কেন সমাজ বিপ্লব??আহমেদ ফজলুর রহমান মূরাদ

শিশুদের জন্য ক্রমেই যেন অনিরাপদ হয়ে উঠছে বাংলাদেশের মাটি। ভয়াবহ রূপ নিয়েছে শিশু নিপীড়ন, ধর্ষণ ও হত্যা। ধর্ষকের বিকৃত যৌন লালসা থেকে মুক্তি পাচ্ছে না ৮ মাসের শিশু পর্যন্ত। শিক্ষাঙ্গনেও ধর্ষিত হচ্ছে শিশু শিক্ষার্থী। ধর্ষণের পর নির্মমভাবে শেষ করে দেওয়া হচ্ছে অনেক নিষ্পাপ প্রাণ। পৃথিবীকে ঠিকভাবে দেখার আগেই হত্যার শিকার হচ্ছে নবজাতক। পারিবারিক সহিংসতা, প্রতিপক্ষের হাতে গুম, স্বামী-স্ত্রীর দ্বন্দ্ব অথবা মা-বাবার পরকীয়ার বলি হচ্ছে তাদের শিশুসন্তান।

আবার সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ, রাজনৈতিক দ্বন্দ¦ ইত্যাদিতে প্রতিশোধের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে শিশু। ঘরে-বাইরে কোথাও নিরাপত্তা নেই শিশুদের। চলতি বছরের ছয় মাসে দেশে ২১৮ শিশু খুন হয়েছে। আর ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ১৬৬টি। অপহরণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৯ শিশুকে। নিখোঁজ হয়েছে ৭২ শিশু। নিখোঁজের পর ২৪ শিশুর লাশ উদ্ধার হয়েছে। বিভিন্ন পরিসংখানে প্রতি মাসে এই চিত্র বাড়তে দেখা গেছে। বেশির ভাগ শিশুই শিক্ষক, বাড়ির কেয়ারটেকার কিংবা স্থানীয় দোকানির হাতে ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধকল সইতে না পেরে অনেক শিশু ঘটনাস্থলেই মারা গেছে।

অনেককে আবার প্রমাণ মুছে দিতে হত্যা করা হয়েছে। কারও মৃত্যু হয়েছে হাসপাতালে। শুধু শিশু নয়, মধ্যবয়সী থেকে শতবর্ষী বৃদ্ধও ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাবে- চলতি বছরের গত পাঁচ মাসে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ১০৯টি। গণধর্ষণ হয়েছে ৩৬টি। এর মধ্যে শিশুর সংখ্যাই বেশি। ধর্ষণের শিকার ছয় বছর বয়সী শিশুর সংখ্যা ৪৮, ৭-১২ বছর বয়সী শিশুর সংখ্যা ৭১, ১৩-১৮ বছরের তরুণীর সংখ্যা ৪৭, ১৯-২৪ বছর বয়সী যুবতীর সংখ্যা ১৪, ২৫-৩০ বছর বয়সী নারীর সংখ্যা ৫, ৩০ বছরের উপরের রয়েছে ৫ জন। ধর্ষণের শিকার হয়ে মারা গেছেন ১৩ জন। এর মধ্যে ১২ জনই শিশু। আত্মহত্যা করেছে ৪ জন। এসব ঘটনায় সারা দেশের বিভিন্ন থানায় মামলা হয়েছে ২৪৩টি।

সর্বশেষ গত শুক্রবার সন্ধ্যায় পুরান ঢাকার ওয়ারীতে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয় সামিয়া আফরিন নামে ৭ বছরের এক শিশুকে। ওয়ারীর বনগ্রামের ১৩৯ নম্বর বাসায় এ ঘটনা। নেত্রকোনার কেন্দুয়ার আঠারবাড়ি এলাকায় মা হাওয়া (আ.) কওমি মহিলা মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক আবুল খায়ের বেলালী নিয়মিত একজন করে শিশু ছাত্রীকে কক্ষে ডেকে নিতেন শরীর টেপাতে। এক পর্যায়ে অবুঝ শিশুদের ধর্ষণ করে দোজখের ভয় দেখিয়ে এ কথা কাউকে বলতে নিষেধ করতেন। সম্প্রতি এক শিশু এ নিয়ে মুখ খুললে ফাঁস হয়ে যায় আবুল খায়েরের অপকর্ম। ৪ জুলাই রাজধানীর ধানমন্ডির গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। ওই শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে হাসপাতালের ক্যান্টিন বয়কে আটক করে পুলিশ। একই দিন বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলায় চতুর্থ শ্রেণির এক স্কুলছাত্রীকে (১২) ধর্ষণ করার অভিযোগে উপজেলার উত্তমপুর গ্রাম থেকে আলী মাতুব্বর (৫২) নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে পুলিশ। আলী মাতুব্বরের স্ত্রীর কাছে প্রাইভেট পড়তে যেত ওই স্কুলছাত্রী। গত ৮ মে রাজধানীর মোহাম্মদপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থান এলাকায় মেয়ের বান্ধবী ৮ বছরের এক মাদ্রাসাছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে হাসান মিয়া (৫০) নামে এক চা দোকানির বিরুদ্ধে। । কোচিংয়ে যেতে চাইত না রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ১১ বছরের এক শিশু। জোরাজুরি করায় মেয়েটি মাকে জানায় কোচিংয়ের শিক্ষক তার শরীরের যেখানে সেখানে হাত দেয়। এর পরদিনই মা তার সঙ্গে কোচিংয়ে যান। সেখানে অন্যান্য অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারেন কোচিং শিক্ষক আবুল হোসেনের ভয়ঙ্কর রূপ। অন্তত পাঁচ শিশু তার যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। গত ২৬ জুন রাজধানীর নূরজাহান রোডের ওই কোচিং সেন্টার থেকে আবুল হোসেনকে পুলিশ আটক করে। এই ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী মুখ খুলতে শুরু করে। বেসরকারি সংস্থা শিশু অধিকার ফোরামের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রতি মাসেই বেড়ে চলছে শিশু ধর্ষণের ঘটনা। সংস্থাটি বলছে, গত ৬ মাসে ৪৯৬ শিশুকে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। তাদের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটে ৫২টি, ফেব্রুয়ারিতে ৬০টি, মার্চে ৫২টি, এপ্রিলে ১২২টি, মে’তে ১১৯টি এবং সর্বশেষ জুন মাসে ৯১টি। এর মধ্যে ধর্ষণের পর খুন হয়েছে ২৩টি। মোট শিশু খুনের ঘটনা ঘটেছে ২০৫টি। আরো একটি তথ্যমতে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত এই ৬ মাসে সারাদেশে ৩৯৯ জন শিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণ চেষ্টার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে আট জন ছেলে শিশু। ধর্ষণের পরে একজন ছেলে শিশুসহ মারা গেছে মোট ১৬ শিশু।
আপনাদের যাদের মেয়ে রয়েছে তাদেরকে এমন পশুসুলভ আচরণ থেকে কীভাবে দূরে রাখা যায় তা একটু ভেবে দেখবেন। আপনার সন্তানদের রক্ষা করার চেষ্টা করবেন।- এমন মর্মস্পর্শী আবেদন করেছেন পাশবিক নির্যাতন ও হত্যার শিকার শিশু সায়মার বাবা আব্দুস সালাম।এখানেই সমাজের আর্তনাদ ফুটে উঠেছে।।

ধর্ষন আজ সামাজিক ব্যাধিতে পরিনত হয়েছে। কেন এটা এমন মহামারি আকার ধারন করল তার গবেষনা এবং প্রতিকার-প্রতিষেধক জরুরী। আর এখানে অশিক্ষিত শ্রেনির চেয়ে শিক্ষিত -সচেতন ও ধার্মিক শ্রেনির উপস্থিতি ব্যাপকভাবে লক্ষনিয়। রাষ্ট ও সমাজবিজ্ঞানীদের উচিৎ হবে দ্রততম সময়ের মধ্য এর কারন নির্নয় করে প্রতিরোধক ব্যবস্থা গ্রহন করা। অন্যথায় এ সমাজ হবে পশুবৃত্তিক- মৎস্যন্যায়,বসবাস অযোগ্য,নিরাপত্তাহীন, অমানবিক সমাজ। যা কারো কাম্য নয়।

এই হচ্ছে সমাজের একটি রুপ অপরদিকে কুমিল্লার তনু চট্টগ্রামের মিতু, সোনাগাজির নুসরাত, বরগুনার রিফাত, সরিষাবাড়ির কবির হোসেন, মাগুরার শিবরামপুরে লিসান, মাগুরার আল আমিনসহ সারাদেশব্যপী চলছে অবাধ হত্যা কোথাও আগুন দিয়ে পুড়িয়ে কোথাও বা রামদা দিয়ে কুপিয়ে।কেউ হত্যা করছে যৌনলালসা পুর্ন করতে ব্যর্থ হয়ে কেউ প্রেমিকা হারিয়ে কেউ সামান্য ইজিবাইক ছিনতাই করতে কেউবা বন্ধুর মটর সাইকেল ছিনিয়ে নিতে।এগুলি সবকিছুই সামাজিক অবক্ষয়। এগুলি নিতান্তই শুধুমাত্র সামাজিক সমস্যা নয় এর সাথে রাজনৈতিক সমস্যাও জড়িত।আজকে রাজনৈতিক মদদেই গড়ে উঠছে নয়ন বন্ড রিফাত ফারাজির ন্যায় ০০৭ বন্ড বাহিনী। নয়ন বন্ড একদিনে তৈরি হয়নি, তাকে তৈরি করা হয়েছে:বলেছেন হাইকোর্ট।এখন প্রশ্ন কারা তৈরী করেছেন তারা নিশ্চিত বিরোধী দলের কেউ নন।।ক্ষমতাসীনদের মদদেই আজ গড়ে উঠছে নয়ন বন্ড বাহিনী।।

হত্যা,ধর্ষণ,খুন এর পাশাপাশি আজকে সারাদেশব্যপী চলছে অবাধ লুন্ঠন।দুর্নীতি আজ সমগ্র সমাজকে গিলে ফেলেছে অসৎ আমলা ও অসৎ রাজনীতির প্রশ্রয়ে লুটে নেওয়া হয়েছে দেশের আর্থিক খাত, পাচার হয়েছে লক্ষ কোটি টাকা।বিদেশি ঋণের টাকায় বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পের ক্রমান্বয় ব্যয় বৃদ্ধি দেখিয়ে মালামাল ক্রয়ের নামে কি চলছে সেটা রুপপুর পারমাণবিক প্রকল্পেই ভেসে উঠেছে।স্বাস্থ্যখাতে কি চলছে সেটা সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজের দুর্নীতি থেকেই দেশবাসী অবহিত।রেলের পিছনে লক্ষ কোটি টাকার ব্যয়ের পরেও রেলে আজ নাটের বদলে বাশ ব্যবহৃত হচ্ছে।আর এগুলিই হচ্ছে রাজনৈতিক অপশাসনের কারনে।জনগনকে ভোট বঞ্চিত করে পুলিশ ও প্রশাসনকে ব্যবহার করে দিনের ভোট রাতে নিয়ে নির্বাচিত কোন সরকার জনগনের সরকার হতে পারে না।একটি অবৈধভাবে অনির্বাচিত সরকার না দিতে পারে সুশাসন না দিতে পারে গনতন্ত্র।কারন জনগনের প্রতি আস্থাহীন সরকার জনগনকে ভয় পায় তাই তারা ক্ষমতায় টিকে থাকতে প্রয়োজনে গণতন্ত্রকে হত্যা করে জন্ম দেয় ফ্যাসিবাদ। আর তখনই সমাজ হয়ে উঠে অস্থির আইনশৃঙ্খলা হারায় নিয়ন্ত্রণ। এর থেকে মুক্তি পেতে তখন প্রয়োজন হয়ে পড়ে সামাজিক পরিবর্তন বা সমাজ বিপ্লব।। আজকে এই সামাজিক অবক্ষয়কে রুখতে হলে দরকার ব্যাপক জনগনের ঐক্য। জনগনের এই ঐক্যকে গণ অভ্যুত্থানে রুপ দিতে পারলেই আসতে পারে জনগনের মুক্তি।।
ফেইসবুক থেকে
লেখক:আহমেদ ফজলুর রহমান মূরাদ