দেশে থাকার জন্যই নালিশ করেছি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের কাছে প্রিয়া সাহার অভিযোগ নিয়ে তোলপাড় চলছে। আলোচনা-সমালোচনা সর্বত্র। এর মধ্যেই নিজের দেয়া বক্তব্যের ব্যাখ্যা নিয়ে হাজির হয়েছেন হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ নেত্রী প্রিয়া সাহা। তিনি বলেছেন, তার বক্তব্যের পর হুমকি আসছে, হয়রানির মুখে পড়েছে পরিবার। তারপরও তিনি দেশে ফিরে আসবেন। দেশে থাকার জন্যই তিনি ট্রাম্পের কাছে অভিযোগ করেছেন। প্রিয়া সাহা দাবি করেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরোধী দলের নেতা থাকার সময় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তিনি এই নির্যাতনের বিরুদ্ধে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গেছেন।
প্রধানমন্ত্রীর এই কর্মকাণ্ড দেখেই প্রিয়া সাহা অনুপ্রাণিত হয়েছেন। প্রিয়া দাবি করছেন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ই-মেইল পেয়ে তিনি সেখানে যান। ঐক্য পরিষদের পক্ষ থেকে যান নি। ট্রাম্পের কাছে প্রিয়া সাহার অভিযোগের বিষয়ে বিতর্ক চলছে চারদিকে। তার বক্তব্য রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধ বলে শনিবার ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। কিন্তু গতকাল তিনি জানিয়েছেন প্রিয়াকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয়ার বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তড়িঘড়ি করে কোনো ব্যবস্থা না নিতেও বলেছেন তিনি। গতকাল প্রিয়ার বিরুদ্ধে ঢাকার আদালতে রাষ্ট্রদ্রোহিতার দুটি মামলার আবেদন করা হলেও তা খারিজ করে দেয়া হয়েছে। এদিকে, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় এক ফেসবুক বার্তায় প্রিয়ার ওই বক্তব্যের পেছনে মার্কিন দূতাবাসের দুরভিসন্ধি থাকার বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। প্রিয়ার বক্তব্য ভয়ঙ্কর মিথ্যা বলেও দাবি করেন জয়।

এদিকে, সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে প্রিয়া ট্রাম্পের কাছে যে অভিযোগ করেছেন অনেকটা তার পক্ষেই ব্যাখ্যা দিয়েছেন গতকাল এ ভিডিও বার্তায়। অনেকটা প্রশ্নোত্তরধর্মী এ বার্তায় একজন প্রশ্নকারীর প্রশ্নের জবাবে পুরো বিষয় ব্যাখ্যা করেন।

প্রশ্নকারী প্রিয়াকে প্রশ্ন করেন আপনি কেমন আছেন, জবাবে তিনি বলেন, আমি ভালো নাই। আপনারা দেশে আছেন, প্রতিটা বিষয় আপনারা অবজারভ করছেন যে, প্রতিটা বিষয় কি অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সামাজিক মাধ্যম বা সংবাদ মাধ্যম বা বিভিন্ন ব্যক্তি, সকল পর্যায় থেকে সে ব্যাপারে আপনারা ওয়াকিবহাল। আমার পরিবার ভীষণ সমস্যার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। কারণ বাসার সামনে কালকে তালা ভাঙতে চেষ্টা করা হয়েছে, আমার বাসার সামনে মিছিল করা হয়েছে। সবচাইতে বড় ব্যাপার হলো যে আমার পরিবারের ছবি ছেপে দেয়া হয়েছে পত্রিকায়। কথা বলেছি আমি, তারা আমার ছবি দিতে পারতো। কিন্তু আমার পরিবারের ছবি পত্রিকায় দিয়ে তাদের সবার জীবনকে বিপন্ন করে ফেলা হয়েছে। প্রিয়া বলেন, বাসার সামনে ব্যাপক পরিমাণে লোকজন ছিল বিভিন্নভাবে। দারোয়ান তালা দিয়ে রেখেছিল কিন্তু তালা ভাঙার চেষ্টা করা হয়েছে, হুমকি দিয়ে গেছে কালকে বাসা সিলগালা করে দিবে। এসব অনেক অনেকভাবে কথাবার্তা বলছে সেটা আপনারা জানেন, আপনারা দেশে আছেন, আপনারা একটু চাইলেই খোঁজ করতে পারেন।

প্রশ্নকারী জানতে চান আপনি যুক্তরাষ্ট্রে গেলেন কিভাবে? কারা আপনাকে পাঠিয়েছে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ? জবাবে প্রিয়া বলেন, না। হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ আমাকে পাঠায় নি। এবং আমাকে আইআরএফ থেকে সরাসরি ই-মেইল করা হয়েছে, তাদের পক্ষ থেকে ফোন করা হয়েছে, তাদের পক্ষ থেকে আমাকে ইনভাইট করে…এই স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে আমাকে ইনভাইট করে তারা নিয়ে আসছে এখানে। তাদের ইনভাইটেশনে আমি এখানে আসছি। তিনি বলেন, রানা দা জানে না। কাজল দা, রানা দা ঐক্য পরিষদের কেউ ব্যাপারটা জানে না যে আমি এখানে এসেছি। এবং আমি যে আসবো সেটাও আমি যেদিন আসছি তার আগের দিনও জানতাম না যে আমি আসবো। মানে আসলেই বলতে পারেন ব্যাপারটা আমি হঠাৎ করেই আসছি। আমি ই-মেইল পেয়েছি, আমাকে ইনভাইটেশন দিয়েছে, সেই ইনভাইটেশনের মাধ্যমে আমি আসছি।

আপনি এই ই-মেইলটা কবে পেয়েছেন? এমন প্রশ্নে প্রিয়া বলেন, ই-মেইল পেয়েছিলাম ১৪ তারিখে গত মাসের। কিন্তু আমি আসলে ওভাবে রেসপন্স করিনি। তারপর বারবার তারা মেইল করেছে এবং আমি এসেছি যেদিন সেদিন আমি আসলে সন্ধ্যার পরে এসেছি। এটা কি আপনার প্রথম যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া নাকি আগেও গিয়েছিলেন? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, না আমি বহুবার যুক্তরাষ্ট্রে এসেছি। আমি যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের স্কলারশিপে আমি আইভিএলপি প্রশিক্ষণে এসেছিলাম ২০১৪ সালে।

আপনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কাছে এই কথাগুলো কেন বললেন? যেটা নিয়ে শোরগোল পড়ছে? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আসলে এ কথাগুলো তো আমি কেন বলি প্রথমে তো এই কথাগুলো তো মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কথা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০১ সালে যখন সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের ওপরে নির্বাচনোত্তর চরম নির্যাতন চলছিল ৯৪ দিন ধরে তখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী…সারা পৃথিবীতে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের রক্ষার জন্য ঘুরেছেন। আমি তার কথায় অনুপ্রাণিত হয়ে তার অনুসরণে বলেছি। যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে যেকোনো জায়গায় বলা যায় আমি তার কাছ থেকে শিখেছি। আপনি এও জানেন তখনকার সাম্প্রদায়িক সরকার ২০০১ সালে আমাদের ওপর যে চরম নির্যাতন চালিয়েছিল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপরে, বিরোধী দলের ওপরে, আওয়ামী লীগের ওপরে- তার বিরুদ্ধে এই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে কীভাবে কষ্ট করেছেন সেটা আপনারা সবাই অবগত আছেন।

আপনি ডনাল্ড ট্রাম্পের কাছে বলেছেন বাংলাদেশ থেকে বিপুল সংখ্যক হিন্দু খ্রিস্টান নিশ্চুপ/ মিসিং/ নিখোঁজ হয়ে গেছে। আপনি সংখ্যা একটা উল্লেখ করেছেন। ৩৭ মিলিয়ন। এটা কি আসলে সত্যি? এমন প্রশ্নে প্রিয়া বলেন, আসলে বিষয়গুলো আপনারা নিজেরাও জানেন। বাংলাদেশের যে পরিসংখ্যান বই রয়েছে, ২০০১ সালের পরিসংখ্যান বইয়ে যে ধর্মীয় সংখ্যালঘু যে চ্যাপ্টার রয়েছে সেখানে বিষয়গুলো লেখা রয়েছে। প্রতিবছর সরকার যে রিপোর্ট বের করে, সেই রিপোর্ট অনুসারে দেশভাগের সময় দেশের জনসংখ্যা ছিল ২৯.৭ ভাগ। এখনকার সংখ্যালঘুর সংখ্যা হচ্ছে ৯.৭ ভাগ। এখন দেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৮০ মিলিয়নের মতো। সে ক্ষেত্রে যদি জনসংখ্যা একইভাবে বৃদ্ধি পেতো তাহলে অবশ্যই যে জনসংখ্যা আছে এবং যে জনসংখ্যার কথা বলেছি সেটা ক্রমাগতভাবে হারিয়ে গেছে। সে তথ্যটা মিলে যায়।
পরিসংখ্যান মিলছে না বলে আপনি এ কথা বলছেন? এমন প্রশ্নে প্রিয়া বলেন, না অন্য তথ্য তো অবশ্যই আছে। আপনারা তো এও জানেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল বারাকাত উনি কিন্তু এই পরিসংখ্যান বইয়ের উপর ভিত্তি করেই গবেষণা করেছেন। এবং সেই গবেষণায় উনি দেখিয়েছেন প্রতিদিন বাংলাদেশ থেকে ৬৩২ জন লোক হারিয়ে যাচ্ছে। এবং কি পরিমাণে ক্রমাগত লোক হ্রাস পেয়েছে। এবং পরিসংখ্যান বইয়ে ২০১১ সালে আমি স্যারের সঙ্গে কাজ করেছিলাম। যার কারণে বিষয়টা সম্পর্কে আমি অবহিত। নির্যাতনের শিকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এই মানুষগুলো কোথায় গেছে?

এমন প্রশ্নে প্রিয়া বলেন, এটাতো সাধারণ কথা এবং সত্য কথা। এই মানুষগুলো কোথায় গেছে, কীভাবে গেছে? একজন সাংবাদিক এবং দেশের মানুষ এই বিষয়ে দারুণভাবে সচেতন। এই মানুষগুলো কোথায় গেল। কীভাবে কি হলো।
তিনি বলেন, আমি কখনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে যাইনি। আমি যদি আমার গ্রামের কথা বলি, আমার গ্রামের বাড়ি পিরোজপুর সেটা সবাই জানেন। সেখানে ২০০৪ সাল থেকে ৪০টা পরিবার ছিল। এখন তেরোটা পরিবার আছে। এই মানুষগুলো কোথায় গেছে? সেটাতো আপনাদের দেখার কথা। রাষ্ট্রের দেখার কথা। সেটা যদি আমার কাছে জানতে চান তাহলে কেমন লাগে ব্যাপারটা। আপনি যদি আমার বাড়িতে যান। ওইখানকার পরিসংখ্যান তৈরি করেন। কোন কোন বাড়িতে কে কে ছিল। তাদের নাম ঠিকানা নিয়ে আসতে পারবেন। তাহলেই বুঝবেন।

প্রিয়ার কাছে প্রশ্নকারী জানতে চান, আমরাতো কখনো কোনো পত্রিকায় দেখিনি যে, বাংলাদেশ থেকে মানুষ হারিয়ে যাচ্ছে? জবাবে তিনি বলেন, আপনারাই সংবাদে প্রচার করেন। কখন কোথায় কাকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। গত মাসেও সাতক্ষীরার বিভিন্ন এলাকা থেকে অনেক মানুষ চলে গেছে যা বিভিন্ন পত্রিকায় আসছে। ২০১৪ সালে আবুল বারাকাত সাহেব এই গবেষণা করেন। তখন সিরডাপ মিলনায়তনে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ ও সাংবাদিকদের সামনে এই রিপোর্টটি তিনি প্রকাশ করেন। তখন সকল গণমাধ্যম দায়িত্বশীলতার সঙ্গে এই রিপোর্ট প্রকাশ করেছিল। এরপর থেকে যখন যেখানে কোনো মানুষ দেশ ছাড়ার কথা বলে, তখনই গণমাধ্যম এই সংবাদ প্রকাশ করছে।
বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক দেশ। এই দেশ নিয়ে আপনার অভিযোগটা অনেক বড়। আপনি কি মনে করেন না, বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক দেশ?

এমন প্রশ্নে প্রিয়া বলেন, এদেশে স্বাধীনতা যুদ্ধ হয়েছিল। তখনতো ৩০ লাখ মানুষ প্রাণ দিয়েছিল। আর এই স্বাধীনতার লক্ষ্যটাতো ছিল বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সোনার বাংলা গড়ার এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার। আর তার চার মূলনীতির মধ্যে অসাম্প্রদায়িকতা ছিল অন্যতম মূলনীতি। তিনি সেটা করেছিলেন। আর দেশও সেভাবে এগোচ্ছিল। কিন্তু ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে সে অধ্যায়ের এক ধরনের সমাপ্তি ঘটে। তারপর দীর্ঘদিন যে সামরিক বা অগণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় ছিল তারা সেই অসাম্প্রদায়িকতাকে কোথায় নিয়ে গিয়েছিল এবং ১৯৮৮ সালে রাষ্ট্রধর্ম কি করা হয়েছি সেটা আপনারা জানেন এবং এই ধারাবাহিকতায় আমাদের স্বাধীনতার যে লক্ষ্য ছিল তা ক্রমাগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। তবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তা আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। আপনারা জানেন আওয়ামী লীগের অন্যতম মূলনীতি হচ্ছে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ। আর এটা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রধানমন্ত্রী এবং তার দল অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। তার পরেও এই দেশ থেকে মানুষ হারিয়ে যাচ্ছে এবং কমে যাচ্ছে। এটা দেশের সচেতন মানুষ কিন্তু ঠিকই জানে। আপনাদের অবশ্যই মনে আছে রামুর কথা, অভয়নগরের কথা, রংপুরের কথা, সাঁওতাল পাড়ার কথা, নাসিরনগরের কথা, ৮৯ সালের কথা, ১৯৯২, ২০০১ সালের কথা। প্রতিটা নির্বাচনের আগে পরে নির্বাচনকালীন সহিংসতা হয়েছে, বর্তমান সরকারের নেতৃত্বে ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে।

প্রশ্নকারী জানতে চান, ধর্মীয় সহিংসতা আমাদের দক্ষিণ এশিয়ায় প্রায় হয়ে থাকে। যেটা সর্বশেষ মিয়ানমারে দেখা গেছে। কিন্তু এই সমস্যা কেন আপনি আমেরিকার প্রেসিডেন্টের কাছে নিয়ে গেলেন?
প্রিয়া বলেন, আপনি জানেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মৌলবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিশেষ করে আমাদের পুলিশ বাহিনী এই বিষয়ে বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সফলতা দেখিয়েছে। আমেরিকা সরকার মৌলবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার আছে। তাই আমি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে এই কথাটা এজন্য বলেছি যে, যাতে করে বাংলাদেশে মৌলবাদের উত্থান না হয়, এই জন্য আমেরিকা সরকার যাতে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কাজ করতে পারে। আমি এজন্যই তাদের কাছে বলেছি।

আপনি যে কথা বলেছেন, মানুষ মনে করছে এটা দেশের অনেক সম্মান ক্ষুণ্ন করেছে। আপনাকে তো মানুষ ভালোভাবে নেয়নি। এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমি বাংলাদেশের মানুষের তো কোনো দোষ দেখছি না। কিছুসংখ্যক মানুষ এই বিষয়টাকে ভিন্নদিকে ঘুরিয়ে দেয়ার জন্য এই কথাগুলো বলছে। কিন্তু সাম্প্রদায়িকতা এবং মৌলবাদের বিরুদ্ধে এই সরকার যুদ্ধ করছে। এবং আমি মনে করি সরকার আমাকে যেমন সর্বাত্মকভাবে সহায়তা করবে এবং আমার পরিবারকেও সর্বাত্মকভাবে সহায়তা করবে। কারণ সরকার যে কাজটা করছে, আমি শুধু এটা শক্তিশালী করার জন্য এই কথাগুলো বলেছি।

সরকারতো বলছে আপনার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেবে? এ প্রশ্নে প্রিয়া বলেন, আমি মনে করি না। যখন তারা প্রকৃত সত্যটা জানতে পারবে আমার এ কথার মাধ্যমে। বিভিন্ন ধরনের জনগোষ্ঠী বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য বিভিন্ন বিভ্রান্তিকর কথা বলছে। যখন নীতিনির্ধারক পর্যায়ে কথাগুলো শুনবেন তখন তারা বুঝতে পারবেন। আমার ব্যবস্থা নেয়ার পরিবর্তে আমাকে পাশে নিয়ে মৌলবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবেন।

আপনি এ ধরনের কথার মধ্য দিয়ে দেশের মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকদের এক ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছেন? এমন প্রশ্নে প্রিয়া বলেন, আমার বাড়িটা যখন পুড়িয়ে দেয়া হলো। ২০০৪ সাল থেকে ৩০০ একর জমি মুজিবর রহমান শামিম প্রাক্তন উপজেলা চেয়ারম্যান, সিরাজ মোল্লা, শওকত মোল্লা নজরুল সর্দারসহ একটি সন্ত্রাসী গ্রুপ আমাদের গ্রামের সকল সম্পত্তি নিয়ে যায়। প্রায় ১০০ মাছের ঘেরের সব মাছ নিয়ে যায়। এবং আমার বাড়িটা পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে মার্চ মাসের ২ তারিখে। এ বছরের ২২শে এপ্রিল আমার গ্রামে আবার আক্রমণ চালানো হয়েছে। আমার বাড়ি যখন পুড়িয়ে দেয়া হয় তখন দেলোয়ার ফোন করে জানায়। সে প্রায় ৩০ মিনিট ধরে হাউমাউ করে কাঁদে। আমি তার আর কান্না থামাতে পারি না। আমাদের বাড়িতে যখন হামলা হয় তখন অনেক মুসলমানরাও আহত হয়। অবশ্যই মুসলমান-হিন্দুরা কোনো শত্রু না। ৯৯ শতাংশ মানুষ বন্ধু। কিন্তু কিছু দুষ্টুলোক আছে যারা এই ঘটনাগুলো ঘটায়।
প্রশ্নকর্তা বলেন, বুঝতে পারছি আপনার রাগ ক্ষোভ আছে। আপনি গ্রিনকার্ড বা নাগরিকত্ব পাওয়ার আশায় এমনটা বলেছেন কিনা?

জবাবে প্রিয়া বলেন, গ্রিনকার্ড পাওয়ার জন্য কী প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখা করতে হয়। আমি বহুবার আমেরিকায় এসেছি। আমি বলেছি আমি দেশে থাকতে চাই। ওটাই আমার প্রথম কথা, ওটাই আমার শেষ কথা। আপনি তাহলে দেশে ফিরবেন? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, অবশ্যই ফিরবো, কেন ফিরবো না।

প্রিয়া সাহার বিরুদ্ধে তড়িঘড়ি ব্যবস্থা নেবে না সরকার: ওবায়দুল কাদের
দেশের সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে অভিযোগকারী প্রিয়া সাহার বিরুদ্ধে তড়িঘড়ি ব্যবস্থা নেবে না সরকার। তার বিরুদ্ধে মামলা না করতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গতকাল এ তথ্য জানান। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ঢাকা মেট্রোরেল নেটওয়ার্কের সময়বদ্ধ পরিকল্পনার ব্র্যান্ডিং বিষয়ক সেমিনার এবং লাইসেন্স হস্তান্তর অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি। এসময় ওবায়দুল কাদের বলেন, তাকে দেশে ফিরে এসে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয়া হবে। প্রিয়া সাহা ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে এ ধরনের বক্তব্য কেন দিয়েছেন? সেটা দেশে ফিরে এলে আমার মনে হয়, তারও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থাকা উচিৎ। আমাদের নেত্রী তিনি গতরাতে আমাকে একটা মেসেজ পাঠিয়েছেন, যেখানে তড়িঘড়ি করে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রয়োজন নেই বলে জানিয়েছেন। ওবায়দুল কাদের বলেন, প্রিয়া সাহা আসলে কি বলেছেন, কি বলতে চেয়েছেন, তার একটা পাবলিক স্টেটমেন্ট করা উচিৎ। তারও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থাকা উচিৎ। তার আগে কোনো লিগ্যাল প্রসিডিংস না করতে, মামলা না করতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। আজকে আমাদের মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রী একটা মামলা করতে চেয়েছিলেন, আমি তাকে এ ধরনের মামলা করতে না করেছি। আইনমন্ত্রীর সঙ্গেও আমার এ ব্যাপারে কথা হয়েছে। প্রিয়া সাহার ব্যক্তিগত বাড়িঘর, তার সম্পদ যাতে প্রটেকক্টিভ রিজার্ভ থাকে সেজন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকেও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ জানিয়ে দিয়েছি। তিনি বলেন, একজন ব্যারিস্টার রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করতে চেয়েছিলেন। আমাকে আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন এটা অগ্রাহ্য করা হয়েছে। সরকারের অনুমতি ছাড়া রাষ্ট্রদ্রোহী মামলাও করা যায় না। তাছাড়া যিনি এ ব্যাপারে অভিযোগ করেছেন, সে অভিযোগ প্রসঙ্গে প্রিয়া সাহার বক্তব্যও আমাদের ভালো করে জানা দরকার, জাতির জানা দরকার। তার আগে স্টেপ নেয়া যাবে না। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, এ বিষয় নিয়ে আমি হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের রানা দাশগুপ্তের সঙ্গে আলাপ করেছি। তিনি বলেছেন, এই বিষয়টি প্রিয়া সাহার ব্যক্তিগত বক্তব্য। এই বক্তব্যের সঙ্গে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের কোনো সম্পর্ক নেই।

ওবায়দুল কাদের জানান, মহান স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষ্যে ২০২১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর মেট্রোরেল রুট-৬’র যাত্রী পরিবহন শুরু হবে। এটা চালু করার আগে ভৌত কাজ এবং পরীক্ষামূলক চলাচল সম্পন্ন হবে। এছাড়া ২০৩০ সালের মধ্যে আরও চারটি রুট নির্মাণ করা হবে। এ রুটগুলোতে উড়াল অংশের পাশাপাশি পাতাল রেলও থাকবে। তিনি বলেন, সময়াবদ্ধ পরিকল্পনার আওতায় হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর হতে কমলাপুর এবং নতুন বাজার হতে পিতলগঞ্জ পর্যন্ত প্রায় ৩১ কি.মি. দীর্ঘ মেট্রোরেল রুট-১ এর কাজ শুরুর লক্ষ্যে কার্যক্রম এগিয়ে চলেছে। এ রুটে ১১ কি.মি. পাতাল রেল থাকছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইতোমধ্যে এ রুটের সম্ভাব্যতা যাচাই, পরিবেশগত সমীক্ষা এবং মূল নকশার কাজ শেষ হয়েছে। প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি অংশে বিভক্ত মেট্রোরেল রুট-১ এর কাজ ২০২৬ সালের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি বলেন,মহানগরীর হেমায়েতপুর হতে ভাটারা পর্যন্ত ২০ কি.মি. দীর্ঘ মেট্রোরেল রুট-৫ এর সাড়ে ১৩ কি.মি. থাকছে পাতাল রেল। এ রুটের অপর অংশ গাবতলী হতে দাশেরকান্দি পর্যন্ত প্রায় ১৭ কি.মি. দীর্ঘ। মেট্রোরেল রুট-৫ এর পরামর্শক নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে এবং বিস্তারিত নকশা প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় কমিটির সদস্য এনামুল হক, রেজওয়ান আহম্মদ তৌফিক, মো. ছলিম উদ্দীন তরফদার, ডিএমটিসিএল’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম.এ.এন ছিদ্দিক, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব শিশির কুমার রায়, মেট্রোরেল রুট-৬ এর প্রকল্প পরিচালক আফতাব উদ্দিন তালুকদার, মেট্রোরেল রুট-১ এর প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী সায়েদুল হক উপস্থিত ছিলেন।

প্রিয়া সাহার বিরুদ্ধে দুই মামলার আবেদন খারিজ
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের কাছে বাংলাদেশি সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতনের অভিযোগে প্রিয়া সাহার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ দুই মামলার আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন আদালত। রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় সরকারের অনুমতি না থাকায় মামলা দুটি খারিজ করা হয়।

গতকাল ঢাকা মহানগর হাকিম জিয়াউর রহমানের আদালতে আইনজীবী ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমন একটি মামলা করেন। এছাড়া মহানগর হাকিম আবু সুফিয়ান মো. নোমানের আদালতে আইনজীবী ইব্রাহিম খলিল অপর মামলাটি করেন। পরে আদালত দুই বাদীর জবানবন্দি রেকর্ড করে মামলা ২টি খারিজ করে দেন। ব্যারিস্টার সুমনের আইনজীবী আবুবকর সিদ্দিক জানিয়েছেন আইনগত বাঁধা থাকায় সুমনের মামলা খারিজ হয়েছে। আর ইব্রাহিম খলিলের আইনজীবী রাশেদা আক্তার জানিয়েছেন, বাদী সরকারি প্রতিনিধি না হওয়ায় খলিলের মামলা খারিজ করেছেন আদালত।

আদালতসূত্রে জানা যায়, দুই বাদী মামলার আবেদনে উল্লেখ করেছেন, গত ১৭ই জুলাই সাম্প্রদায়িক নিপীড়নের শিকার বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে হোয়াইট হাউজে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প কথা বলেন। এ সময় বাংলাদেশি প্রিয়া সাহা ৩ কোটি ৭০ লাখ ধর্মীয় সংখ্যালঘু গুম এবং তার নিজের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ ও জমি দখলের অভিযোগ করেন। মুসলিম মৌলবাদী গ্রুপ এগুলো করছে এবং সবসময় তারা রাজনৈতিক শেল্টার পাচ্ছে বলেও ট্রাম্পকে বলেন প্রিয়া সাহা। আসামির এ ধরনের অভিযোগ শান্তিপ্রিয় বাংলাদেশের মানুষের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং তিনি এর মাধ্যমে দেশের মধ্যে ধর্মীয় ভেদাভেদ তৈরি করেন। যা দেশকে অস্থিতিশীল ও বিদেশী রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ করার পাঁয়তারা করেছে বলে খারিজ করা মামলায় উল্লেখ করা হয়।
ট্রাম্পের কাছে দেয়া মিথ্যা বক্তব্য সম্পূর্ণ রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল উল্লেখ করে আসামি স্বাধীন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছেন বলে অভিযোগ আনা হয়।