পরমাণু চুক্তি থেকে সরে আসছে ইরান

পরমাণু চুক্তি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সরে আসতে চাইছে ইরান। রোববারের পর থেকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) দেশগুলোর সঙ্গে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের বিষয়ে স্বাক্ষরিত চুক্তি আর মানবে না বলে শনিবার দেশটির প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি ঘোষণা দিয়েছেন।

ইরানের বেঁধে দেয়া ৬০ দিন পার হওয়ার পর তিনি এ ঘোষণা দেন। এদিকে ১ জুলাই পরমাণু চুক্তির আংশিক লঙ্ঘন করে ইউরেনিয়াম মজুদের ৩০০ কেজির সীমা ইরান পেরিয়েছে বলে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘোষণার পর জাতিসংঘের পরমাণু তদারক সংস্থা আইএইএ বিশেষ বৈঠকে বসার ঘোষণা দিয়েছে। খবর এএফপি ও রয়টার্সের।

ইরানের সংবাদ সংস্থা আইআরআইবিকে হাসান রুহানি জানান, ইরানের বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে চুক্তিতে অংশগ্রহণকারী দেশগুলো কোনো সুনির্দিষ্ট পথ বের করতে না পারলে ইরান নিজের ও প্রয়োজনমতো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ বলেছেন, কোনো কিছু করা লঙ্ঘন নয়, যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর ইরানের ইউরেনিয়াম মজুদের অধিকার আছে। ইরানের ইউরেনিয়াম মজুদের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার খবর প্রকাশের পর আইএইএ বলেছে, আগামী বুধবার ইন্টারন্যাশনাল এটমিক এনার্জি এজেন্সির (আইএইএ) বোর্ড অব গভর্নরস বৈঠকে বসবে। এর আগে ভিয়েনায় ইউএস মিশনের মুখপাত্র এক বিবৃতিতে বলেন, আন্তর্জাতিক সংস্থায় যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রদূত জ্যাক ওয়ালকটকে বিশেষ বৈঠকে অংশ নেয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। সংকট ও সমস্যা এড়িয়ে তেহরানের ইউরেনিয়াম মজুদ বাড়ানোর ঘোষণায় উদ্বেগ জানিয়েছে ইইউ।

একে ‘অত্যন্ত উদ্বিগ্ন’ বলে মন্তব্য করেছে দেশগুলো। ইরানবিষয়ক ইইউর প্রতিনিধির সঙ্গে জার্মানি, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের দেয়া ওই যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ইরানের এ সিদ্ধান্ত পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধের প্রধান একটি শর্তকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এ পদক্ষেপ থেকে সরে আসতে এবং চুক্তিকে খর্ব করে এমন কোনো কিছু করা থেকে বিরত থাকতে ইরানের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।’ ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধির মাত্রা বাড়ানোর প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তেহরান আগুন নিয়ে খেলছে।

পরমাণু বোমা তৈরির লক্ষ্যে যতটুকু প্রয়োজন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। আগামী রোববার থেকে সেই লক্ষ্যেই কাজ শুরু করবে দেশটির পরমাণু শক্তি কমিশন। বহুজাতিক পরমাণু চুক্তি রক্ষায় ইউরোপের ব্যর্থতার পরিপ্রেক্ষিতে এ ঘোষণা দেন রুহানি। তিনি বলেন, আমাদের যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু ইউরেনিয়ামের মজুদ বাড়াব। এর আগে ইরানের আণবিক শক্তি সংস্থার মুখপাত্র বেহরুজ কামালভান্দি জানিয়েছিলেন, এখন থেকে পরমাণু সমঝোতা অনুযায়ী ইউরেনিয়াম মজুদের সীমা মেনে চলবে না ইরান। ইরানি প্রেসিডেন্ট রুহানি বলেন, তার দেশ চুক্তির শর্ত শতভাগ মেনে চলবে, যদি যুক্তরাষ্ট্রসহ স্বাক্ষরকারী অন্য দেশগুলো চুক্তিটি শতভাগ মেনে চলে।

এদিকে ইরানের সামরিক ক্ষমতাকে যুক্তরাষ্ট্র ভয় পায় বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের ইন্টেলিজেন্স মিনিস্টার মাহামুদ আলাভি। তিনি বলেন, এর কারণ হল- ইরানকে আক্রমণের সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে আসা। এর আগে বুধবার আলাভি বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নিলে এবং আমাদের সর্বোচ্চ নেতা অনুমতি দিলে আলোচনা হতে পারে। ২০ জুন মার্কিন ড্রোন হরমুজ প্রণালিতে ভূপাতিত করার পর ট্রাম্প ইরানের বেশ কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে সামরিক হামলার ঘোষণা দিয়ে পরে তা প্রত্যাহার করে নেন। এরপর ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে খোলা আলোচনা হতে পারে। তেহরান বলেছে, চালকবিহীন গোয়েন্দা বিমান (ড্রোন) আকাশসীমা লঙ্ঘন করায় ভূমি থেকে ভূমিতে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ধ্বংস করা হয়েছে। যেখানে ওয়াশিংটন দাবি করছে তাদের ড্রোন আন্তর্জাতিক আকাশসীমায় মেনে চলাচল করছিল।
ইরানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত পরমাণু সমঝোতা থেকে ২০১৮ সালে বেরিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্র। এরপর এটির বাকি পাঁচ দেশ ও ইইউ পরমাণু সমঝোতা মেনে চলার জন্য ইরানের প্রতি আহ্বান জানায়। পাশাপাশি এ সমঝোতায় ইরানকে দেয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের আশ্বাসও দেয়া হয়। কিন্তু ইরানের দাবি, এক বছরেও সে আশ্বাস বাস্তবায়ন করেনি ইইউ। এ বছরের ৮ মে তেহরান ইউরোপী ইউনিয়নকে দুই মাসের সময়সীমা বেঁধে দিয়ে ঘোষণা করে, এ সময়ের মধ্যে আশ্বাস বাস্তবায়ন না করলে ইরান পরমাণু সমঝোতার কিছু ধারা বাস্তবায়ন স্থগিত রাখবে। রোববার ইরানের বেঁধে দেয়া ৬০ দিন শেষ হচ্ছে।