দেড় লাখ কোটি টাকা ছাড়ালো ব্যাংক খাতের প্রকৃত খেলাপিঋণ

খেলাপিঋণ বেড়েই চলেছে। গত জুন শেষে যার আকার দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ৪২৫ কোটি টাকায়। খেলাপিঋণের হার এখন ১১ দশমিক ৬৯ শতাংশে। এই সময়ে ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ৬২ হাজার ৭৭ কোটি টাকা। এর বাইরে খেলাপি হওয়া ঋণ রাইট অফ বা অবলোপন হয়েছে ৫০ হাজার কোটি টাকা। এই হিসাবে দেশের ব্যাংক খাতে প্রকৃত খেলাপিঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে এক লাখ ৬২ হাজার ৫১৪ কোটি টাকা। খেলাপির হার দাঁড়াবে ১৬ দশমিক ৮৯ শতাংশ।

ব্যাংকাররা বলছেন, টাকা না দিয়ে পার পেয়ে যাওয়ায় খেলাপির প্রবণতা বাড়ছে। এছাড়া ঋণ পুনঃতফসিলের প্রজ্ঞাপনও আদায়ের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছে বলে দাবি তাদের। বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের সাম্প্রতিক কিছু উদ্যোগে খেলাপিরা আরও উৎসাহিত হচ্ছেন। যে কারণে বাড়ছে খেলাপির পরিমাণ।

খেলাপিঋণ কমিয়ে আনতে বেশকিছু উদ্যোগ নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নীতিমালায় আনা হয় পরিবর্তন। কমানো হয় অবলোপনের সময়সীমা। ঋণ পুনঃতফসিলে জারি করা হয় নতুন প্রজ্ঞাপন। মাত্র দুই শতাংশ অর্থ জমা দিয়েই ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ দেয়া হয় খেলাপিদের।

খেলাপি ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলো প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ (নিরাপত্তা সঞ্চিতি) করতে পারছে না। ফলে ব্যাংকিং খাতে বেড়েছে প্রভিশন ঘাটতি। গত জুন প্রান্তিক শেষে ব্যাংকিং খাতে ১২টি ব্যাংক তাদের প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করতে পারেনি। এর মধ্যে আটটিই বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক। চলতি বছরের জুন শেষে ১২টি ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি হয়েছে আট হাজার ৬৪০ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, পুরনো ঋণের পাশাপাশি নতুন গ্রাহকও খেলাপি হয়ে পড়ছেন। অভিযোগ উঠেছে, যাচাই-বাছাই ছাড়াই দেয়া ঋণই খেলাপি হয়ে পড়ছে। আর এ কাজে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছেন কিছু অসাধু ব্যাংকার। অন্যদিকে ব্যাংকারদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, রাজনৈতিক চাপেই ঋণ বিতরণ করতে হচ্ছে।

খেলাপিঋণ সংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুসারে, গত মার্চে খেলাপেঋণ ছিলো এক লাখ ১০ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকা। খেলাপির হার ছিলো ১১ দশমিক ৮৭ শতাংশ।

জুন শেষে খেলাপির পরিমাণ বৃদ্ধি পেলেও কমেছে হার। এর পেছনের কারণ হচ্ছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ও বিদেশি ব্যাংকগুলোর খেলাপিঋণ কিছুটা কমেছে আগের চেয়ে। কিন্তু বেসরকারি ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোতে খেলাপিঋণের উচ্চহারের ধারাবাহিকতা বজায় ছিল।

ফলে গত তিনমাসের ব্যবধানে বেড়েছে এক হাজার ৫৫১ কোটি টাকা। গত বছরের ডিসেম্বরে খেলাপিঋণ ছিলো ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি ৪০ লাখ টাকা। ওই সময়ে খেলাপির হার ছিলো ১০ দশমিক ৩০ শতাংশ। ছয়মাসের হিসাবে বেড়েছে ১৮ হাজার ৫১৪ কোটি টাকা।

খেলাপিঋণের উচ্চহারের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দুই শতাংশ সুদে পুনঃতফসিলের সুবিধা এখনো পুরোদমে নিতে পারেননি ব্যবসায়ীরা। অনেক ব্যাংকই বুঝে-শুনে পুনঃতফসিল করছে। আগামী সেপ্টেম্বর মাসের তথ্যে খেলাপিঋণের পরিমাণ ও হার আরো কমে আসবে।

খেলাপিঋণ ও ঋণের সুদহার কমিয়ে আনতে নানা উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে সরকারের পক্ষ থেকে। এর সবই ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা করা হচ্ছে। সর্বশেষ ঋণ পুনঃতফসিল করতে মাত্র দুই শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দেয়ার সুবিধা নিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। যেখানে সাধারণ নিয়মে কমপক্ষে ১৫ শতাংশ দিতে হতো। কিন্তু ব্যবসায়ীরা এই সুবিধা নিয়েও পরিশোধ করছেন না বকেয়া ঋণ।

গত ৪ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক পরিচালক ও ব্যাংকারদের সঙ্গে বৈঠক করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। বৈঠক শেষে তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন খেলাপিঋণ আর বাড়বে না। ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে শিগগিরই সার্কুলার দেয়া হবে।

তথ্য অনুসারে, গত মার্চ শেষে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মোট খেলাপিঋণ ছিলো ৪৯ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকা বা সাত দশমিক শূন্য আট শতাংশ। জুন শেষে দাঁড়িয়েছে ৫১ হাজার ৯২৪ কোটি টাকায়। খেলাপির হার সাত দশমিক ১৩ শতাংশ।

জুন শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক ও বিডিবিএল ব্যাংকে খেলাপিঋণ দাঁড়িয়েছে ৫৩ হাজার ৭৪৪ কোটি টাকা, খেলাপির হার ৩১ দশমিক ৫৮ শতাংশ। বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৭০ হাজার ১৮৩ কোটি টাকা। অবশ্য গত মার্চ শেষে যা ছিল ৫৩ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা বা ৩২ দশমিক ২০ শতাংশ। গত মার্চ পর্যন্ত বিদেশি ব্যাংকের খেলাপিঋণ ছিলো দুই হাজার ২৫৬ কোটি টাকা বা ছয় দশমিক ২০ শতাংশ। জুন শেষে কমে দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৫৭ কোটি টাকায় বা পাঁচ দশমিক ৪৮ শতাংশ।

এই সময়ে বিশেষায়িত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের (রাকাব) খেলাপিঋণ কিছুটা কমে দাঁড়িয়েছে চার হাজার ৬৯৬ কোটি টাকা। মার্চ শেষে ছিলো চার হাজার ৭৮৭ কোটি টাকা। বিশ্লেষকদের মতে, গুণগত মানের ঋণ না দেয়ায় এসব ঋণই খেলাপি হয়ে পড়ছে। ব্যবসায়ীদের নতুন নতুন সুবিধা দিয়েও আশানুরূপ ফলে বয়ে আনবে না। ঋণের ব্যবহার কোন খাতে হচ্ছে, তা ব্যাংককেই দেখতে হবে।
অবলোপনকৃত মন্দমানের খেলাপিঋণ আদায়েও ভাটা পড়েছে। গত বছর অবলোপনকৃত এ খেলাপিঋণের বিপরীতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর আদায়ের হার দাঁড়িয়েছে মাত্র দুই শতাংশ, যা পাঁচ বছরের মধ্যে সবনিম্ন। এছাড়া চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত এই তিন মাসে অবলোপন খেলাপিঋণের বিপরীতে আদায়ের হার মাত্র দশমিক ৫০ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, খেলাপিঋণ আদায়ে ব্যাংকগুলোকে কঠোর দির্দেশনা দেয়া আছে। এরই মধ্যে প্রতিটি ব্যাংককে মনিটরিং সেল গঠনে করতে বলা হয়েছে। ১০০ কোটি টাকা বা তার বেশি খেলাপিঋণ আছে এমন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে নিবিড় তদারকির মধ্যে আনার নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ফলে খেলাপিঋণ কমে আসবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সম্প্রতি যেসব উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তার সবই খেলাপিদের পক্ষে। যে কারণে ঋণ পরিশোধ না করতেই তারা বেশি উৎসাহিত হচ্ছেন। তাদের মতে, খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংককে শক্তিশালী করা ছাড়া খেলাপিঋণ কমিয়ে আনা সম্ভব নয়।সম্পাদনা: অশোকেশ রায়