প্রজন্মের মতান্তর:আহমেদফজলুর রহমান মূরাদ

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বর্তমান সময়ের আলোচিত চরিত্র সাবেক সামরিক শাসক সৈরাচার খ্যাত হোসেন মোঃ এরশাদ। তার মৃত্যুর পরে জাতি দ্বিধাবিভক্ত।তার ক্রীতকর্ম নিয়ে দুই প্রজন্ম দুই জাতীয় মন্তব্য করছে।এরশাদের ক্ষমতা দখল তার ৯ বছরের সামরিক সৈরাচারী শাসন জাফর,জয়নাল,দীপালি সাহা,তাজুল,বসুনিয়া,শাহজাহান সিরাজ,ডাঃ মিলনের হত্যাকারী হিসাবে ৯০ দশকের ছাত্র আন্দোলন এবং এর নেতৃত্বদানকারী ছাত্রসমাজ এরশাদকে বলছেন সৈরাচার আর এই আন্দোলনকে পুজি করে যে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ক্ষমতার সুবিধা নিয়েছেন তারাই বলছেন এরশাদ বড় ভালো লোক ছিলেন। তিনি খুবই সজ্জন ও বিনয়ী ছিলেন।
তাদের আজকের কথা থেকেই মনে হচ্ছে তারা কেউ ৯০য়ের গন অভ্যুত্থানের পক্ষে ছিলেন না।তারা শুধুমাত্র ছাত্রসমাজের আন্দোলনের সুফলটা ভোগ করেছেন।আজকের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের আচরন আর এরশাদ ভক্তি দেখে স্পষ্টীকৃত হয়েছে যে তারা একসময় এরশাদের কাছে থেকে সুবিধাভোগী ছিলেন।।তাদের বিরুদ্ধে উত্তরপাড়ার কানেকশন শুধুমাত্র প্রচারণা নয় সঠিক ছিলো।

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ এরশাদ ছুটিতে রংপুর থেকেও তিনি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন নাই।তিনি পাকিস্তানিদের পক্ষেই যোগ দিয়েছিলেন।তিনি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে যে সকল বাঙ্গালি সামরিক অফিসার চেষ্টা করেছিলেন তাদের বিচারে গঠিত সামরিক ট্রাবুনালের তিনি চেয়ারম্যান ছিলেন। অথচ আজ তার কফিন জাতীয় পতাকা দিয়ে আচ্ছাদিত। এটা জাতীয় পতাকার অবমাননা বলেই নব প্রজন্ম মনে করছে।কিন্তু রাজনৈতিক নেতারা কোন আপত্তি না করে সেই কফিনেই তাদের শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন।কতবড় নিকৃষ্ট উদাহরণ।।

আজকে ৯০য়ের ছাত্র আন্দোলন যারা নেতৃত্ব দিয়েছিলো তারাও স্তম্ভিত। রাজনৈতিক নেতাদের আহাজারি দেখে তারাও বুঝতে পারছে কেন তিন জোটের রুপ রেখা বাস্তবায়ন হয় নি।কেন রাষ্ট্রধর্ম আজও বহাল।কেন সৈরাচারের কোন বিচার হয় নি। কথা ছিলো এরশাদের পতনের পর তাকে বা তার সঙ্গী সাথি কাউকেই কোন রাজনৈতিক সংগঠনে নেবে না। কারন তারা ঘৃনিত অপরাধী কিন্তু পরবর্তীতে দেখা গেলো কোন রাজনৈতিক দলই কথা রাখে নাই।।

সে দিন এই রাজনৈতিক নেতৃত্ব অত্যন্ত সু কৌশলে তাদের সুবিধার ঋন শোধ করতে ছাত্রজনতার রুদ্ররোষ থেকে এরশাদকে বাচাতেই তাকে কারারুদ্ধ করেছিল।আজকে জাফর জয়নাল দীপালি, সেলিম,দেলোয়ার তাজুল,বসুনিয়া শাহজাহান সিরাজ, নুর হোসেন ডাঃ মিলনের প্রজন্মকে ভাবতে হবে সেদিনের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের ভুমিকা ছিলো লোক দেখানো অভিনয়। সেইদিনের ছাত্রগন অভ্যুত্থানেের প্রতি এই সব নেতৃত্বের নুন্যতম সমর্থন বা কার্যকর সহায়তা ছিলো না।তারা ছিলেন শুধুমাত্র আন্দোলনের সুবিধাভোগী।

যারা আজকে সৈরাচার এরশাদের কফিনে ফুল দিয়ে শোকবানী দিচ্ছেন সেই নেতৃত্বে কি অধিকার আছে নুরহোসেন বা ডাঃ মিলনের কবরে ফুল দেবার।তাদের কি অধিকার আছে ঘটা করে শহীদ মিলন দিবসের আলোচনায় বক্তৃতা দেবার।

যারা এরশাদকে চারদলীয় জোট করেছিলেন বা মহাজোট করে বিশেষ দুত বা বিরোধীদলীয় নেতা বানিয়ে ছিলেন তারাই আজ ফলাও করে বলছেন হোসেন মোঃ এরশাদ বড় ভালো লোক ছিলেন।তিনি ছিলেন অমায়িক মার্জিত ও ভদ্রজন। কি সুন্দর বাক্যলাপ।তাহলে সৈরাচার কে ছিলো? এদেশের ছাত্রজনতা কি সেদিন ভুল বা অন্যায় করেছিল।তাই যদি ছাত্রনেতৃত্ব করে থাকে তবে আকতারুজজাম,মনিরউদ্দিন আহমেদ, আবুল হাসিব খান নাজমুল হক প্রধান,শফি আহমেদ ডাঃ মোসতাক,হাবিবুর রহমান হাবিবসহ যারা ছিলেন তাদেরকে বিচারের আওতাভুক্ত করা উচিৎ।

আজকের দুই প্রজন্মের এই বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট হয় আমাদের পুর্ববর্তী প্রজন্ম আমাদের প্রজন্মকে ধারন করেন না।আজকের সমাজ রাজনীতি সব বিষয়েই একই অবস্থা। পুর্ববর্তী প্রজন্মকে সাথে রেখে আর সামনে এগুনোর কোন সুযোগ নেই। আমাদের প্রজন্মকে সামনে এগুতে হলে পুর্ববর্তী প্রজন্মকে বাদ দিয়ে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকেই সাথে নিতে হবে।।

এরশাদকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে একটি সুক্ষ্ম চতুরতা দৃশ্যমান হচ্ছে যে, তার সময়ের দুর্নীতির চেয়ে এখন দুর্নীতি আরো বেড়েছে, বেড়েছে শাসন ব্যবস্থার কর্তৃত্ববাদ। নির্বাচনগুলো এরশাদের সময়ের চেয়ে এখন আরো খারাপ হয়েছে। এসবের কোনোকিছুই হয়ত অসত্য নয়। ইতিহাসে নিশ্চয় বিষয়গুলো মুল্যায়িত হবে। যিনি যা করছেন তার মূল্যায়ন সেভাবেই হবে। সে কারণে এরশাদের স্বৈরাচার পরিচয় মুছে যেতে পারে না। তার অনৈতিকতা-দুর্নীতি-অসততা, বর্তমানের প্রেক্ষাপট সামনে এনে আড়াল করা যাবে না।

যদিও সব সময়ের ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদরা সেই চেষ্টাই করছেন। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতারা এরশাদকে স্বৈরাচার বলেন না। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল, নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, এমন অনেক নেতা ‘এরশাদ সাহেব’ বলেন। বিএনপিরও কোনো কোনো নেতাকে ‘এরশাদ সাহেব’ বলতে শোনা যায়।

নূর হোসেন, সেলিম-দেলওয়ার, বসুনিয়া-জয়নাল-জাফর-দীপালি সাহা, ডা. মিলনদের কথা ভুলে গেছেন রাজনীতিবিদরা।

স্বৈরাচার ‘বিশ্ব বেহায়া’ বিদায় নিলেন ‘এরশাদ সাহেব’ হয়ে!

সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসেবে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন সম্পন্ন করার চেষ্টা চলছে। প্রশ্ন সামনে এসেছে, এরশাদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পাওয়া নিয়ে। আদালতের রায় অনুযায়ী এরশাদের ‘রাষ্ট্রপতি পদ’ অবৈধ। এছাড়া তিনি জেনারেল মঞ্জুর হত্যা মামলারও আসামি। ‘পঞ্চম ও সপ্তম সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জের মামলা দুটির রায়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সুস্পষ্টভাবে তিনটি বিষয় উল্লেখ করেছিলেন-

ক. জিয়াউর রহমান ও এরশাদের ক্ষমতা দখল অবৈধ।

খ. জিয়াউর রহমান ও এরশাদের ক্ষমতার পুরো সময়কাল অবৈধ।

গ. জিয়াউর রহমান ও এরশাদের ক্ষমতা দখলের পরের সকল কর্মকাণ্ড অবৈধ।

সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আপিল বিভাগ ঘোষিত যে কোনো রায় বাংলাদেশের আইন।

এই দুটি রায়ে মাননীয় বিচারপতিগণ সুস্পষ্টভাবে মতামত প্রকাশ করেছেন যে, সেনাবাহিনীর সদস্য হিসেবে এভাবে ক্ষমতা দখল ছিলো রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলক কর্মকাণ্ড। এজন্যে জিয়াউর রহমান ও এরশাদের বিচারের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিলো এই দুটি রায়ে।’’
(ফেইসবুক থেকে)