সিলেটের ১৯ পৌরসভা এখন যেন ভাগাড়

সুনামগঞ্জ শহরের বিভিন্ন স্থানে জমে আছে ময়লার স্তূপ। পৌর এলাকার ডাস্টবিনগুলো থেকে উপচে পড়ছে ময়লা-আবর্জনা। অনেক জায়গায় বৃষ্টির পানিতে মিশে ময়লাগুলো ড্রেন থেকে রাস্তায় ও খালে গিয়ে পড়ছে। পথচারীরা দুর্গন্ধ থেকে বাঁচতে নাকে রুমাল দিলেও আশপাশের বাসিন্দাদের সে উপায় নেই। ময়লা জমে মশা-মাছির নিরাপদ আবাস হয়ে উঠেছে ডাস্টবিনগুলো। এতে পরিবেশ দূষণের ফলে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছেন পৌর শহরের বাসিন্দারা।

সারাদেশে টানা ২২ দিন ধরে পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মবিরতি চলছে। সরকারের রাজস্ব শাখা থেকে বেতন-ভাতার দাবিতে সিলেট বিভাগের ১৯ পৌরসভায় চলমান কর্মবিরতিতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। জন্মনিবন্ধন করতে না পেরে অনেকে পাসপোর্ট করতে পারছেন না। ট্রেড লাইসেন্স, বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহ, স্বাস্থ্য, অ্যাসেসমেন্ট শাখাসহ সব গুরুত্বপূর্ণ শাখা বন্ধ থাকায় সেবাবঞ্চিত হচ্ছেন পৌর বাসিন্দারা।

রাজধানীর গণ্ডি পেরিয়ে ডেঙ্গু এবারে সিলেটে ছড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান জরুরি। কিন্তু পৌর এলাকার ময়লা-আবর্জনা অপসারণ না করায় সাধারণের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে অনেক পৌরসভার বাসিন্দারা মেয়র-কাউন্সিলরদের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মবিরতির ফলে অসহায় মেয়র-কাউন্সিলররা তাদের কোনো আশ্বাসও দিতে পারছেন না।

হবিগঞ্জ পৌর শহরের ইনাতাবাদ এলাকার আব্দুস সহিদ জানান, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনুপস্থিতির কারণে

ভাটা পড়েছে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম। পাড়ায়-পাড়ায় জমে আছে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। ডেঙ্গু আতঙ্কের মধ্যেও নেই মশক নিধন অভিযান। নেই জলাবদ্ধতার স্থায়ী-অস্থায়ী সমাধান। মেয়র ও কাউন্সিলররা শুধু দাপ্তরিক কিছু কাজ আর ফাইলপত্রে স্বাক্ষর করেই দিন পার করছেন।

নিজেদের অসহায়ত্বের কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশ পৌরসভা সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন সিলেট জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ও গোলাপগঞ্জ পৌরসভার সহকারী ট্যাক্স কালেক্টর আব্দুল বাছিত সমকালকে বলেন, আমরা দিন-রাত পরিশ্রম করছি। ছুটির দিনেও নাগরিকদের সব ধরনের সেবা দিয়ে যাচ্ছি। অথচ শেষকালে প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা পৌর মেয়রের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভর করতে হয়। তাই আমাদের চাকরি রাজস্ব শাখায় অন্তর্ভুক্ত করতে প্রধানমন্ত্রীর দ্বারস্থ হয়েছি।

সিলেট বিভাগের চার জেলার মধ্যে সিলেটে চারটি, হবিগঞ্জে ছয়টি, মৌলভীবাজারে পাঁচটি এবং সুনামগঞ্জে চারটি পৌরসভা রয়েছে। এসব পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চলমান আন্দোলনের ফলে কয়েক লাখ বাসিন্দা দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। সুনামগঞ্জ শহরের ষোলঘরের সাব্বির আহমদ বলেন, জন্মনিবন্ধন করার জন্য পৌরসভায় গিয়েছিলাম। হিসাব শাখা বন্ধ থাকায় ফরম কিনতে পারিনি। তিনি জানান, পাসপোর্ট করার জন্য জরুরিভিত্তিতে তার জন্মনিবন্ধন সনদ প্রয়োজন।

সিলেটের গোলাপগঞ্জ পৌর এলাকার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সুফিয়া বেগম জানান, তিনি একটি উত্তরাধিকার সনদের জন্য ৪-৫ দিন ধরে ঘুরছেন। কর্মচারীদের কাউকে পৌরসভায় না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। সনদ না পেয়ে

তার মারাত্মক ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে।

গতকাল রোববার সরেজমিন সমকাল প্রতিনিধিরা দেখেছেন, অধিকাংশ পৌরসভার সাধারণ শাখায় তালা ঝুলছে। দু-একটি শাখার

অফিস খোলা থাকলেও তাতে কেউ নেই। সুনামগঞ্জ পৌরসভার ট্রেড লাইসেন্স শাখায় দু’জন বসে থাকলেও কোনো কাজ করছেন না। নাগরিকদের অসুবিধার জন্য আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করে সিলেট বিভাগীয় পৌরসভা সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক কালী কৃষ্ণ পাল সমকালকে বলেন, সরকার দাবি মেনে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সবাই কর্মস্থলে ফিরে যাব।

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল পৌরসভায় ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ওয়াহিদ মিয়া বলেন, একটি ঘর নির্মাণের অনুমতির জন্য তিন দিন ধরে পৌরসভায় গিয়ে দেখি দরজা বন্ধ। ছাতক পৌরসভার বাসিন্দা হরিপদ বৈদ্য বলেন, রাস্তাঘাটে ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকায় মশা-মাছি জন্ম নিচ্ছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) মৌলভীবাজার জেলা শাখার আহ্বায়ক আসম সালেহ সুহেল জানান, ময়লা-আবর্জনা পরিস্কার না করায় দুর্গন্ধে টেকা যাচ্ছে না। এতে পরিবেশেরও মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে।

সিলেটের জকিগঞ্জ পৌরসভার কাউন্সিলর রিপন আহমদ জানান, কর্মকর্তা কর্মচারীদের আন্দোলনের কারণে সব কার্যক্রম প্রায় বন্ধ। নাগরিক সনদ, উত্তরাধিকারী সনদ, প্রত্যয়নপত্র নিতে আসা মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছে। তিনি পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ন্যায্য দাবি মেনে নিয়ে সার্বিক কার্যক্রম সচল করার দাবি জানান। অন্যদিকে বিয়ানীবাজার পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কর্মবিরতি পালন করলেও জরুরি সেবা অব্যাহত রেখেছেন।

পৌরসভা সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সিলেট বিভাগীয় সভাপতি ও মৌলভীবাজার পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী নকীবুর রহমান জানান, বিভিন্ন পৌরসভায় ২ থেকে ৫৮ মাসের বেতন-ভাতা বকেয়া রয়েছে। তিনি বলেন, পৌরসভার বিভিন্ন পদে মন্ত্রণালয় থেকে নিয়োগ দেওয়া হবে আর বেতন দেবে পৌরসভার তহবিল থেকে- তা হতে পারে না।

প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলাসহ বিভিন্ন উপজেলা প্রতিনিধিরা
সুত্র:যুগান্তর