বিমানের লুটপাটে ২০০ কর্মকর্তা : ১০ জনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এবং সিভিল এভিয়েশনের লুটপাটে জড়িত ২শ অসাধু কর্মকর্তা নজরদারিতে রয়েছেন। এদের মধ্যে ১০ কর্মকর্তার দেশত্যাগেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। বিমান ক্রয় ও লিজ, রক্ষণাবেক্ষণ, টিকিট বিক্রি, কার্গো এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট, ক্যাটারিংসহ নানা খাতে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে ওই সব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চাঞ্চল্যকর তথ্য-উপাত্ত পেয়েছে দুদক। ওই সব তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে সবাইকে দুদকে তলব করা হচ্ছে। দুর্নীতির পাশাপাশি ওই সব কর্মকর্তার অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধানেও কাজ করবে দুদক।

এরই মধ্যে বিমানের সদ্যবিদায়ী ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ১০ জনের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে বিমানের সাবেক এমডিসহ চার কর্মকর্তাকে দুদক জেরা করেছে। বিমানের দুর্নীতির অনুসন্ধান করছেন দুদকের চার কর্মকর্তার নেতৃত্বে অনুসন্ধান কমিটি। অনুসন্ধান কর্মকর্তারা হলেন উপপরিচালক মো. নাসিরউদ্দিন, সহকারী পরিচালক সাইফুল ইসলাম, মো. আতাউর রহমান ও মো. সালাহ উদ্দিন। মুনীম মোসাদ্দিক আহম্মেদ ছাড়া বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা পাওয়া অন্যরা হলেন- বিমানের গ্রাউন্ড সার্ভিস সুপারভাইজার জি এম জাকির হোসেন, মো. মিজানুর রহমান ও এ কে এম মাসুম বিল্লাহ, জুনিয়র গ্রাউন্ড সার্ভিস অফিসার মো. মশিকুর রহমান, কমার্শিয়াল সুপারভাইজার মো. রফিকুল আলম ও গোলাম কায়সার আহমেদ, কমার্শিয়াল অফিসার মো. জাওয়েদ তারিক খান ও মাহফুজুল করিম সিদ্দিকী, জুনিয়র কমার্শিয়াল অফিসার মারুফ মেহেদী হাসান। দুদক সূত্রে জানা গেছে, ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ-দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে পাইলট নিয়োগসহ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধান করছেন সহকারী পরিচালক সাইফুল ইসলাম। প্রাথমিক অনুসন্ধানে বিমানের সাবেক এমডি আবদুল মুনীম মোসাদ্দিক আহম্মেদসহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার দুর্নীতির তথ্য-উপাত্ত পেয়েছেন অনুসন্ধান কর্মকর্তা।

প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে গত ২ মে বিমানের সাবেক ওই শীর্ষ কর্মকর্তাসহ ১০ জনের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা চেয়ে পুলিশের বিশেষ শাখার অতিরিক্ত মহাপরিচালকের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি অনুলিপি দেওয়া হয়েছে বিশেষ পুলিশ সুপারসহ (ইমিগ্রেশন) বেশ কয়েকটি জায়গায়। এরই মধ্যে ৩৭ কর্মকর্তার দুর্নীতির তথ্য-প্রমাণ রয়েছে দুদকের এ কর্মকর্তার কাছে। বিমান ছাড়াও সিভিল এভিয়েশনের যে কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে তিনি হলেন শাহজালাল, শাহ আমানত, সিলেট ওসমানী ও কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ৫ প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হাবিবুর রহমান। এ ৫ প্রকল্পের ফাইল তলব করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হাবিবুর রহমানের ব্যক্তিগত নথিও তলব করে। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, কমিশন ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। চিঠিতে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের তদন্ত করতে ১৯৯৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রকৌশলী হাবিবুর রহমানের বেতন-ভাতা, অগ্রিম/ঋণ (কর্তনসহ) খাতভিত্তিক প্রদানের জন্য বলা হয়েছে। দুদকের সহকারী পরিচালক জাহিদ কামাল স্বাক্ষরে এক চিঠিতে এসব নথি তলব করা হয়। দুদক সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিক তদন্তে তারা তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি ও ফাইল আটকে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ পেয়েছেন।

সূত্র জানায়, হাবিবুর রহমান গুরুত্বপূর্ণ ৭টি বিমানবন্দরের দায়িত্ব রয়েছেন। এর মধ্যে সরকারের মেগা প্রকল্প খান জাহান আলী বিমানবন্দর উন্নয়ন, সৈয়দপুর বিমানবন্দর উন্নয়ন, ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে ওভারলেকরণ, ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নতুন টার্মিনাল ভবন নির্মাণ। চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরের রানওয়ে ওভারলেকরণ, চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্যারালাল টেক্সিওয়ে, রানওয়ে সম্প্রসারণ এবং বিদ্যমান টার্মিনালের সম্প্রসারণ নবরূপায়ণও এর অন্তর্ভুক্ত। এ ছাড়া কক্সবাজার বিমানবন্দরের টার্মিনাল ভবন নির্মাণ ও বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণ অন্যতম। দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগে যে কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান চলছে, সেই কর্মকর্তাকেই ৭ গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরের কাজের দায়িত্ব দেওয়া ঠিক হয়নি বলে মনে করেন বিষেশজ্ঞরা। তারা বলছেন, এতে প্রকল্পগুলোর উন্নয়ন কাজ বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে। এ ছাড়া ৭টি বিমানবন্দর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী চলাচল করেন। প্রকল্পগুলোর মধ্যে রাডার মেরামত, কেলিব্রেশন, এক্সপ্লোসিভ ডিটেনশন সিস্টেম স্থাপন, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর টার্মিনালে বিনা টেন্ডারে ১৬ কোটি টাকার কাজ, বোর্ডিং ব্রিজের স্পেয়ার পার্টস ক্রয় এবং উন্নয়ন সংক্রান্ত মেগা প্রকল্প অন্যতম। অভিযোগ আছে, সংশ্লিষ্ট শাখার ওই কর্মকর্তাকে ২ শতাংশ কমিশন না দিলে তিনি কোনো ফাইলই পাঠান না। উল্টো সেগুলো বেবিচকে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তার বিরুদ্ধে ঘুষ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। নিজস্ব সিন্ডিকেট ছাড়া অন্য কাউকে কাজ দেন না।

সিভিল ডিভিশন-১’-এ গত ৫ বছর থাকাকালীন তিনি নিজের বন্ধুদের কাজ দিয়ে তাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। এভাবে তিনি বিপুল অর্থ-সম্পত্তির মালিক বনে গেছেন। একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী হাবিবুর রহমান ছাত্রজীবনে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তার আত্মীয়স্বজন জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। এর আগে কক্সবাজার বিমানবন্দর উন্নয়ন কাজের প্রকল্প পরিচালক থাকাকালে তার বিরুদ্ধে টেন্ডারে দুর্নীতির প্রমাণ পায় মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি। এ অভিযোগে তাকে প্রকল্প পরিচালকের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
লেখক:মির্জা মেহেদী তমাল