সতেরো জন পোষাক শ্রমিক এবং সিমেন্টবাহী ট্রাকের তন্দ্রালু হেলপার

ওরা শ্রমজীবী মানুষ । ‘শ্রমশক্তি’ই ওদের সম্বল । এই শ্রমশক্তির জোরেই ওরা মেহনত করে এবং উৎপন্ন করে পণ্য । মালিকের কাছ থেকে পায় মজুরী । সেই মজুরী দিয়েই ওরা জীবিকা নির্বাহ করে । ওদের কোন পুঁজি নাই , জমি-জিরাত নাই , কল-কারখানা নাই , পাহাড় বন বাগান , প্রাণী সম্পদ, খামার কিছুই নাই । আছে শুধু আল্লাহ প্রদত্ত দুটো হাত, মেধা আর ‘শ্রমশক্তি’ । এই দুটো হাত , মেধা ও শ্রমশক্তি প্রয়োগ করে পোশাক কারখানায় , উৎপন্ন করে পোশাক , সভ্য মানুষের জন্য। বিনিময়ে পায় মজুরী। এই মজুরীলব্ধ অর্থ দিয়ে ওরা নিজেদের ক্ষুৎপিপাসা মিটায় , প্রিয়তমাকে উপহার দেয়, সন্তানদের বায়না মেটায় , বৃদ্ধা-বৃদ্ধ মাতা পিতার চিকিৎসার খরচ বহন করে , প্রয়োজনে খরিদ করে ঔষধ-পথ্য। ওরাই পোষাক শ্রমিক । ওদের তৈরী পোশাক পরিধান করে দেশ-বিদেশের অভিজাতজন গর্বিত হয় , সাজসজ্জা করে। গরিবেরা সতর ঢাকে, লজ্জা নিবারন করে। পোষাক কারখানার মালিকদের পুঁজি স্ফীত থেকে স্ফীততর হয় । তারা হাওয়াই জাহাজে করে দেশ থেকে দেশান্তরে ঘুরে বেড়ায় , সন্তানদের উন্নত দেশে, উন্নত জীবন যাপন ও উন্নত শিক্ষার জন্য প্রেরণ করে। বিলাস বহুল জীবন যাপন করে।

কিন্তু শ্রমিকদের ক্ষেত্রে ভিন্নতর জীবন । তারা সারা মাস কাজ করে যে মজুরী পায় , একজন মালিকের এক জোড়া জুতার দামও তার চেয়ে বেশী । কিন্তু উপায় নাই জীবিকার প্রয়োজনে শ্রমিককে যেতে হয় কাজে , কাজ না করলে খাবার জুটে না। মফস্বল এলাকায় কাজের কোন সুযোগ নাই । তাই ছুটতে হয় ঢাকা মহানগরে। গাইবান্ধার জহির আলি নিজ গ্রামে পরিবার-পরিজনের সাথে খুব কম সময়ই থাকতে পারে। ফসল বপন ও কাটার সময় গ্রামে কিছু কাজ থাকে । এই সময় সে গ্রামে থেকে মজুরী খাটে । তারপর চলে যায় ঢাকা মহানগরে । রিক্সা চালিয়ে আয় করে। বাস করতে হয় মানবেতর পরিবেশে । রাজশাহী মহানগরের তেরখাদিয়া এলাকার পরান মিয়া রিকসা চালায় সাভারের নবীনগরে। রাজশাহী মহানগরে রিকসা চালিয়ে যা আয় করতে পারে , সাভারে সে ঐ একই পরিশ্রমে আয় করে অনেক বেশী ।

কাজের সন্ধানে দলে দলে বিভিন্ন বয়সের নারী পুরুষ ছুটছে ঢাকায় । পোষাক কারখানাগুলো তাদেরকে প্রবলভাবে আকৃষ্ট করছে । পাঠশালা স্কুল ত্যাগ করে কিশোর তরুনেরাও ছুটছে এই গন্তব্যে । যে কোন মজুরীতে, যে কোন কাজ করতে তারা সম্মত । খাবার পেতে হলে তাদেরকে কাজ করতেই হবে। অভাবের তাড়না এতো প্রবল যে তারা দর-কষাকষি করতেও সুযোগ পায় না । মালিক / নিয়োগ কর্তার প্রস্তাব মতো মজুরীতে রাজি না হলে কাজ নেই। বিকল্প কর্মক্ষেত্র নাই । তাই মালিক / নিয়োগ কর্তার প্রস্তাবিত মজুরীতেই রাজি হয়ে কাজ করতে হয় । তা না হলে নিশ্চিত অনাহার। এই অনাহার ও অভাবজাত দুর্দশা অবস্থার নিরসনের আশা হাতছানি দিয়ে কিশোর-কিশোরী তরুন-তরুনীদেরকে ডাকছে মহানগর ঢাকায় । মফস্বল এলাকার বহু বাসিন্দা আছেন , নগর মহানগরে বাস করে অনেক বিদ্যাবুদ্ধি ধন-সম্পদ প্রভাব-প্রতিপত্তির মালিক হয়েছেন । নিজ এলাকার ফল ফসল , প্রাণী সম্পদ এবং তৎজাত ভোগ্য পণ্য কেন্দ্রীক শিল্প কারখানা , হাসপাতাল , উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করার সামর্থ তাদের আছে । ইচ্ছা থাকলেও তারা তা করতে বা গড়তে পারেন না। সরকারের কাছ থেকে উপযুক্ত এবং উৎসাহ মূলক অনুমতি , আনুক’ল্য ও সুযোগ-সুবিধা না পাবার কারণে । ঢাকা মহানগরীর উপকন্ঠের শিল্পকারখানা , হাসপাতাল, বে-সরকারী বিশ^বিদ্যালয়গুলো তুলনামূলকভাবে যথাযথ অনুমতি ও আনুক’ল্য পেয়ে আসছে । এই সব প্রতিষ্ঠানে রয়েছে কর্মসংস্থানের সুযোগ । চাকুরী, সেবা ও উচ্চশিক্ষা পেতে মফস্বল থেকে ছুটছে মহানগরী ঢাকাতে ।

এভাবে সরকার কর্তৃক উন্নয়ন, সেবা ও শিক্ষাসহ বিভিন্ন খাতে বরাদ্দকৃত অর্থ বিনিয়োগ হচ্ছে মহানগরীতে ; আবার সেবা পেতে ও শিক্ষা অর্জনের জন্য যারা আসছে তারাও মফস্বল থেকে নিয়ে আসা অর্থ এই মহানগরীতেই ব্যয় করছে । যারা চাকুরী করছে তারা তাদের বেতন ভাতা মজুরী ( যে যেভাবে পাচ্ছে ) এর একটা বড় অংশ নিজেদের দৈনন্দিন চাহিদা মেটাবার জন্য এই মহানগরীতেই ব্যয় করছে । এভাবে ঢাকা মহানগরীর অর্থনৈতিক গতিশীলতা প্রবল থেকে প্রবলতর হচ্ছে এবং মফস্বল তথা গ্রাম গ্রামাঞ্চলের অর্থনৈতিক গতি স্থবির থেকে আরো স্থবির হয়ে যাচ্ছে । জীবনের গতি সচল রাখতে শ্রমজীবী-কর্মজীবী-পেশাজীবী মানুষ ছুটে যাচ্ছে ঢাকায় । উৎসব আনন্দের দিনগুলোতে তারা দলে দলে ফিরে আসে নিজ নিজ মফস্বলের গ্রাম শহরে। এই ফিরে চলার জন্য উপযুক্ত রাস্তাঘাট গড়ে উঠেনি , পর্যাপ্ত যানবাহন নাই । ফিরে চলার ভ্রমণ ব্যয়বহুল । শ্রমজীবী কর্মজীবী পেশাজীবী জনগণকে ট্রেন , বাস , লঞ্চ , ষ্টীমার এর টিকেট সংগ্রহ করতে দীর্ঘ সময় ধরে লাইন দিতে হয় । বৈধ-অবৈধ , নৈতিক-অনৈতিক পথ ধরে যারা অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন সেসব মালিক, ব্যবসায়ী , আমলাদের জন্য রয়েছে আকাশ পথ । শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আকাশ পথে ভ্রমণ করার সুযোগ শ্রমজীবী কর্মজীবী পেশাজীবী জনগণের কপালে জুটে না । যারা ট্রেন বাসের টিকেট সংগ্রহ করতেও হিমশিম খায় তারা যাত্রাপথের খরচ সাশ্রয় করতে বেছে নেয় ট্রেন , বাস এর ছাদ , পণ্যবাহী ট্রাকে মালামালের উপরে বসেও কেউ কেউ ঘরে ফিরে। এরূপ ভ্রমণ জীবনের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ । তাই এটা নিষিদ্ধ । তা সত্ত্বেও প্রকাশ্যেই এরূপ ভ্রমণ করে মানুষ । প্রশাসনের কর্মকর্তাগণ ও হাইওয়ে পুলিশ এ বিষয়ে তাদের দায়িত্ব যথাযথ পালন করলে এই ঝুঁিকপূর্ণ ভ্রমণ এড়ানো যেত ।

জনশ্রুতি আছে এখানেও ‘ম্যানেজ’ করার ব্যাপার স্যাপার আছে । তাই এই ঝুঁকিপূর্ণ ভ্রমণ চলছে অব্যাহত গতিতে । লালমনিরহাট নিবাসী কতিপয় পোষাক শ্রমিক ঢাকা থেকে বাড়ি ফেরার জন্য সিমেন্টবাহী একটি ট্রাকে আরোহণ করে। তাদের ‘শ্রম শক্তি’ কিনেছে মালিক পক্ষ । এই শ্রমিকেরা ‘মজুরী’ পায় কিন্তু ‘লভ্যাংশ’ পায় না , লভ্যাংশের ক্ষেত্রে তাদের কোন অংশীদারীত্ব নাই। মিল সুষ্ঠুভাবে চালু রাখা , ক্রেতাদের পছন্দসই পোষাক প্রস্তুত করা , উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করা এসব ক্ষেত্রে প্রতিটি পদক্ষেপে নিয়ামক ভ’মিকা পালন করে এই শ্রমিকেরা । ঈদ উৎসবে এদের গৃহে ফেরার ব্যবস্থা মালিক পক্ষ করতে পারতো । মালিক পক্ষ বা তাদের কেন্দ্রীয় সংগঠন তা করে নাই । ‘মজুরী’ দিয়েই মালিক এবং তাদের কেন্দ্রীয় সংগঠন শ্রমিকদের প্রতি দায়িত্ব শেষ করেছে । সিমেন্টবাহী ট্রাকে চড়ে শ্রমিকেরা রওনা হয়েছে নিজ নিজ গন্তব্যে । তা করে ট্রেন বা বাসের টিকেট কাটার ঝক্কি এড়াতে চেয়েছে এবং এই খাতে অর্থের সাশ্রয়ের আশা করেছে । ওদের স্বপ্ন বাড়ি ফিরে যাবে পরিবার-পরিজন প্রিয়জন স্বজনদের প্রয়োজন মেটাতে সামর্থ্য মতো কেনাকাটা করবে । সবাই মিলে দারিদ্র এড়িয়ে হাসিমুখে উৎযাপন করবে ঈদুল ফিতর। ঢাকা থেকে ট্রাকটা সিমেন্ট ও শ্রমিকদের নিয়ে রওনা হলো। প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ ও ‘হাইওয়ে পুলিশ’এর নাকের ডগা দিয়ে ট্রাক এগিয়ে চললো । পণ্যবাহী ট্রাক দেখলেই পুলিশ থামতে বলে, সংকেত দেবার সাথে সাথেই ‘চেলা’ কাঠ হাতে কিশোর তৎপর হয়ে উঠে । এই কিশোর একবার যায় চালকের কাছে , সেখানে কথাবার্তা বলে ফিরে যায় ‘সংকেতদানকারী’ পুলিশের কাছে । ফিরতি সংকেত পেলেই ট্রাক পুনরায় যাত্রা শুরু করে। এটাই মহাসড়কের স্বাভাবিক (!) দৃশ্য । এখানে পুলিশ বা অন্য কারো ভিতও কোন দ্বিধা সংকোচ বা লজ্জাবোধের লেশমাত্র অনুভূতি নাই। আলোচ্য সিমেন্টবাহী ট্রাকটি কি এরূপ কোন সংকেত পেয়েছে, হাইওয়ে পুলিশ সংকেত দিয়ে থাকলে তারা কেন ট্রাকটিকে অগ্রসর হতে দিয়েছে , না কি গতানুগতিক ঘটনা ঘটেছে ! ট্রাকটি যমুনা সেতু পাড় হয়েছে , সেখানে টোল আদায়কারীদের দৃষ্টি কিভাবে এড়িয়ে গেছে সিমেন্টের বস্তার উপর আরোহী শ্রমিকগণ । পুলিশ , সেতু কর্তৃপক্ষ, সড়ক পথে নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বরত কর্তৃপক্ষ কি কারণে নির্বিকার থাকতে পারলো এই শ্রমিকদের ট্রাকে আরোহণের ব্যাপারে। রংপুরে এসে ট্রাকটি দুর্ঘটনায় পতিত হলো । ভবলীলা সাঙ্গ হলো সতেরো জনের । তাদের সহযাত্রীরা আহত হয়ে নীত হলো বিভিন্ন হাসপাতালে ।

এদের অনেককেই বরণ করতে হবে পঙ্গুত্ব, সেই সাথে নিশ্চিত বেক্রাত্ব । পবিত্র মাসে সেহেরীর সময় এই খবর ছড়িয়ে পড়লো সারা দেশে , প্রচার মাধ্যমের গুণে। হৈ চৈ পড়ে গেলো । সবশেষে রাজণ্য বললেন ট্রাকটি চালাচ্ছিল একজন ‘হেলপার’ এবং সে ছিল ‘তন্দ্রালু’ । এর পর সব নিশ্চুপ । জনগণের অর্থে যারা প্রতিপালিত হচ্ছে যাত্রীদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করার জন্য, তারা সবাই এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে ইংগিত পেলো দায়মুক্তি পাবার। নিহত শ্রমিকদের পোষ্য ও স্বজনেরা স্থায়ী অনিশ্চয়তার মাঝে পড়ে গেলো , তাদেরকে দারিদ্রের বোঝা বয়ে বেড়াতে হবে অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত । যারা আহত হয়ে পঙ্গুত্ববরণ করলো তাদের সংকট আরো প্রকট ; চিকিৎসা করবে , না পোষ্যদের পালন করবে এই প্রশ্নের সমাধান তারা কোন দিনও করতে পারবে না। চিকিৎসা করতে গেলো খাবার থাকবে না , ক্ষুধা মেটাতে গেলো চিকিৎসা হবে না। পোষাক শিল্প মালিক ও তাদের কেন্দ্রীয় সংগঠন বা জন-প্রশাসন , পুলিশ কর্তৃপক্ষ কেউই এর দায় বহন করবে না । লোক দেখানো যা করবে তা কারোই প্রকৃত প্রয়োজন মেটানোর জন্য পর্যাপ্ত নয় ।
এই ঘটনা আমাদেরকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো আঞ্চলিক বৈষম্য, শিল্প কারখানায় সামাজিক মালিকানার বদলে ব্যক্তি , পারিবারিক ও গোষ্ঠি মালিকানা আমাদের জনজীবনকে এক ভয়াবহ সংকটে ফেলেছে ; দুঃসহ জীবন বরন করতে হয়েছে শ্রমজীবী কর্মজীবী পেশাজীবী জনগণকে। প্রকৃত অর্থে সুশাসন এবং শিল্প-কারখানায় সামাজিক মালিকানার অভাবই জন-প্রশাসন , পুলিশ কর্তৃপক্ষ, সেতু কর্তৃপক্ষকে যাত্রীদেও নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালনে উদাসীন করে রেখেছে , দায়িত্ব পালনে অবহেলাকে প্রশ্রয় দিয়ে চলেছে। জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধিত্বশীল শাসন-ব্যবস্থা এবং শিল্প কারখানায় সামাজিক মালিকানা যতদিন কায়েম না হবে ততদিন ‘শ্রমজীবী কর্মজীবী পেশাজীবী’ জনগণ রাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রকৃত সুশাসন ও সেবা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হতেই থাকবে । দায়িত্বে অবহেলাকারী সরকারী কর্মকর্তাগণ , শিল্প মালিক গোষ্ঠি ও তাদের কেন্দ্রীয় সংগঠন সবদোষ ‘তন্দ্রালু’ হেলপারের উপর চাপিয়ে দায়মুক্তি পেয়ে যাবে। এভাবে অতীতে হয়েছে এবং বর্তমানে হয়ে চলেছে । তাই এই গোলক ধাঁধা থেকে মুক্তির জন্য ‘শ্রমজীবী-কর্মজীবী-পেশাজীবী’ জনগণকে এগিয়ে আসতে হবে এই আঞ্চলিক বৈষম্য এবং শিল্প-কারখানায় ব্যক্তি পারিবারিক ও গোষ্ঠি মালিকানারা অবসানের জন্য।
লেখক:সা কা ম আনিছুর রহমান খান
সাবেক জেলা ও দায়রা জজ।