নিউক্লিয়াসঃ যুব সমাজে স্বাধীনতার স্বপ্ন রূপায়ন কেন্দ্র

সিরাজুল আলম খানের ভক্ত, অনুসারী ও সমালোচকদের পক্ষ থেকে তাঁর উপর অনেকদিন ধরেই চাপ ছিল মহান মুক্তি সংগ্রামে সেই সব দিন গুলোর উপর কথা বলার, নিউক্লিয়াস নিয়ে লেখার। আব্দুর রাজ্জাক ভাই অনেক কথা বলেছেন, আরেফ ভাইও বলেছেন। কিন্তু সিরাজুল আলম খান না বললে তা পূর্নাংগ হয় না। সাক্ষাতকার ভিত্তিতে সামসুদ্দিন পেয়ারা “আমি সিরাজুলালম খান” বইতে যা লিখেছেন তা পাঠকদের অনেকখানি চাহিদা পূরন করবে বলে আমি মনে করি।
কিন্তু সর্বজনাব হোসেন আমু ও তোফায়েল আহমদ একটি জাতীয় দৈনিকে ধারাবাহিক ভাবে এই লেখার উপর যে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন তা দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাদের মত সিনিয়র পলিটিশিয়ান মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাবলি নিয়ে এমন একপেশে ও প্রকারান্তরে অসত্য কথা বলবেন তা ছিল ধারণাতীত। তাদের ভাষাও ছিল অনেক ক্ষেত্রে অশালীন। এসব বিতর্ক ও অস্বস্থিকর ঘটনার প্রেক্ষাপটে আমার এই লেখা পাঠককে সচ্ছ ধারনা দেবে বলে মনে করি।
আমি সিরাজুল আলম খানের বই পড়েছি। আপত্তি করার মত বিশেষ কিছু দেখিনি। তবে বইটি সময় নিয়ে দিন-তারিখ গুলোর সঠিকতা ও তথ্যের যথাযথতা যাচাই করে সম্পাদনা করা দরকার ছিল। কেননা এই বই রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
আমু ভাই-তোফায়েল আহমদরা ১৯৬২ সনে গঠিত “নিউক্লিয়াস” এর অস্তিত্ব মানতে নারাজ। বাস্তবতা হল নিউক্লিয়াস ছিল গোপন সংগঠন। এটা কোন কল্পকাহিনী নয়, এর অস্তিত্ব বাস্তব সত্য, এবং তৎকালীন প্রতাপশালী তিন ছাত্রনেতা সর্বজনাব সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক ও কাজী আরেফ আহমদ এই নিউক্লিয়াস গঠন করেছিলেন। তারা পরিকল্পিত ভাবে স্বাধীনতার স্বপ্ন প্রথমে ছাত্রলীগের মাঝে ও পরে শ্রমিক অঙ্গনে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। নিউক্লিয়াসের নেতারা সম্ভবত আমু ভাই ও তোফায়েল ভাইকে তখন উপযুক্ত মনে করেন নাই। সেখ ফজলুল হক মনি ভাইকে তারা আস্থায় নেন নাই। স্বাধীনতার লক্ষে পরিচালিত নিউক্লিয়াস নিয়ে কাজী আরেফ ও আব্দুর রাজ্জাক ভাই এর অনেক মিডিয়া ইন্টার্ভিউ রয়েছে। কাজী আরেফের একটা বইও আছে। কাজী আরেফের একাধিক স্মৃতি সভায় নিউক্লিয়াসের স্বীকৃতি দিয়ে জনাব তোফায়েল আহমদের বক্তৃতাও আমি শুনেছি। ঊনি এও বলেছেন যে সিরাজ ভাই ৬৯ এর আন্দোলনের সময় তাকে গাইড করতেন। তোফায়েল ভাই এসব কথা বিস্মৃত হলেন কি করে! তার কাছ থেকে এখন উল্টো কথা শুনে আমি বিচলিত এই জন্য যে এসব কিছু মহান মুক্তিসংগ্রামের প্রকৃত ইতিহাস বিকৃত করার পরিবেশ তৈরী করবে। আমু ভাই কাজী আরেফকে নিউক্লিয়াস গঠন করার মত উপযুক্ত নেতা মনে করেন নাই, বয়স নিয়েও কথা বলেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার বয়স ছিল ২৩, আমার সিনিয়রদের কারো বয়স তখন ৩০ এর উপর ছিল না। নিউক্লিয়াসের মত গোপন ও বিপ্লবী সংগঠন করতে নামজাদা নেতা না হলেও চলে। স্বাধীনতার লক্ষে অবিচিল আস্থাই বড় কথা। প্রাসঙ্গিকভাবে এই আলোচনায় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম নেতা নূরে আলম সিদ্দিকী নিউক্লিয়াসকে অস্বীকার করেছেন। তার কথা অসংগত বলা যায় না, গনতন্রী হলেও তিনি কখনও সমাজতন্ত্র মনোভাবাপন্ন ছিলেন না বলে তাকে এই শিবিরে অন্তর্ভুক্ত করা হয় নি তখন।
’৬০ এর দশকে বাংলাদেশের মানুষের মাঝে স্বাধীনতার যে সুপ্ত আকাংখা ছিল, তাতে এরকম গোপন সংগঠন বা গ্রুপ গড়ে ওঠা ছিল স্বাভাবিক। মহিউদ্দিন আহমদের গবেষনায় তার কিছু প্রতিফলন দেখা যায়। লক্ষে অবিচল আস্থা এবং সাংগঠনিক দক্ষতার উপর সব সংগঠনের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে। নিউক্লিয়াস সফল হয়েছিল তাদের নেতৃত্বগুণে এবং কিছুটা ভাগ্যগুণেও বটে। শেখ মুজিবের ৬দফা কর্মসূচী নিউক্লিয়াসের লক্ষ অর্জনের পথ খুলে দেয়। ছয় দফা কর্মসূচি না হলে নিউক্লিয়াস হয়তো অগ্নিযুগের অনুশীলন বা যুগান্তর এর মত একটি সংগঠনের পরিণতি হত। তবে নিউক্লিয়াসের নেতারা কঠিন পরিস্থিতি জয় করে কাজ করেছেন। দুজন চাকরি করে সিরাজুল আলমকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন কাজ করার জন্য। সিরাজ ও রাজ্জাক জেলে যাওয়ার পর আরেফ কাজ চালিয়ে গিয়েছেন তার সাধ্য মত। ইতিপূর্বে রাজ্জাক ও আরেফ নিউক্লিয়াস নিয়ে যা বলেছেন সিরাজুল আলম সুধু তার পূনরাবৃত্তি করেছেন তাঁর বইতে। ছাত্রলীগ নিউক্লিয়াসের কর্মক্ষেত্রে পরিনত হয়। ১৯৬৮-৭১ যখন আমি ছাত্রলীগের সংগে নিবীড়ভাবে সম্পৃক্ত , আমি নিজে তাদের তৎপরতা প্রত্যক্ষ করেছি। ১৯৬৯ এর ১১দফা আন্দলনের সময় সব কর্মীদের নজরে পড়েছেন সিরাজুল আলম খান। এটা ছিল ওপেন সিক্রেট যে সিরাজুল আলম ছিলেন ’৬৯ আন্দোলনের নেপথ্য নেতা। শেখ মুজিবকে কারাগার থেকে নিঃশর্তে বের করে আনা এবং কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের মঞ্চে তাকে সংবর্ধনা দিয়ে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করে তাঁর নেতৃত্বকে এক পৃথক উচ্চতা দান করে সামগ্রিকভাবে আমাদের জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকে অনেক দুর অগ্রসর করে নিয়েছেন তিনি।
১৯৬৮-৬৯, ১৯৬৯-৭০, ১৯৭০-৭২ এর ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় সংসদ ছিল প্রায় পুরোপুরি নিউক্লিয়াস পন্থীদের নিয়ন্ত্রণে । ১৯৬৯ সালের ১১দফার আন্দোলনে ছাত্রলীগ সাধারন সম্পাদক খালেদ মোহম্মদ আলীকে দেখেছি তার বক্তৃতায় স্বাধীনতা ও সশস্ত্র সংগ্রামের বিষয় উস্কে দিতে। এসব বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করলে বা চেপে ধরলে বলতেন, সিরাজ ভাইয়ের সংগে কথা বল। সব কর্মীদের জন্যই অনুরূপ প্রক্রিয়া চালু ছিল। আগ্রহী ও আন্দোলনের মাধ্যমে অনুপ্রানিত কর্মীরা কাজী আরেফ ও মনিরুল ইসলামের সংগে আলোচনা করে নানাবিধ শৃঙ্খলায় সম্মতি সাপেক্ষে নিউক্লিয়াস পরিচালিত স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদের সদস্য হত। এই প্রক্রিয়ায় ঐ সময় ছাত্র লীগের হাজার-হাজার কর্মিরা সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছিল। আমি নিজে দেখেছি, ১৯৬৮-৭১ সাল পর্যন্ত খুব কাছে থেকেই ঐ সময়ের ছাত্র নেতৃত্বকে,- বিশেষ করে তোফায়েল আহমদ, আব্দুর রউফ, খালেদ মোহম্মদ আলী, আ স ম রব, নূরে আলম সিদ্দিকী, শাজাহান সিরাজকে এবং তারা কিভাবে সিরাজুল আলম খানের সান্নিধ্যে থাকার চেষ্টা করেছেন। প্রত্যক্ষ করেছি কিভাবে কাজী আরেফ ও মনিরুল ইসলাম (মার্শাল) ছাত্রলীগ পরিচালনা করেছেন স্বাধীনতার লক্ষে। আমি ১৯৭০-৭২ এ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় সংসদের সহসভাপতি থাকার সুবাদে যতটুকু জানতাম, তার চাইতে বেশী জানতাম নিউক্লিয়াস বা স্বাধীন বাংলা।
(ফেইসবুক থেকে সংগৃহিত)
লেখক: শরীফ নুরুল আম্বিয়া
সভাপতি:বাংলাদেশ জাসদ