সিপিবির বাকশাল বিতর্ক :বিভুরঞ্জন সরকার

সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে কিছুটা বিতর্ক শুরু হয়েছে।সিপিবির রাজনৈতিক লাইন ও নীতি- কৌশল নিয়ে প্রশ্ন তুলে সিপিবির অতীত গৌরবকে নস্যাৎ করার চেষ্টাও লক্ষ করা যাচ্ছে। মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে দেখা যাক মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম কি বলেছেন :

‘‘১৯৭৫ সালে সিপিবি ‘একদলীয় ব্যবস্থা’ তথা ‘বাকশাল’ গঠন না করার জন্য বঙ্গবন্ধুকে আনুষ্ঠানিক ভাবে পরামর্শ দিয়েছিলো। তিনি পার্টির পরামর্শ গ্রহণ করেননি।

এমতাবস্থায়, ‘বাকশাল’ গঠিত হয়ে যাওয়ার পরে পার্টিকে প্রকাশ্যে ‘বিলুপ্তির’ ঘোষণা দিতে হলেও আসলে পার্টি বিলুপ্ত করা হয়নি। খুবই গোপনে, অনেকটা সংকুচিত আকারে, পার্টির অস্তিত্ব ও তার কাঠামো বহাল এবং সক্রিয় রাখা হয়েছিলো। কিন্তু স্বাভাবিক কারণেই সেকথা প্রকাশ করা হয়নি। এমনকি অনেক পার্টি সদস্যকেও সে বিষয়টি অবগত করে ওঠা সম্ভব হয়নি। গোপনীয়তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ধীরে-ধীরে পার্টি কাঠামো সম্প্রসারিত করা হচ্ছিলো।

এরকম একটা ‘হার্ড কোর’ আগাগোড়া গোপনে সংগঠিত ছিলো বলেই ১৫ আগস্টের পর সব পার্টি সদস্যদেরকে তাই দ্রুত পার্টি কাঠামোতে সংগঠিত করা সম্ভব হয়েছিল।’’

আমার জানা মতে, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ভুল তথ্য দেননি। তবে এতোদিন পরে এসে এ সত্য প্রকাশ কেন জরুরি মনে হয়েছে কমরেড সেলিমের কাছে, প্রশ্ন সেটাই।বাকশাল সম্পর্কে আমাদের দেশে অনেকের মধ্যেই বিরূপতা আছে।সেটা ‘ক্যাশ’করার জন্যই কি এই সত্য প্রকাশ? রাজনীতি সচেতন অনেকের প্রতিক্রয়া দেখে বোঝা যাচ্ছে, কমরেড সেলিম সত্য প্রকাশ করতে গিয়ে ভুল বার্তা দিয়েছেন অনেকের কাছে।
বাকশাল প্রশ্নে সিপিবির অবস্থান ভেতরের এবং বাইরের অবস্থান সবার জানার কথা নয়।সিপিবি বঙ্গবন্ধুকে বাকশাল না করার পরামর্শ দিলে তা দিয়েছিলো গোপনে আর বাকশালের পক্ষে অবস্থান ছিলো প্রকাশ্য।এমন কি তখন এমন প্রচারও ছিলো যে, সিপিবির পরামর্শেই বঙ্গবন্ধু একদলীয় ব্যবস্থায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তখন এই প্রচারণারর বিরোধিতা সিপিবি করেনি, বরং এক ধরনের অহংকার তাদের ছিলো যে, বঙ্গবন্ধুর মতো নেতাও তাদের ‘পরামর্শ’ শুনে ‘সিদ্ধান্ত’ নেন।

পার্টি প্রকাশ্যে বিলুপ্ত করা হয়েছিলো, আবার একটি গোপন কাঠামোও রাখা হয়েছিলো। এটা দেশে দেশে কমিউনিস্ট পার্টির কৌশল। কমিউনিস্ট অন্য দলে ঢুকে কাজ করে, পরিস্থিতি নিজেদের অনুকূলে না থাকলে। সময়মতো আবার আত্মপ্রকাশের সুযোগ হাতে রাখে। বাকশালের ক্ষেত্রে হয়তো তেমন হয়েছিলো। বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে সিপিবি সমাজতন্ত্রের পথে যেতে চেয়েছিলো সিপিবি। সিপিবির ত্যাগ-দেশপ্রেম নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সংশয় ছিলো না। কিন্তু তাদের জটিল তত্ত্ব ও প্রায়োগিক কৌশল নিয়ে বঙ্গবন্ধুর মনে প্রশ্ন ছিলো। সিপিবির কথা শুনলে বাংলাদেশ স্বাধীন করা কঠিন হতো- মনে করতেন বঙ্গবন্ধু। সিপিবি মুক্তিযুদ্ধের সময় দলিল রচনা করেছিলো যে ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ দীর্ঘ স্থায়ী হইবে’। ওই দলিল ছাপাখানায় থাকতেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে যায়। কাজেই সিপিবির দলিলে কি লিপিবদ্ধ আছে সে দিকে দৃষ্টি না দিয়ে বাস্তবে কি ঘটেছে সেটাই দেখা উচিত।

স্বাধীন বাংলাদেশে সিপিবি বঙ্গবন্ধুর সরকারের প্রতি ‘ঐক্য ও সংগ্রামের’ নীতি নিয়েছিলো। কিন্তু মানুষ ঐক্যটাই দেখেছে, সংগ্রামটা দেখেনি। তাই দ্রুত সংগ্রামের জায়গা দখল করে নেয় জাসদ – আওয়ামী লীগ ত্যাগী একদল বিভ্রান্ত মানুষ।

সিপিবি ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ‘সৎ ও দক্ষ’ সরকার গঠনের দাবিও জানিয়েছিলো। তবে সেই সৎ ও দক্ষ ব্যক্তি কোথায় পাওয়া যাবে তার কোনো নির্দেশনা তাদের ছিলো না। বাকশাল নিয়ে সিপিবির উচ্ছ্বাস ছিলো। আমি সিপিবির প্রধান নীতিনির্ধারণী নেতা কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুবাদে অনেক তথ্য জানি, যা থেকে আমার ধারণা হয়েছিলো, সিপিবির নির্ভরতা ছিলো বঙ্গবন্ধুতে তার দল আওয়ামী লীগের ওপর নয়।

বঙ্গবন্ধু নিহত না হলে, বাকশাল টিকে গেলে সিপিবি নিঃসন্দেহে ‘ক্রডিট’ দাবি করতো , কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর যে রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয় তাতে সিপিবি যে কিছুটা দিশাহারা হয়েছিলো তাতে সন্দেহ নেই। বাকশাল ব্যাপকভাবে সমালোচিত হওয়ায় সিপিবি গা থেকে বাকশালের গন্ধ মুছতে গিয়ে ‘উল্টাপাল্টা’ কাজ করে বসে। তারা জিয়াকে ‘সীমিত অর্থে জাতীয়তাবাদী বলে তকমা দিয়ে তার ‘খালকাটা’ কর্মসূচিতে অংশ নেয়। কিন্তু তাতে লাভ হয়নি।

সিপিবি একসময় ছিলো আওয়ামী লীগের ‘বি-টিম’। তখন দলটির স্ফীতি ও বিস্তার ছিলো। এখন সিপিবি স্বাধীন অবস্থানের নামে আওয়ামী লীগ থেকে দূরে। আর আমাদের দেশের রাজনীতির একটি স্বাভাবিক প্রবণতা হলো আওয়ামী লীগ থেকে দূরে মানে প্রতিক্রিয়াশীলতার কাছে। সিপিবি এখন সে জায়াগায় আছে বলেই কমরেড সেলিম অহেতুকভাবে ‘বাকশাল’ বিতর্ক সামনে আনলেন বলে মনে হচ্ছে।