরি করা। পাশাপাশি উপ-পৃষ্ঠ স্তরে জল-বরফ রয়েছে কি না, তার সন্ধান দেওয়া।

ফলে, ল্যান্ডার বিক্রম ও রোভার প্রজ্ঞানকে হারিয়ে, সব পরিশ্রম জলে গেল, এটা ধরে নেওয়ার কোনও কারণ রয়েছে বলে তাঁরা মনে করছেন না। তাঁদের এদিন আরও খুশি করেছে, অরবিটারে জীবনকাল বেড়ে যাওয়ার খবর। চাঁদে পাঠানোর সময় ধরে নেওয়া হয়েছিল, অরবিটারের আয়ু হবে এক বছর। এখন চন্দ্রযানে মজুত থাকা জ্বালানি বিশ্লেষণ করে তাঁরা দেখেছেন সাড়ে সাত বছরের জন্য অরবিটার নিয়ে চিন্তা নেই। ফলে, একবছর যতটুকু তথ্য মিলবে বলে আশা করা হয়েছিল, তারা সাতগুণ তথ্য হাতে আসবে। ইসরোর হাতে ঠিক ১৪ দিনই থাকছে ছিন্নসম্পর্ক জোড়ার জন্য। ইসরো ফের যদি ‘বিক্রম’-এর সংকেত ধরতে পারে, তা হবে অভূতপূর্ব। যদিও সে সম্ভাবনাও অতি ক্ষীণ। আর ১৪দিন হচ্ছে ল্যান্ডার বিক্রমের আয়ুষ্কাল। এর পর ল্যান্ডারটি আর সক্রিয় থাকার কথা নয়। শনিবার সকাল থেকে পুনরুদ্দমে তাঁরা নেমে পড়েছেন বিক্রমের সংকেতের খোঁজে। একবার সংকেত পেলে, বিক্রমের গতিবিধিও জানা যাবে।

ইসরোর চেয়ারম্যান কে সিভান বলেন, চন্দ্রযান-২ মিশনের সঙ্গে যুক্ত মহাকাশ বিজ্ঞানীদের দলটি বিক্রমের লিংক পেতে আগামী ১৪ দিন মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাবে। চন্দ্রযানের অরবিটারের আয়ু যে প্রায় সাত গুণ বেড়েছে, তা নিয়েও উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন ইসরো চেয়ারম্যান। তাঁর দাবি, যে পরিমাণ জ্বালানি অরবিটারে মজুত রয়েছে, তাতে আগামী সাড়ে ৭ বছর চাঁদের কক্ষপথে ঘোরা মুশকিল নয়।

শনিবার ভোররাত পৌন ২টো নাগাদ চাঁদের মাটিতে পা রাখার কথা ছিল চন্দ্রযান ২-এর ল্যান্ডার ‘বিক্রম’-এর। শেষ মুহূর্তের বিপত্তি তা হয়ে ওঠেনি। সংযোগ হারিয়ে যায়। বিক্রম আদৌ চাঁদের মাটিতে পা রেখেছে নাকি তার আগেই বিনষ্ট হয়ে গিয়েছে, তা এখনও বুঝে উঠতে পারেননি মহাকাশ বিজ্ঞানীরা। বেঙ্গালুরুর শ্রীহরিকোটায় ইসরোর স্টেশনের সঙ্গে বিক্রমের সংকেত ছিন্ন হওয়াতেই এই বড় বিপত্তি। ইসরোর এই উদ্যোগের তারিফ না করে পারেনি ‘নাসা’ও। ভবিষ্যতে ভারতের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করার ইচ্ছেও প্রকাশ করেছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থাটি। নাসা বলছে
গত ৬ দশকে মাত্র ৬০ শতাংশ চন্দ্রাভিযান সফল হয়েছে।যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার কার্যকরী সহ সচিব অ্যালিস জি ওয়েলস টুইটে জানিয়েছেন, ‘‘চন্দ্রযান-২-এর দুরন্ত প্রচেষ্টার জন্য অভিনন্দন জানাই ইসরোকে। মার্কিন কূটনীতিক আরও জানান, ‘‘আমাদের কোনও সন্দেহ নেই যে ভারত তাদের মহাকাশ-আতাঙ্ক্ষা পূর্ণ করবে।”

নাসা টুইট করে জানায়, ‘‘মহাকাশ কঠিন। আমরা চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে পা রাখার ইসরোর চন্দ্রযান-২ মিশনের প্রচেষ্টার প্রশংসা করি। আপনারা আমাদের অনুপ্রাণিত করেছেন আপনাদের যাত্রা। ভবিষ্যতে যুগ্মভাবে আমাদের সৌর জগৎকে অন্বেষণ করার সুযোগের তাকিয়ে।”

দূরদর্শনের সঙ্গে শনিবার কথোপকথনের সময় কে শিভান প্রধানমন্ত্রী মোদিকে ‘অনুপ্রেরণা ও সমর্থনের উৎস হিসাবে বর্ণনা করে বলেন, “তার ভাষণটি আমাদের অনুপ্রেরণা দিয়েছিল। তার বক্তব্যে আমি যে বিশেষ অংশটি লক্ষ্য করেছি তা হ’ল: বিজ্ঞান ফলাফলের জন্য নয় বরং পরীক্ষা করার জন্যই এবং পরীক্ষাগুলিই চূড়ান্ত ফলাফলের দিকে পরিচালিত করবে।