আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং দুদকের অভিযান :সা কা ম আনিছুর রহমান খান

চারদিকে আলোড়ন পড়ে গেছে , জনগণ আশান্বিত । চিকিৎসা ব্যবস্থায় অনিয়ম দূর করতে মাঠে নেমেছে ‘দুদক’। এটাই ‘দুদক‘ এর নতুন অভিযান নয় । এর আগেও তারা অভিযান চালিয়েছে । এসব অভিযানে অনেক হোমরা চোমরা ধরা পড়েছে , তাদের কেউ কেউ সাজাপ্রাপ্ত হয়েছে , কারো বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আছে । সম্প্রতি আদালতসূত্রে জানা গেল ‘বনের রাজা ‘এর সাজা সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগেও বহাল আছে । রূপসা সেতুর টোল সংক্রান্ত হাতে নাতে ধরা পড়া প্রকৌশলীদের মামলার বিষয়টা এখনও জনগনের অজানা , এককালে এই ঘটনা সারা দেশে সাড়া জাগিয়েছিল ।

আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কর্তৃক পরস্পর যোগসাজসে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য জমি কেনার জন্য দেড় কোটি টাকা মূল্যের জমির দাম তিন কোটি দেখিয়ে একই বিল চার বার পরিশোধ করার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিল তছরূপের অভিযোগটির পরিণতির কথা এখনো জনগণ জানতে পারেনি । দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান মাঝপথে থেমে যাওয়ায় জনগনের মাঝে দেখা দিচ্ছে হতাশা । দুদক যখনই কোন অভিযান চালায় তখনই জনগণ আস্বস্থ হয় , কার্যক্রমকে বাহবা জানায় , তারা আশা করে দোর্দন্ড প্রতাপশালী দুর্নীতিবাজ এবার শায়েস্তা হবে । এরূপক্ষেত্রে দেখা যায় অভিযুক্ত ব্যক্তিও তৎপর হয়ে উঠে , এদের হাতে কিন্তু টাকা কড়ি থাকে। সেটা তারা অর্জন করেছে দুর্নীতির মাধ্যমে । অভিযোগ থেকে রেহাই পাবার জন্য তারা এরই একটা অংশ খরচ করে । এ জন্য ‘হলুদ বায়স‘ ‘বক্তৃতাজীবী ‘ ‘টক-শো জীবী‘ ধোপ দূরস্ত পোষাকধারী বসন্তের কোকিলরূপী ‘বিশিষ্ট জন‘ এর অভাব হয় না। তারপরও আছে ‘চাঁদির পাদুকা’‘ এই সব প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েই চলে দূর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে অভিযান। এসব অভিযান সব সময়ই বিফল হয় না। ঢাকার বুকে এসব অভিযানের সাফল্যের সৌধ হিসাবে দাঁড়িয়ে আছে ‘ শাহবাগ হোটেল ‘ ‘বলাকা হল’ ‘ হোটেল ইলিসিয়াম‘ ‘জনতা টাওয়ার‘ সহ বহু স্থাপনা । এই সব ‘সৌধ‘ যারা নির্মাণ করেছিলেন তাদের অর্থের উৎস ছিল দূর্নীতি, রাজনৈতিক ক্ষমতার দম্ভ , স্বজনপ্রীতির অহমিকা ।

দূর্নীতি বিরোধী অভিযানকারীদের সততা, দক্ষতা, দৃঢ়তা, নির্ভীকতার কারণে এইসব সাফল্য অর্জিত হয়েছে । কোন কোন সময় দুর্নীতি বেপরোয়া গতিতে চলতে শুরু করলেও দুঃসময়ের মেঘ একদিন না একদিন কেটে যায় । দম্ভ হারিয়ে দুর্নীতিবাজেরা পাদুকা খুলে এজলাশে করজোরে বিচার প্রার্থনা করে। দুর্নীতিলব্ধ অর্থ বা সম্পদ দুনীতিবাজেরা বা তাদের স্বজন বা পোষ্যরা অনেক ক্ষেত্রেই ভোগ করতে পারে না । তা ভোগ করে ‘বারো ভূত।‘ তারপরও মানুষ দুর্নীতির পথে পা বাড়ায় । প্রসঙ্গ এসেছে আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে । জীবনের সূচনা লগ্ন থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষ তো বটেই অন্যান্য প্রাণী এবং উদ্ভিদের জীবনে চিকিৎসকের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য । মৃত্যুর বিষয়েও সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয় চিকিসকের দেওয়া সনদ দেখে । তাই চিকিৎসকের প্রতি মানুষের আস্থা ও আশা রয়েছে অন্তহীন। চিকিৎসকের সেবা ও চিকিৎসার কারণে মানুষ আরোগ্য লাভ করলে যার পর নাই আনন্দিত হয় এবং বিভিন্নভাবে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়, তেমনি চিকিৎসা সেবায় গাফিলতির কারণে রোগীর অকল্যাণ হলে তার প্রতি মানুষের রুষ্টতার সীমা থাকে না। এর বহিঃপ্রকাশ ঘটে অনেক সময় ধ্বংসাত্মক কার্যাবলীর মাধ্যমে। অসুস্থ ও দুস্থ চিকিৎসাপ্রার্থী স্বয়ং বা স্বজনকে নিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা হাসপাতালে ( এলাকা ভেদে যেটা যার নিকটবর্তী ) গিয়ে চিকিৎসককে না পেলে বা সদব্যবহার না পেলে তাৎক্ষণিকভাবে সে নিজের মেজাজ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে না । তখনই ঘটে বিপত্তি ।

এটা যদি নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা হয় তাহলে অভিযোগ ক্ষোভ বিক্ষোভ এ সবই ক্রমে ক্রমে বিকট আকার ধারণ করে , পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় । চিকিৎসক ও জনগণ মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায় । পক্ষে বিপক্ষে অনেক যুক্তি পাল্টা যুক্তি উত্থাপিত হয় । আবেগ তাড়িত হয়ে জনগণের কেউ কেউ এসব যুক্তি তর্ক উপেক্ষা করে হাতে তুলে নেয় আইন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সচেতন নাগরিক ও প্রশাসনকে নিদারুন বেগ পেতে হয় । সবার ঐকান্তিক ও আন্তরিক যৌথ প্রচেষ্টায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে । প্রতিষ্ঠিত হয় শান্তি । কিন্তু নাগরিকদের মনে দাগ রয়ে যায় । তারা প্রতিবিধান আশা করতে থাকে। মেয়াদ উত্তীর্ণ ঔষধ রাখার জন্য প্রশাসন যখন কোন ডিসপেন্সারী , ক্লিনিক, বে-সরকারী হাসপাতালে অভিযান চালায় এই নাগরিকেরা তখন যারপরনাই আনন্দিত ও আশান্বিত হয় । তারা কামনা করে প্রশাসনের এইসব অভিযান যেন সফল হয় দোষীরা সাজা পায় । সেই সাথে বন্ধ হয় এই সব ব্যবসা , কিন্তু কিছুদিন পরই আকস্মিকভাবে রহস্যজনক কারণে এই সব অভিযান বন্ধ হয়ে যায় । অবস্থা হয়ে যায় যে কে সেই ।

এই বাংলায় আবহমানকাল থেকে চিকিৎসক(বিভিন্ন যুগে যে নামেই অভিহিত হোন না কেন)গণ ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ । অসুস্থ ব্যক্তি ও তাদের স্বজনদের অত্যন্ত আস্থাভাজন ও প্রিয় ভাজন । ১৮৫৭ খ্রিঃ (আগে ও পরে) তৎকালীন পাবনার সিভিল সার্জন ছিলেন ডাঃ আমির খান। ঘাড় বেঁকে যাওয়া একজন রোগীর কোন মতেই উপশম হচ্ছিল না। ডাক্তার আমির খানের শরণাপন্ন্ হলে তিনি রোগী বললেন তার এ রোগ ভাল হবার নয় , কষ্ট লাঘব করার জন্য মৃত্যুবরণ করাই শ্রেয় । রোগী এবং তার স্বজনেরা রাজী হলেন। ডাক্তার বললেন তিনিই রোগীকে বলি দিয়ে তাকে মুক্তি দিয়ে চান। সবাই সম্মতি জ্ঞাপন করলো । রোগীকে বিছানায় শুইয়ে দেওয়া হলো , নরবলি দেবার ভয়ংকর পোষাকে সজ্জিত হয়ে বিশাল তলোয়ার নিয়ে রোগীর সামনে হাজির হলেন। রোগীকে ‘ইষ্ট নাম‘ জপ করতে বলা হলো । জপ শেষে ভয়ংকর মূর্তিধারী ডাক্তার বিশাল তরবারী নিয়ে তীব্র হুংকার দিয়ে রোগীরে গলায় আঘাত করার জন্য তরবারী নিয়ে গেলেন , আতংকিত রোগী আত্মরক্ষার জন্য সর্বশক্তি দিয়ে উঠতে উদ্যত হলো । ডাক্তার তরবারী থামিয়ে দিলেন । সবাই অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করলো রোগীর উপশম হয়েছে, তার এখন আর কোন সমস্যা নাই । ডাক্তারের কৌশলী চিকিৎসায় চারিদিকে ধন্য ধন্য পড়ে গেল। এই কিংবদন্তী যুগ যুগ ধরে গ্রাম থেকে গ্রামে , শহর থেকে শহরে, জনপদ থেকে জনপদে এখনও চালু আছে । ( তথ্য সূত্র জনাব এ টি এম আবদুর রহমান খান ) । জমিদারদের প্রতি শর্ত ছিল জমিদারী এলাকায় দাতব্য চিকিৎসালয় , প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয় , সংরক্ষিত পুকুর ইত্যাদি রেখে তার উপযুক্ত রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। জমিদারী প্রথা উচ্ছেদের সূত্র ধরে এই ব্যবস্থাসমূহও এখন আর নাই। তবুও বাস্তবতা এই যে চিকিৎসকদের ব্যাপক অংশ এখনও জনসেবায় নিবেদিত প্রাণ। রাত্রি দিন ঝড় বাদল উপেক্ষা করে তারা পীড়িত মানুষের দুয়ারে হাজির হয়ে রোগীর চিকিৎসা করেন। ডাক্তারদের যখন দলীয় রাজনীতির অংগণে নিয়ে আসা হয় তখন থেকেই এর পরিবর্তনের বা অবক্ষয়ের সূচনা হয়েছে । ডাক্তার বদরুদ্দোজা চৌধুরী এবং ডাক্তার আবদুল মতিন যখন এই উদ্যোগ নিয়ে কার্যক্রম শুরু করেন তখনই ডাঃ এম ইসাহাক এর বিরোধীতা করে পরিণতির কথা বর্ণনা করে সতর্ক করে দিয়েছিলেন। সেদিন ডাক্তার এম ইসাহাকের কথায় কেউ কান দেন নাই ।
আজ দেখা যাচ্ছে গোটা চিকিৎসা ব্যবস্থা দলীয় রাজনীতির জটাজালে আবদ্ধ হয়ে গেছে । রাজনৈতিক পরিচয়ে ডাক্তারদের বিভিন্ন সংগঠন গড়ে উঠেছে । রাজনৈতিক পরিচয় ব্যতীত পদায়ন, পদোন্নতি, বিদেশ গমন ইত্যাদির কিছুই হয় না। মেধা ও চিকিৎসা সেবা দানে দক্ষতা পিছু পড়ে যায় দলীয় রাজনৈতিক পরিচয়ের কাছে । এর ফলে চিকিৎসা সেবা এখন বাস্তব অর্থে জনসেবা নয় , এটা এখন ব্যবসা খাতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। । এই খাত এখন জন সেবার চাইতে লভ্যাংশের দিকে নজর দিচ্ছে। যা সংবিধানের ১৮ অনুচ্ছেদের সুস্পষ্ট লংঘন। জনসেবাকে সামনে রেখে ও প্রাধান্য দিয়ে আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা চলছে না। লাভ লোকসানের বিষয়টা সর্বোচ্চ প্রধান্য দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে । সমাজ ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক কাঠামো এবং ব্যবস্থাপনায় মুনাফা লভ্যাংশ অর্জন প্রাধান্য পাবার কারণে মানবিক মূল্যবোধ আর কোন অবদান রাখতে পারছে না । সবাই ছুটছে মুনাফা লভ্যাংশ ও সম্পদ আহরণের দিকে। চিকিৎসকগণও এই সমাজেই বাস করেন , তাদের কেউ কেউ স্বাভাবিক ভাবেই শামিল হয়েছে এই মিছিলে । বর্তমান বাংলাদেশে জনগণের শাসনব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের কোন সুযোগ নাই । রাজণ্যবর্গ তাই জনমত জনকল্যাণের থোরাই কেয়ার করেন। রাজণ্য এবং অতি অতি…গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের জন্য রাজধানীতে রয়েছে অত্যাধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা ; তারপরও দুবারের পর তৃতীয় বার হাঁচি হলেই তারা চলে যান ব্যাংকক , সিঙ্গাপুর , চেন্নাই , কলকাতা , দিল্লীতে। এজন্য প্রস্তুত রয়েছে ‘এয়ার এ্যামবুলেন্স‘। গ্রামীণ জনপদ , মফস্বল শহরে সরকারী ব্যবস্থাপনায় হাসপাতাল চিকিৎসা কেন্দ্র থাকলেও সেখানে চিকিৎসক প্রায়ই থাকেন না , নিরীক্ষার জন্য উন্নতমানের যন্ত্রপাতি থাকলেও তা দিয়ে কাজ করার উপযুক্ত যন্ত্রকুশলী নেই , জেল সময় মতো থাকে না। রোগীকে ছুটতে হয় বেসরকারী হাসপাতাল বা ক্লিনিকে । গুনতে হয় বিপুল অর্থ । যার সামর্থ নাই তার জন্য রয়েছে হাতুরে ডাক্তার । কোন কোন সময় প্রত্যন্ত অঞ্চলের কোন অসুস্থ গরিব রোগীকে হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় এনে চিকিৎসা দিয়ে তা ঢালাওভাওবে প্রচার করা হয় , উদ্দেশ্য রাজণ্যবর্গ প্রজারঞ্চনে ব্যাকুলে , এটা দেশে বিদেশে জানান দেওয়া । চিকিৎসা ব্যবস্থার এই বিশৃংখল ও বিপর্যস্থ অবস্থা বহাল রেখে দুদকের অভিযান সফল হবে এটা আশা করা আহাম্মকি ছাড়া আর কিছু নয় ।
‘গোটা সমাজ ব্যবস্থাই যেখানে কলুষিত সেখান কয়েকজন মানুষের আত্মদানের মূল্য কতটুকু।‘ মহান বিপ্লবী নেতা চে গুয়েভার এই ঐতিহাসিক উক্তির আলোকে আজ আমাদেরকে সমস্যার সমাধান খুঁজতে হবে। চিকিৎসা ব্যবস্থাকে গ্রামীণ ও মফস্বলের জনগণের কাছে এবং নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যেতে হবে। শুধু ঢাকা মহানগর নয় সারা দেশের মানুষের জন্য স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে হবে।দলীয় রাজনীতির প্রভাবমুক্ত করতে হবে চিকিৎসা ব্যবস্থাকে। তা করা হলেই নিবেদিত প্রাণ চিকিৎসকগণ সামনে আসতে পারবেন। তাহলেই জনগণের অর্থে গড়ে ওঠা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় ও হাসপাতাল সমূহ থেকে গড়ে ওঠা মেধাবী চিকিৎসকগণ দক্ষতা অর্জন করে জনগণের সেবায় আত্মনিয়োগ করার সুযোগ পাবেন। নচেৎ কোন হুংকারেই কাজ হবে না। এর আগেও জনগণ এরূপ হুংকার শুনেছে এবং তার করুণ বিফলতাও দেখেছে। দলীয় রাজনৈতিক প্রভাব যতদিন চিকিৎসা ব্যবস্থাকে আচ্ছন্ন করে থাকবে ততদিন দুদকের অভিযান পদে পদে বাধাগ্রস্থ হতে হতে স্থবির হয়ে যাবে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত না হয়েও যাবা নিজেদেরকে জনপ্রতিনিধি বলে দাবী করে , তারা এসব জনকল্যাণমুখি কাজে আত্মনিয়োগ করবে এটা ভাবার কোন বাস্তবসম্মত কারণ নাই ।
লেখকঃ সাবেক জেলা ও দায়রা জজ ।