দলে নতুন সদস্য সংগ্রহ নিয়ে শুরুতেই বিতর্কে জড়িয়েছে আওয়ামী লীগ

দলে নতুন সদস্য সংগ্রহ নিয়ে শুরুতেই বিতর্কে জড়িয়েছে আওয়ামী লীগ। যুদ্ধাপরাধী ও জামায়াত পরিবারের সন্তানরা আওয়ামী লীগে যোগ দিতে পারবে- দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের এ মন্তব্যে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। তার এ মন্তব্য ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রত্যাহার ও নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানায় মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ। অন্যথায় তার পদত্যাগের দাবিতে দূর্বার আন্দোলন গড়ে তোলার ঘোষণা দেয়া হয়। অবশ্য এ ধরনের মন্তব্য করেননি বলে দাবি করেন ওবায়দুল কাদের। এদিকে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা এ ধরনের বিতর্কে ক্ষুব্ধ ও বিব্রত। তারা জানান, মীমাংসিত একটি বিষয় নিয়ে অযথা বিতর্ক তৈরি করা হয়েছে। বিতর্কের শুরু ৩০শে জুন ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন থেকে।

ওইদিন সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ওবায়দুল কাদের বলেন, যুদ্ধাপরাধী ও জামায়াত পরিবারের সন্তানরাও আওয়ামী লীগে যোগ দিতে পারবে। আওয়ামী লীগের সদস্য হওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ভূমিকা প্রাধান্য পাবে, কোন পরিবারের সন্তান সেটা বিবেচ্য বিষয় নয়-হোক সে জামায়াত কিংবা যুদ্ধাপরাধী পরিবারের সন্তান। তার মতে, স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর এসে এসব বিষয় সামনে এনে রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা হাস্যকর। তার এ বক্তব্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় দলের নেতাদের মধ্যে। নীরবে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। পরে ৪ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক সমিতি (ডুজা) কার্যালয়ে বিষয়টি নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. আ ক ম জামাল উদ্দীন। লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ ওবায়দুল কাদেরের এ ধরনের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী বক্তব্য ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে। তার এ ধরনের ঘৃণ্য বক্তব্য জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
এমনকি এ বক্তব্যে তিনি সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন। রাজাকার পরিবারের পক্ষে এ বক্তব্য দিয়ে তিনি শপথ ভঙ্গ করেছেন। তার বক্তব্য দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকিস্বরূপ। মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ মনে করে, এ বক্তব্যের ফলে তিনি সরকারে থাকার বৈধতাও হারিয়েছেন। স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতাকর্মীকে ওবায়দুল কাদেরের এ বক্তব্যের প্রতিবাদ করার জন্য ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জাতি আশা করে ওবায়দুল কাদের আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তার এ স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী বক্তব্য প্রত্যাহার করবেন, আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও দেশবাসীর কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইবেন। যদি তিনি তা না করেন তা হলে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ তার পদত্যগের দাবিতে আওয়ামী লীগের সাধারণ নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে দেশব্যাপী দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলবে। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল, সাধারণ সম্পাদক আল মামুন ও যুগ্ম আহ্বায়ক শেখ সম্রাটসহ অনেকে। একইদিন সচিবালয়ের এক অনুষ্ঠানে ওবায়দুল কাদের ওই ধরনের কোন মন্তব্য করেননি বলে জানান। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,না, এ কথা আমি বলতে পারি না। নো, আমি বলিনি। আমাদের অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কার। আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ স্বাধীনতার আদর্শ,বাংলাদেশ রাষ্ট্র জন্মের চেতনার পক্ষে। আমাদের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট। এদের (স্বাধীনতাবিরোধী) মনোনয়ন দেয়া, এদের সদস্য করা-এ ব্যাপারে দলের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর। এখানে আপোষকামিতার প্রশ্নই ওঠে না। যুদ্ধাপরাধী ও স্বাধীনতাবিরোধী পরিবারের কেউ আওয়ামী লীগের সদস্য হতে পারবেন কি না জানতে চাইলে ওবায়দুল কাদের বলেন, যুদ্ধাপরাধী পরিবার হলে সেখানে আমরা সদস্য সংগ্রহ করি না। তারা সদস্য পদ নিতে পারেন না। এটা সদস্য সংগ্রহ অভিযানের যে নীতিমালা সেখানে স্পষ্ট বলা আছে। আমি নতুন করে কোনো বক্তব্য রাখতে পারি না। এটা আমাদের পুরনো স্ট্যান্ড এবং এই স্ট্যান্ডে আমরা অটল। তিনি বলেন, সামপ্রদায়িক শক্তি যারা স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধের বিরুদ্ধে থাকা পরিবারের কেউ যদি আসতে চায় আমাদের তো প্রশ্ন থাকবেই।

এখানে আদর্শ ও মূল্যবোধের প্রশ্ন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রশ্ন এখানে আমরা আপোষ করতে পারি না। ওবায়দুল কাদের বলেন, নতুন যে সদস্য সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়েছে এর মাধ্যমে স্বাধীনতা বিরোধী কেউ আওয়ামী লীগে আসতে পারবে না। সদস্য সংগ্রহ নিয়ে এ ধরনের বিতর্ক প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান গতকাল মানবজমিনকে বলেন, এ ধরনের বিতর্ক তৈরি করা উচিত হয়নি। যুদ্ধাপরাধী ও জামায়াত পরিবারের সন্তানরা আওয়ামী লীগে যোগ দিতে পারবে-এ কথাটি আওয়ামী লীগ ওন করে না। এমনকি দলের সভাপতি শেখ হাসিনাও এর পক্ষে নন। এখানে স্পষ্ট করে বলতে চাই- যুদ্ধাপরাধী জামায়াত পরিবারের সদস্যদের জন্য আওয়ামী লীগের দরজা চিরতরের জন্য বন্ধ। এ নিয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। নতুন সদস্য সংগ্রহে এ ধরনের বিতর্ক কোন নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে কি না প্রশ্নে তিনি জানান, আমার মনে হয় না এটা কোন ধরণের প্রভাব ফেলবে। আওয়ামী লীগ পরীক্ষিত দল। যে নিয়ম ও নীতিমালা আছে সেটা অনুসরন করেই সদস্য অন্তর্ভুক্তি করা হবে। আগামী ২১ জুলাই থেকে সারাদেশে নতুন ভোটারদের বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রাথমিক সদস্য হিসেবে অন্তুর্ভুক্তির কার্যক্রম শুরু হবে। এ প্রসঙ্গে দলের দপ্তর সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ জানিয়েছেন, তরুণ সমাজকে উন্নয়নমুখী কল্যাণকর রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করার মধ্য দিয়ে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি ও তরুণ দেশকর্মী গড়ে তুলতে সাংগঠনিক এই কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।

উৎসঃ মানব জমিন