মানুষের মুক্তির লড়াই :সা কা ম আনিছুর রহমান খান

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামে ‘পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগে’র ভূমিকা ছিল দৃঢ় , আপোষহীন , গতিশীল ও রক্তক্ষয়ী। তাঁরাই এই সংগ্রামের লক্ষ্যে ‘নিউক্লিয়াস’ গঠন করেছে। ‘নিউক্লিয়াস’ বলতে আমরা বুঝি ‘ কেন্দ্রিক বা কোষমধ্যস্থ বিন্দু। যা একটি কোষের মধ্যেকার গোলাকার গঠন বিশিষ্ট কোষীয় কেন্দ্রবিন্দু।’ অর্থাৎ স্বাধীনতা সংক্রান্ত আন্দোলন সংগ্রাম কর্মকান্ড এই ‘নিউক্লিয়াস’ কে ঘিরেই পরিচালিত হয়েছে। এরাই পতাকার নকশা তৈরী করেছে , জাতীয় সঙ্গীত নির্বাচিত করেছে। যথাসময়ে তারা পতাকা উড়িয়ে দিয়েছে , ঘোষণা করেছে ইশতেহার। তার ফলেই ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে বাঙালী জনগণের স্বাধীনতার আকুতিকে পরিহার করা বা এড়ি জাসদ , কর্নেল আবু তাহের বীর উত্তম এবং মেহনতি য়ে যাবার কোন পথ কারো জন্যই খোলা ছিল না। যারা ভিন্ন পথ খুঁজে ছিল , তাদের পরিণতির কথা আজ আর কারো অবিদিত নহে। স্বাধীনতার উষালগ্নে নবসৃষ্ট বাংলাদেশের শাসন ব্যবস্থা কেমন হবে সে রূপরেখাও তারা দিয়েছিল। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সকল রাজনৈতিক দল , গোষ্ঠি ও শক্তির সমন্বয়ে ‘জাতীয় বিপ্লবী সরকার’ গঠনের আহ্বান জানানো হলো। ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় সংসদের এই প্রস্তাব তৎকালীন শাসক মহল প্রত্যাখ্যান করেছিল। যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ গঠনে সকলের ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা রাখার ঐকান্তিক উদ্যোগ সে দিন এভাবেই ভুলুন্ঠিত হয়েছিল।

১৯৭২ সালের মার্চ মাসে ছাত্রলীগ ঘোষণা করে ‘ আমরা লড়ছি শ্রেণী সংগ্রাম ত্বরান্বিত করে , সামাজিক বিপ্লবের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য।’ এই ঘোষণার সাথে যারা ভিন্নমত পোষণ করেন তারা ‘মুজিববাদ’ প্রতিষ্ঠার ডাক দেন। মেহনতি মানুষের মুক্তির লড়াইয়ের ঝান্ডা সমুন্নত রেখে এগিয়ে চললেন ‘ডাকসু’র সহ-সভাপতি জনাব আ স ম আব্দুর রব , ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় সংসদের সাধারণ সম্পাদক জনাব শাহজাহান সিরাজ। তাদের সাথে ছিলেন জননেতা আবদুল আউয়াল , ডাঃ আজাহার উদ্দিন , মির্জা সুলতান রাজা , নূরে আলম জিকু , বিধান কৃষ্ণ সেন , ক্যাপ্টেন কবির আহমেদ মধু , আব্দুল মোতালেব খান পাঠান , ক্যাপ্টেন আজিজুল হক বীর প্রতীক , অর্থনীতিবিদ ডঃ আখলাকুর রহমান , প্রখ্যাত শ্রমিক নেতা রুহুল আমিন ভূঁইয়া , মুহম্মদ শাহজাহান , কৃষক নেতা খন্দকার আবদুল মালেক শহীদুল্লাহ , ছাত্র নেতা শরীফ নুরুল আম্বিয়া , মনিরুল ইসলাম ( মার্শাল মনি ) , কাজী আরেফ আহমেদ , মমতাজ বেগম , শিরিন আখতার , মাহফুজুর রহমান খান , সর্দার আমিনুল ইসলাম বিশ্বাস ( চুনু সর্দার ) , লুৎফা হাসিন রোজী , মোশতাক হোসেন , মুহম্মদ ইকবাল , মখলেছুর রহমান মুকুল , খায়রুজ্জামান বাবু , সদরুল হক সুধা , আনিছুর রহমান কামাল , কবি আল-মাহমুদ , লেখক আহমেদ ছফা প্রমুখ। নেপথ্যে ছিলেন সিরাজুল আলম খান । নীতির প্রশ্নে আপোষ না করায় তাঁরা শাসক কূলের রোষানলে পড়ে যান। মেহনতি জনগণের মুক্তির লক্ষ্যেই সে দিন আদর্শ ভিত্তিক একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের প্রয়োজন হয়ে পড়ে ছিল। তাই ১৯৭২ সালের ৩১ শে অক্টোবর তারিখে এঁরাই গঠন করেন ‘ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ’ । এই নবগঠিত দলের যুগ্ম আহ্বায়ক হন মেজর এম এ জলিল ও আ স ম আবদুর রব।

স্বাধীনতা উত্তর কালে দেশের অবস্থা কেমন ছিল ? আজকের প্রজন্ম সে চিত্র দেখে নাই। চাল , কাপড় সহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম কি অবস্থায় পৌছে ছিল,তা বর্ণনার অতীত। ঐ সময়ের মানুষের আর্থিক অবস্থার উপরে গবেষণাকারীদের মধ্যে অন্যতম অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন। তিনি গবেষণা করে সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে ঐ সময়ে বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠির ক্রয় ক্ষমতা লুপ্ত হয়েছিল , যার ফলশ্রুতি দুর্ভিক্ষ। তাঁর এই গবেষণাপত্রই তাঁকে ‘নোবেল’ পুরষ্কারের সম্মান এনে দেয়। ‘দৈনিক বাংলা’র সম্পাদক হাসান হাফিজুর রহমানকে পদচ্যুত করে মস্কো পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কবি আল-মাহমুদ সম্পাদিত ‘দৈনিক গণকণ্ঠ’ ; সৈয়দ ইরফানুল বারী সম্পাদিত ‘সাপ্তাহিক হক কথা’ র কথা যদি বাদও দেই তবু ঐ আমলের ‘দৈনিক আজাদ’ ‘দৈনিক ইত্তেফাক’ ‘দৈনিক বাংলা’ সাপ্তাহিক ‘অভিমত’ , সাপ্তাহিক ‘বাংলার মুখ’ সহ অন্যান্য খবরের কাগজ পাঠ করলেই সে সময়ের অবস্থার কথা জানা যাবে। আবদুল গাফফার চৌধুরী তাঁর সম্পাদিত ‘দৈনিক জনপদ’ এ তিনি নিজে ‘এখন সাহস করে হলেও সত্য বলা প্রয়োজন’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন , যা দেশ বিদেশের পাঠকগণ অত্যন্ত আগ্রহ ও গুরুত্ব সহকারে পড়েছিল। চারটি পত্রিকা রেখে অন্য সকল পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ , বেকার সাংবাদিকদের রাজধানীর রাজপথে ফল বিক্রয় করে জীবন ধারনের দৃশ্য যাদের বয়স পঞ্চান্ন পেরিয়েছে তারা নিশ্চয়ই ভুলে যাননি। আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এমনই ছিল যে পবিত্র ঈদের জামাতেও নিজ দলীয় জাতীয় সংসদ সদস্যের নিরাপত্তাও ছিল না। কিন্তু ‘রক্ষী বাহিনী’র ছিল দোর্দন্ড দাপট। এ সময়ে ‘জাসদে’র সাধারণ সম্পাদক জনাব আ স ম আবদুর রব দাবী করেছিলেন যে ৬৭ হাজার মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করা হয়েছে। তাঁর এ অভিযোগ ছিল ‘রক্ষী বাহিনী’র বিরুদ্ধে। ঐ সময়ে বাংলার সর্বত্র আওয়াজ উঠেছিল ‘ ছেলে হারা মায়ের ডাক , লাল ঘোড়াকে বেঁধে রাখ ’। সে আমলে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ এবং কম্বল বিতরণ নিয়ে অনেক কথা আছে। ‘ চোরের খনি ’ ‘চাটার দল ’ শব্দগুলো তো ‘বঙ্গবন্ধু’ নিজেই ব্যবহার করেছেন। জাতীয় ঐতিহাসিক মোহাফেজখানায় রক্ষিত ‘বঙ্গবন্ধু’র ভাষণগুলোই তার জ্বলন্ত সাক্ষী। এই ত্রাণ সামগ্রী ও কম্বল বিতরণের বিষয় নিয়ে কাসিদাও রচিত হয়েছিল। মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী তো আওয়াজই তুলেছিলেন ‘ এবার গলায় গামছা দেবো , রিলিফ চুরির হিসাব নেবো। ’ সাবেক ছাত্রনেতা এবং পরবতীকালে প্রখ্যাত শ্রমিক নেতা আবদুল আউয়াল যদি জাসদ রাজনীতির সাথে যুক্ত না হতেন তাহলে আদমজীর প্রশাসকের পদ থেকে তাকে অপসারণ করা হতো না , দুর্নীতির অপবাদও তার কপালে এটে দেওয়া হতে না। ১৯৭৩ সালের বসন্তকালে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদের নির্বাচনে তিনি জাসদের প্রার্থী হিসেবে ‘মশাল’ প্রতীক নিয়ে ঢাকার সেনানিবাস এলাকা থেকে প্রতিদ্বন্ধিতা করেছিলেন । ঐ নির্বাচনে তাঁর কাছে পরাজিত প্রার্থীর নাম এখন নাই বা বললাম। যদিও ঐ ফলাফল পাল্টে দেওয়া হয়েছিল। মৃত্যুর পরও আবদুল আওয়াল সাহেবকে মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হবে এতে আর বিস্ময়ের কি আছে।

বি বি সি-এর সাংবাদিক জনাব সিরাজুর রহমান কর্তৃক লিখিত ‘ ইতিহাস কথা কয় ও নির্বাচিত রাজনৈতিক প্রবন্ধ ’ থেকে এ প্রসঙ্গে উদ্ধৃতি দেওয়া যেতে পারে। “ জানুয়ারীর (১৯৭২) শেষে খবর এলো ঢাকায় প্রধানমন্ত্রীর এরিনমোর তামাক পাওয়া যাচ্ছেনা , আমি কিছু নিয়ে যাবো কি ? মুজিব ভাইয়ের জন্য শুধু তামাক নিয়ে যেতে মন উঠছিলো না , পিকাডলির ডানহিলের দোকান থেকে একটা পাইপও নিয়ে গিয়েছিলাম , সে পাইপটা মুজিব ভাইয়ের খুব প্রিয় ছিল। সে কথা তিনি একাধিকবার বলেছিলেন আমাকে। যদ্দুর মনে পড়ে , তাঁর মর্মান্তিক হত্যার পরে সিঁড়িতে পড়ে থাকা যে পাইপের ছবি দেখেছিলাম সেটাই ওই পাইপ। … জোড়াতালি দিয়ে কোনো রকমে একটা প্রশাসন দাঁড় করানো হয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ লোকের মতে কতগুলো বেঠিক লোককে ভুল স্থানে বসানো হয়েছে মাত্র। … ১৯ তারিখেই ( ফেব্রুয়ারী ,১৯৭২ ) সন্ধ্যার কিছুক্ষণ পরে নোয়াখালী থেকে ঢাকা ফেরার পথে কুমিল্লার কাছে চারজন রাইফেলধারী কিশোর আমার ভাড়া করা গাড়ী ছিনতাই করার চেষ্টা করে। আমার ড্রাইভার যখন বলে যে আমি বি বি সির সিরাজুর রহমান তখন তারা ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং আমার অটোগ্রাফ নিয়ে সরে পড়ে। … ভারতের পশ্চিম বাংলা থেকে ইতোমধ্যেই বেশ কয়েকটি সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে এসেছে । একুশে ফেব্রুয়ারী উপলক্ষ্যে যে সাংস্কৃতিক দলটি এসেছে তাতে আছেন মনোজ বসু ও প্রবোধ সান্যাল প্রমুখ প্রায় এক ডজন সাহিত্যিক , সূচীত্রা মিত্র ও শ্যামল মিত্র প্রমুখ সঙ্গীত শিল্পীরা এবং কয়েক জন সাংবাদিক। প্রধানমন্ত্রী তাদের সাক্ষাৎ দিয়েছেন, বুদ্ধিজীবিরা তাদের আন্তরিক অভ্যর্থনা করেছেন , বেতার-টেলিভিশনে তাদের সাক্ষাৎকার প্রচারিত হয়েছে এবং তাঁরা সভা সিম্পোজিয়ামে ভাষণ দিয়েছেন , সঙ্গীতানুষ্ঠান করেছেন। এর বিপরীতে বাংলাদেশের নিজের শিল্পীদের দূরবস্থার কথা বলতেই হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁদের অধিকাংশই বিদেশে চলে যেতে পারেন নি। তাঁদের এখন ‘কোলাবোরেটর’ বলে সন্দেহ করা হচ্ছে ; বলা হচ্ছে যে তাদের সম্বন্ধে তদন্ত হবে , কিন্তু সে তদন্ত যে কবে হবে সে সম্বন্ধে কারো কোন ধারণা নেই। ইতোমধ্যে এসব শিল্পিীদের ( তাঁদের মধ্যে বিশিষ্ট শিল্পীরাও আছেন ) বেতার টেলিভিশনের অনুষ্ঠানে স্থান দেওয়া হচ্ছে না , তাঁদের পরিস্থিতি সত্যি করুণ। তাঁদের কেউ কেউ তো আমাকে বলেছেন যে একটা কৃত্রিম শূণ্যতা সৃষ্টি করে বাংলাদেশে ভারতের সাংস্কৃতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার একটা ষড়যন্ত্র হয়েছে। ব্যবসায়ী সমাজেও গুঞ্জন শুরু হয়েছে। বহু উদ্ভট কথাবার্তা আমাকে বলা হয়েছে । যেমন , পাটকলগুলোর শ্রম অশান্তি এবং বাংলাদেশ বিমানের প্রথম বিমানটি বিধ্বস্থ হয়ে কয়েকজন পাইলট মারা যাবার পেছনেও নাকি ভারতের অদৃশ্য হাত ছিল। … মুক্তিযুদ্ধে ছাত্র সমাজ , বিশেষ করে আওয়ামী লীগের ছাত্র শাখা বাংলাদেশ ছাত্রলীগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। ছাত্রলীগের সভাপতি মিঃ নূরে আলম সিদ্দিকী তো প্রাকারান্তরে আমাকে বলেই ফেলেছিলেন যে স্বাধীনতার প্রথম ঘোষণা প্রথমে দিয়েছিলেন তিনি , শেখ মুজিব নয়। সিদ্দিকী চারজন ছাত্র নেতার একটি প্রভাবশালী জোটের নেতা ; সাধারণতঃ তাঁরা ‘চার খলিফা’ বলে পরিচিত। আনুষ্ঠানিক কোন পদমর্যাদা না থাকলেও যবনিকার অন্তরালে এরাঁ খুবই শক্তিধর। তিনি মনে করেন যে রাজনীতিতে ছাত্রদের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা থাকা উচিত , কেননা একমাত্র তারাই নেতাদের পথভ্রষ্ট হওয়া ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা থেকে বিরত রাখতে সক্ষম। ” ( পৃষ্ঠা ১৯ থেকে ২৯ )। এ থেকেই ঐ সময়ের পরিস্থিতি সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যেতে পারে। তাই কর্নেল তাহেরের উৎকণ্ঠা কোন অবস্থাতেই অমূলক ছিল না। ঐ সময়ে জাসদের নেতা কর্মীদের রক্তক্ষয়ী আন্দোলন সংগ্রামই দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করেছে। এ আত্মদান রাজহাঁসের পালকের ন্যায় হালকা নয় , তা হিমালয় পাহাড়ের চেয়েও ভারী ।

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্ট শুক্রবারে ‘ জাসদে’র কোন নেতা কর্মী বঙ্গভবন বা বেতার ভবনে মন্ত্রীত্ব গ্রহণের জন্য যাননি। তারা সেদিন ছিলেন কারারুদ্ধ অথবা গোপন আস্তানায়। লন্ডন , বুয়েনস এয়ার্স বা মস্কোতে তাঁরা কেউ মোশতাক সরকারের দুতিয়ালী করার জন্যও যান নাই। জেনারেল আতাউল গনি ওসমানী জরুরী তলব পেয়ে বিমান যোগে ঢাকা এসেছিলেন এবং ঐ সরকারের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ১৯৭৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তাঁকে ‘গণতান্ত্রিক ঐক্য জোট’ এর প্রার্থী করা হয়েছিল। এই জোটে জাসদ ছিল না। একমাত্র কর্নেল তাহের এবং জাসদ ই মোশতাক সরকারের বৈধতা তাৎক্ষণিকভাবে চ্যালেঞ্জ করেছিল। সারা দেশে লিফলেট পোস্টার প্রচার পুস্তিকা ছড়িয়ে দিয়ে ; ‘বুলেটিন’ ‘লড়াই’ নামীয় সাময়িকী বিতরণের মাধ্যমে ঐ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রাম পরিচালনা করেছিল , গড়ে তুলেছিল জনমত। সেই কারণেই মোশতাকের বাহিনী জাসদের নেতা কর্মীদের কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া তো দূরের কথা নতুন নতুন আটকাদেশ দিয়ে তাদের বন্দী করেছিল , তাদের উপর বর্ষণ করেছিল গুলি। এতে আহত হয়ে শাহজাহান মাষ্টার , আবু বকর সিদ্দিক সহ জাসদের অগনিত নেতা কর্মী পঙ্গুত্ববরণ করে।

৭ই নভেম্বরের পরও জাসদ শত প্রতিকূলতার মাঝেও জান বাজি রেখে সর্বশক্তি দিয়ে আন্দোলন সংগ্রাম অব্যাহত রাখে। ১৯৭৬ সালের ৩০ শে মার্চ তারিখে তারা রাজধানী ঢাকায় লং মার্চ করে । ৩১শে জুলাই তারিখে সারা দেশে পালন করে হরতাল। জাতীয় দিবস তথা শহীদ দিবস ( ৮ই ফালগুন ) , স্বাধীনতা দিবস ( ২৬ শে মার্চ ) , শ্রমিক দিবস (১লা মে), শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস (১৪ ই ডিসেম্বর) , বিজয় দিবস (১৬ই ডিসেম্বর )সহ দলীয় কর্মসূচী মোতাবেক ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী ( ৪ঠা জানুয়ারী ) , গণ-অভুত্থান দিবস ( ২৪ শে জানুয়ারী ) , শিক্ষা দিবস ( ১৮ই ফেব্রুয়ারী ) , পতাকা উত্তোলন দিবস ( ২রা মার্চ ) , ইশতেহার পাঠ দিবস ( ৩রা মার্চ ) , ফ্যাসীবাদ বিরোধী গণতন্ত্র দিবস ( ১৭ই মার্চ ) , তাহের দিবস ( ২১শে জুলাই ) , জাসদের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী ( ৩১ শে অক্টোবর ) , সিপাহী গণ-অভ্যুত্থান দিবস ( ৭ই নভেম্বর ) যথাযথ মর্যাদায় মৃত্যুঝুকি মাথায় নিয়ে দুর্দান্ত সাহসিকতার সাথে তাঁরা পালন করেছে। একুশের প্রথম প্রহরে ঢাকা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারসহ সারাদেশের শহীদ মিনারে টাঙিয়ে দিয়েছে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী বীর কর্নেল আবু তাহেরের ছবি। সে যুগের স্মৃতি যারা ভ্রষ্ট হয়েছেন তারা ঐ সময়ের পত্রপত্রিকা দেখলেই স্মরণ করতে পারবেন মৃত্যুঞ্জয়ী জাসদ কর্মীদের সেদিনের সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন সংগ্রামের কথা। নতুন প্রজন্মও এভাবে জানতে পারবেন সঠিক ইতিহাস। এ ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে জাসদের কর্মকান্ড ছিল অব্যাহত। সামরিক শাসকেরা প্রতিনিয়ত আতঙ্কে ছিল জাসদের আন্দোলন সংগ্রাম নিয়ে। গ্রেফতার করার জন্য তারা খুঁজে ফিরতো জাসদের নেতা কর্মীদের। পরিবর্তন সম্পর্কে জাসদ বলেছিল ‘জিয়া মুজিব সহোদর ভাই , শ্রেণীগত তফাৎ নাই।’ আন্দোলন ও সংগ্রাম প্রসঙ্গে সিরাজুল আলম খানের মতামত সম্বলিত চিঠির আলোকে জাসদ নিজেদের মধ্যে বিস্তারিত আলাপ আলোচনা ও মত বিনিময়ের মাধ্যমে ‘ গণতান্ত্রিক জাতীয় সরকার ’ গঠনের ডাক দেয় । গড়ে ওঠে দশ দলীয় ঐক্য । জাসদ সভাপতি মেজর এম এ জলিলের সভাপতিত্বে বায়তুল মোকাররমে অনুষ্ঠিত জনসভায় হট্টগোল সৃষ্টি করা হয়েছিল। এভাবেই দশ দলীয় ঐক্য জোটের কার্যক্রম অঙ্কুরেই শ্লথ হয়ে যায়। তৎকালীন শাসক গোষ্ঠি নয় , হট্টগোল করেছিল ক্ষমতা হারানো গণতন্ত্রের প্রেমিক (?) বলে দাবীদার গোষ্ঠি। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রে উদ্দীপ্ত ছাত্রলীগের সভাপতি , সে যুগের অবিসংবাদিত ছাত্রনেতা , ডাকসুর সহ-সভাপতি জনাব মাহমুদুর রহমান মান্না তাঁর সহযোদ্ধা অনুসারীদের নিয়ে গগণ বিদারী আওয়াজ তুলেছেন ‘ রুখ বাকশাল হটাও জিয়া , টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া ’।

জাসদ সমাজ পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়ে উৎপাদনের উৎসগুলির উপর পুঁজিপতিদের একক আধিপত্যের বদলে সেখানে শ্রমজীবীদেরও যৌক্তিক অংশীদারিত্ব কায়েম করতে চেয়েছে। সকল শ্রেণী ও পেশার প্রতিনিধিদের নিয়ে পার্লামেন্ট গঠন করতে চেয়েছে। স্বশাসিত কার্যকরী স্থানীয় সরকার কায়েম করতে চেয়েছে। তারা চেয়েছে প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ। তা করা হলে প্রতিটি মানুষ তার শ্রমের মূল্য পেতো , দারিদ্র অনাহার আর অশিক্ষার অভিশাপ থেকে পেতো মুক্তি। আজকে এককেন্দ্রীক শাসন ব্যবস্থা ও রাজধানী কেন্দ্রিক সভ্যতা আমাদের দিয়েছে উজার গ্রাম , নিঃস্ব গ্রামবাসী , বেকারত্ব ও যানজটে ভরা ঢাকা শহর , ভাসমান পতিতায় ভরা রাত্রির ফুটপাত , পুঁতিগন্ধময় বর্জপীড়িত বুড়িগঙ্গা নদী। এর সুবিধাভোগী শ্রেণী কখনোই চাইবে না জাসদের রাজনীতি প্রসার লাভ করুক। কারণ তা হলে তাদের এই বিলাস বিভব উচ্ছৃঙ্খল আনন্দ উল্লাস আর সীমাহীন প্রাচুর্য থাকবে না। তারা কখনোই জাসদের শাহাদাত বরনকারী নেতা কর্মীদের শ্রদ্ধার চোখে দেখে না। জাসদের আদর্শবাদী ত্যাগী নেতা কর্মীদের মনে করে উপস্থিত আপদ। কৌশলগত কারণেই তারা এই শহীদদের স্মরণ করে অশ্রু বর্ষণ করে। ত্যাগী নেতা কর্মীদের আদর আপ্যায়ন করে। সুযোগমতো নেতাদের দোষারোপ করে। সব কিছুর মূল উদ্দেশ্য জাসদের কর্মীদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে তাদেরকে আদর্শের সংগ্রাম থেকে বিচ্যূত করা , সেই সাথে পরস্পরের বিরুদ্ধে আত্মকলহে লিপ্ত করে দেওয়া। যারা আত্মদান করেছেন তারা বুঝে শুনেই সংগ্রামে ব্রতী হয়েছিলেন , এতে তাঁদের জীবন বিপন্ন হবে তা তাঁরা ভালো করেই জানতেন। যারা মায়া দেখাচ্ছেন , অশ্রুপাত করছেন তাঁরা যদি কর্নেল তাহেরসহ জাসদের শাহাদাত বরণকারী নেতা কর্মীদের প্রতি এতই দরদী হন , তাহলে তারা ঐ আদর্শের কেন বাস্তবায়ন করছেন না? নবম সেক্টর কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর এম এ জলিলকে মরোনোত্তর ‘বীর উত্তম’ খেতাবে কেন ভূুষিত করছেন না? কেনইবা তারা ‘ সিপাহী গণÑঅভ্যুত্থান দিবসে’র ছুটি বাতিল করেছেন (১৯৯৬ সালে) , আ স ম আবদুর রবের বিরোধীতা সত্ত্বেও ? মেজর এম এ জলিল একজন সেক্টর হিসাবে শুধু মুক্তিযুদ্ধই করেই নাই , দেশের শিল্প কারখানার ভারী যন্ত্রপাতি এবং হানাদার বাহিনীর ফেলে যাওয়া সামরিক সাজ সরঞ্জাম বিদেশী লুন্ঠনের কবল থেকে রক্ষার জন্য পরম সাহসিকতার সাথে কার্যকরী প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন । সে কারণেই স্বাধীন দেশের প্রথম রাজবন্দি হয়েছিলেন তিনি , একই কারণে তিনি ‘ বীর উত্তম ’ খেতাব থেকেই বঞ্চিত হয়েছিলেন । সে বঞ্চনার তো আজও শেষ হয় নাই । স্মরণ করা যেতে পারে আ স ম আব্দুর রবের একক ভূমিকাই ১৯৯৬ সালে পাল্টে দিতে পারতো ক্ষমতার পালা বদলের ধারা। এটা অবধারিত সত্য , বর্ষার ঘনঘোর অন্ধকার রাত্রে বজ্রের ঝিলিক যেমন সারা পৃথিবীকে ক্ষণিকের জন্য হলেও চোখ ঝলসানো উজ্জ্বল আলো দেয় , ৭ই নভেম্বর তেমনি বাংলার মুক্তিকামী মেহনতি মানুষকে মুক্তির আলো দেখিয়েছিল। কর্নেল তাহের ব্যক্তিগত পদোন্নতি পাবার আশায় লড়াই করেননি বা সৈনিকদেরকে সেই ব্যক্তিগত লক্ষ্য অর্জনের জন্য লড়াইয়ে নামতে হুকুম দেন নাই। তাঁর লড়াই ছিল দেশের শোষিত নিপীড়িত মানুষের জন্য , দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য । অন্যদের থেকে এখানেই তাঁর পার্থক্য। সে পথই তিনি বাঙালী জাতিকে দেখিয়ে গেছেন। তা করতে গিয়েই তিনি দিয়েছেন জীবন। আমরা সে পথে চলতে পারিনি বলেই আজ আমাদের জাতীয় জীবনে এতো সংকট।
লেখকঃ সাবেক জেলা ও দায়রা জজ, বর্তমানে এ্যাডভোকেট বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ, ঢাকা।