যুগশঙ্খের প্রতিবেদন ‘নিখোঁজ ৩.৭০ কোটি হিন্দু বাংলাদেশি ভারতেই’

হিন্দু আমেরিকান ফাউন্ডেশন নামে একটি সংগঠনের আলোচনাচক্রে যোগ দেওয়া শেষে কয়েকটি দেশের নির্যাতিত সংখ্যালঘুদের যে প্রতিনিধি দল হোয়াইট হাউসে গিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেছেন, বাংলাদেশের প্রিয়া সাহাও তাতে ছিলেন। প্রথম সুযোগেই তিনি বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের দুরবস্থা নিয়ে ট্রাম্পকে জানান। ট্রাম্প জানতে চান, কারা এই নির্যাতন করে। প্রিয়া বলেন, এরা মুসলিম মৌলবাদী। কিন্তু সব সময়েই তারা রাজনৈতিক আশ্রয় পায়। এর পরে অন্য দেশের প্রতিনিধিরা একে একে তাদের সমস্যার কথা বলেন। কিন্তু ওই ভিডিওটি জনসমক্ষে আসতেই অভিযোগ ওঠে, সরকারকে বদনাম করতে তিনি ওই কাজটি করেছেন। এখন তা প্রতিবেশী ভারতের গণমাধ্যম, বিশেষ করে বাংলাভাষী দৈনিকে ভিন্ন মাত্রা পাচ্ছে। এতে একাধারে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা, দুর্গাপুর ও শিলিগুড়ি এবং আসামের গুয়াহাটি ও শিলচর থেকে প্রকাশিত দৈনিক যুগশঙ্খে গতকাল (২৩ জুলাই) একটি শীর্ষ প্রতিবেদনটি ছেপেছে- ‘নিখোঁজ ৩.৭০ কোটি হিন্দু বাংলাদেশি ভারতেই’। যেখানে বলা হয়েছে, আসামে এনআরসি থেকে বাদ পড়া ৪০ লাখ নাগরিক বাংলাদেশি ছিলেন।

শুধু আসামেই নয়, পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরাসহ গোটা ভারতে বাংলাদেশ থেকে নিখোঁজ ৩ কোটি ৭০ লাখ নাগরিকের অধিকাংশই রয়েছেন। অর্থাৎ আপাতদৃষ্টিতে প্রিয়া সাহা তার অভিযোগে ট্রাম্পকে যে পরিসংখ্যানটি দিয়েছেন, তার পুরোটাই ভারতে রয়েছেন।
রাজধানী ঢাকার আগের দিনের ডেটলাইন দেয়া যুগশঙ্খের ওই প্রতিবেদনে বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের মহাসচিব অ্যাডভোকেট গোবিন্দ্র চন্দ্র প্রামাণিককে উদ্ধৃত করে পত্রিকাটি লিখেছে যে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে হিন্দু নেত্রী প্রিয়া সাহার দেয়া নিখোঁজ সংখ্যাটি সঠিক। গোবিন্দ্র চন্দ্র প্রামাণিকের কথা, “আজ সারা বাংলাদেশে প্রিয়া সাহার বক্তব্য নিয়ে ঝড় উঠেছে। কিন্তু সরকারের ‘ক’ ও ‘খ’ তফশিলের তালিকা দেখলে আপনি বুঝতে পারবেন, প্রিয়া সাহার দেওয়া তথ্যে ভুল নেই।… আসামে প্রকাশিত নাগরিক তালিকায় বাদ পড়া প্রায় ৪০ লাখ নাগরিক তো বাংলাদেশ থেকে নিখোঁজ হওয়া মানুষই।” পাশাপাশি বলেন, “এখন আমরা স্বীকার করছি, এনআরসি থেকে বাদ ৪০ লাখ নাগরিক বাংলাদেশি ছিলেন। শুধু আসামেই নয়, পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরাসহ উত্তর-পূর্ব ভারতসহ পুরো ভারতেই বাংলাদেশ থেকে নিখোঁজ ৩ কোটি ৭০ লাখ নাগরিকদেও অধিকাংশই রয়েছেন।”

এমনকি তিনি আরও বলেছেন, “বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুসহ অনেক নেতা-মন্ত্রী, বর্তমান ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেব, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারসহ অনেক কবি, সাহিত্যিক, শিল্পীসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক ব্যক্তিই বাংলাদেশের ছিলেন। বিভিন্ন সময়ে তাঁরা সবাই ৩ কোটি ৭০ লাখ নিখোঁজদের মধ্যে পড়েন।” একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন রেখে বলেছেন, “তাতে প্রিয়া সাহার সত্য উচ্চারণে সবার গায়ে আগুন জ্বলছে কেন? অর্পিত সম্পত্তির তালিকায় উল্লিখিত ব্যক্তিদেও কেউ কি দেখাতে পারবেন? তাঁরা কি মিসিং নন? বাংলাদেশ সরকারের পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসেব কী বলছে?” উপরন্তু তার দেওয়া পরিসংখ্যানটি হচ্ছে, “১৯০১ সালে বাংলা ভূখন্ডে মুসলিম ছিল ১ কোটি ৯১ লাখ ১৩ হাজার। আর হিন্দু ছিল ৯৫ লাখ ৪৫ হাজার। অর্থাৎ মুসলমান জনসংখ্যার অর্ধেক হিন্দু। ২০০১ সালে মুসলমান জনসংখ্যা ১১ কোটি ১০ লাখ ৭৯ হাজার এবং হিন্দু জনসংখ্যা ১ কোটি ১৩ লাখ ৭৯ হাজার। সম্প্রীতির হিসেব অনুসারে হওয়া উচিত ছিল সাড়ে ৫ কোটি। সরকারি হিসেব মতে, ৪ কোটি হিন্দু নিখোঁজ।”

এতে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, অ্যাডভোকেট গোবিন্দ্র চন্দ্র প্রামাণিক ওই স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্য ও হিসেব কী শুধুই পরিসংখ্যানগত কারণে দিয়েছেন, নাকি তার সঙ্গে ‘বাংলাদেশি তাঁড়াও আন্দোলন’ এবং ট্রাম্পকে দেওয়া প্রিয়া সাহার ‘প্লিজ আমাদের সাহায্য করুন। আমরা আমাদের দেশে থাকতে চাই’ দাবির একটি যৌক্তিক যোগসূত্র রয়েছে। যদি তা থেকে থাকে, তবে বলতে দ্বিধা নেই, রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুর মতো তাদের স্বজাতি-গোষ্ঠির একটি বিপুল জনগোষ্ঠি যে অদূর ভবিষ্যতে ভারত থেকে বিতাড়নের শিকার হবেন না, তার কী গ্যারান্টি রয়েছে? সম্ভবত দৈনিক যুগশঙ্খ সেই জনমতকেই গড়ে তোলার প্রয়াসটি চালিয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের বিষয়টি ভেবে দেখা উচিত।