নির্যাতন বন্ধে জাতিসংঘের আহ্বান বাস্তবায়নের দাবি হিউম্যান রাইটস ওয়াচের

নির্যাতন বন্ধে জাতিসংঘের কমিটি এগেইনস্ট টর্চারের সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। এ জন্য হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিষয়ক পরিচালক ব্রাড এডামস বলেছেন, ওই কমিটির সুপারিশ গ্রহণ করা উচিত বাংলাদেশ সরকারের। নির্যাতন বিরোধী বিদ্যমান আইন প্রয়োগ করা উচিত এবং নির্যাতন বন্ধ করতে সরকার সিরিয়াস এ বিষয়ে নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের কাছে পরিষ্কার বার্তা দিতে হবে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। এতে আরো বলা হয়, কনভেনশন এগেইনস্ট টর্চার অ্যান্ড আদার ক্রুয়েল, ইনহিউম্যান অর ডিগ্রেডিং ট্রিটমেন্ট অর পানিশমেন্টের অধীনে বাংলাদেশ বিষয়ে জাতিসংঘের কমিটি এগেইনস্ট টর্চার জেনেভায় পর্যালোচনা করবে ২৯ শে জুলাই থেকে ৮ই আগস্ট পর্যন্ত।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ লিখেছে, নিরাপত্তা হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নির্যাতন ও অন্যান্য দুর্ব্যবহারের মারাত্মক অভিযোগগুলোর জন্য বাংলাদেশের নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের কদাচিৎ জবাবদিহিতা করতে হয়। পক্ষান্তরে এসব তথ্য প্রকাশ করার জন্য মানবাধিকার বিষয়ক গ্রুপ, অধিকারকর্মী এমন কি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দমনপীড়ন চালায় কর্তৃপক্ষ। ২০ বছরেরও বেশি সময় আগে কনভেনশন এগেইনস্ট টর্চার অনুমোদন করার পর ওই কমিটির অধীনে প্রথমবারের মতো পর্যালোচনার অধীনে আসতে রাজি হয়েছে বাংলাদেশ।
এক্ষেত্রে তারা ওই চুক্তির অধীনে প্রতিশ্রুতি সমুন্নত রাখার বিষয়ে দীর্ঘদিন বাকি থাকা একটি রিপোর্ট জমা দিয়েছে। সরকার দাবি করেছে, নির্যাতন বিরোধী বেশ কিছু পদক্ষেপ এরই মধ্যে নিয়েছে কর্র্তৃপক্ষ।

ব্রাড এডামস বলেন, দেশের নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো যে ভয়াবহ আকারে নির্যাতন চালায় তা স্বীকার করে নেয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হলো ইউএন কমিটি এগেইনস্ট টর্চার-এ বাংলাদেশের উপস্থিতি। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আরো লিখেছে, বাংলাদেশের নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের ব্যাপক নির্যাতনের বিষয়টি তারা প্রামাণ্য আকারে ধারণ করেছে। তারা বলেছে, আটক ব্যক্তিদের লোহার রড, বেল্ট, লাঠি দিয়ে প্রহার করা হয়। বন্দিদের বৈদ্যুতিক শক দেয়া হয়। ওয়াটারবোর্ডিং বা ডুবিয়ে মেরে ফেলার আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়। সিলিং থেকে ঝুলিয়ে দেয়া হয়। এরপর প্রহার করা হয়। ইচ্ছাকৃতভাবে বন্দিদের গুলি করা হয়। বিশেষ করে পায়ের নিচে গুলি করা হয়। একে ইংরেজিতে ‘নীক্যাপিং’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। তবে কর্তৃপক্ষ নিয়মিত বলে থাকে, ক্রসফায়ারের সময় আত্মরক্ষার সময়ে এসব ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হয়েছে।

রিপোর্টে আরো বলা হয়েছে, ২০১৩ সালে সরকার পাস করেছে টর্চার অ্যান্ড কাস্টডিয়াল ডেথ (প্রিভেনশন) অ্যাক্ট। এতে এমন ইঙ্গিত দেয়া হয় সরকার নির্যাতন নির্মূলে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিন্তু এই নির্যাতন বিরোধী আইনের অধীনে খুবই কম সংখ্যক মামলা হয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলাও নিষ্পত্তি হয় নি। মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠনগুলোর তদন্তকারীরা বলছেন, কর্তৃপক্ষ এখনও নিয়মিতভাবে নিরাপত্তা হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের ওপর নির্যাতন চালায়। ওই আইন পাস হওয়ার পর নির্যাতন বিষয়ক ১৬০ টি ঘটনা প্রামাণ্য আকারে ধারণ করা হয়েছে। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরো অনেক বেশি বলে দাবি করছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।

সংগঠনটি তার রিপোর্টে আরো বলেছে, আইনটি প্রয়োগ করার পরিবর্তে এই আইনটিকে সংশোধন করতে সরকারের কাছে বার বার অনুরোধ করেছে বাংলাদেশ পুলিশ। তারা দাবি করেছে এই আইনকে কম নিষেধাজ্ঞামূলক করার জন্য। এর ফলে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে, বাংলাদেশের নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা নির্যাতন বন্ধের বিষয়ে সিরিয়াস কিনা তা নিয়ে। নির্যাতন বন্ধ বিষয়ক ওই আইনের ১২ নম্বর ধারা বাতিল করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে ২০১৫ সালে একটি প্রস্তাব জমা দেয় পুলিশ। এতে আরো প্রস্তাব করা হয়, র‌্যাব, সিআইডি, স্পেশাল ব্রাঞ্চ ও ডিটেক্টিভ ব্রাঞ্চ সহ আইন প্রয়োগকারী সুনির্দিষ্ট কিছু ইউনিটকে এই আইনে বিচারের আওতা থেকে বাইরে রাখতে হবে। বাংলাদেশী একটি পত্রিকার খবর অনুযায়ী, গত বছর বাংলাদেশ পুলিশ সপ্তাহ ২০১৮ তে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে ওই আইনটি সংশোধনের জন্য আবার আহ্বান জানায় পুলিশ। প্রধানমন্ত্রী তা বিবেচনা করবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ লিখেছে, পুলিশের এমন চাপ সত্ত্বেও সরকারের উচিত নির্যাতন নির্মূলে আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতির প্রতি অটল থাকা।

ব্রাড এডামস আরো বলেছেন, নির্যাতন বন্ধে জাতিসংঘের সঙ্গে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ করা উচিত বাংলাদেশের। পাশাপাশি বর্তমানে নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা যেসব নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছেন তা সরকারকে স্বীকার করতে হবে এবং এর দায় নিতে হবে।