জাতীয় মুক্তি মঞ্চের ঘোষণা কর্নেল অলির

‘জাতীয় মুক্তিমঞ্চ’ নামে নতুন রাজনৈতিক মঞ্চের ঘোষণা দিয়েছেন বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলের অন্যতম শরিক লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল ড. অলি আহমেদ। গতকাল বিকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে জাতীয় সংসদের পুনঃনির্বাচন ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ ঘোষণা দেন। জাতীয় মুক্তি মঞ্চ জাতির দুরবস্থা ও জাতীয় সমস্যা সমাধানে কাজ করবে বলে জানিয়েছেন তিনি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা বিএনপির বাইরের কোন জোট নয়। এটি বেগম খালেদা জিয়ার দ্রুত মুক্তির দাবিতে একটি প্লাটফর্ম। আমার এই প্লাটফর্মে কে কে আছেন আপনারা তাদেরকে মঞ্চেই দেখতে পাচ্ছেন। আরও যারা থাকবেন আপনারা কিছুদিনের মধ্যেই দেখতে পারেন। দেশপ্রেমিক যে কেউ এই মঞ্চে আসতে পারবেন।
নতুন এই মঞ্চে জামায়াতের নেতাকর্মীরা থাকবেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের জামায়াত আর ২০১৯ সালের জামায়াত এক নয়।

তারা নিজেদের অনেক ভুল শুধরে নিয়েছে। এছাড়া, এটি কোন রাজনৈতিক জোট নয়। এখানে দেশপ্রেমিক নাগরিকদের যারা দেশ এবং সমাজের বর্তমান অবস্থার পরিবর্তন চান তারা সবাই থাকতে পারবেন। শুধু বেঈমানরা থাকতে পারবেন না। আত্মপ্রকাশের দিনে সরকারের উদ্দেশ্যে ১৮টি দাবি তুলে ধরা হয় মঞ্চের পক্ষ থেকে। দাবিগুলো হল-

গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদের পুননির্বাচন: এ দাবি তুলে ধরে মঞ্চের পক্ষ থেকে বলা হয়, গত ৩০শে ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ইতিহাসের একটি নির্মমতম রাষ্ট্রীয় প্রতারণা। সর্বকালের নিকৃষ্ট জাতীয় বেঈমানী ও প্রহসনের মাধ্যমে নির্বাচন নামের নাটক সৃষ্টি করে জনগণের ভোটের অধিকার হরণ করা হয়েছে। জনগণকে ভোটের অধিকার এবং ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। পক্ষান্তরে ৩০শে ডিসেম্বর দিনের বেলা কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। বরং ২৯শে ডিসেম্বর রাতেই ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ব্যালট পেপার কেটে ব্যালট বাক্স ভর্তি করা হয়। এই নির্বাচনে ভোটার ছিল পুলিশ ও প্রশাসনের সদস্যবৃন্দ। তাদের প্রার্থী ছিল আওয়ামী লীগের নেতা। কোন অবস্থাতেই এই নির্বাচন এবং এই নির্বাচনের ফলাফল জনগণ গ্রহণ করেনি। অতএব, জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে দেশের এবং দেশের জনগণের মঙ্গলের জন্য আমরা জাতীয় সংসদের পুননির্বাচনের জোর দাবি জানাচ্ছি।

অবিলম্বে খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তির দাবি: দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত সাজানো মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে বলা হয়, তিনি একজন প্রবীন রাজনীতিবিদ, সাবেক সেনা প্রধান, প্রেসিডেন্ট এবং মুক্তিযুদ্ধের ঘোষকের স্ত্রী। মিথ্যা মামলার নামে তাঁকে হয়রানি, সাজানো বিচারে আটক করে আর্থিক-শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করা হচ্ছে। এটি একটি গর্হিত কাজ। এতে সরকারের প্রতিশোধ পরায়ণতার প্রমাণ বিদ্যমান।

দেশবিরোধী চুক্তি প্রকাশের দাবি: বিগত দশ বছরে তথা বর্তমান অবৈধ সরকারের সময়ে যে সকল দেশবিরোধী চুক্তিতে অসম প্রটোকল স্বাক্ষরিত হয়েছে, তা জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান রক্ষার দাবি: ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য দেশের জাতীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে যে সমস্ত মেগা প্রকল্প এবং স্পর্শকাতর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিদেশীদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে, তা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।

জাতীয় বিশেষজ্ঞ কমিশন গঠনের দাবি: মঞ্চের পক্ষ থেকে বলা হয়, সাম্প্রতিককালের ভয়াবহ জাতীয় অর্থনৈতিক কেলেংকারী যথা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি, ব্যাংক ডাকাতি, শেয়ার মার্কেট লুটপাট, অর্থ পাচার ইত্যাদি অপকর্মের কারণে দেশে অর্থনৈতিক নীরব দুর্ভিক্ষ, সামাজিক বিশৃঙ্খলা, শিক্ষিত যুবকদের বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের অশনি সংকেত দেখা দিয়েছে। এই ধরনের পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে এবং ভবিষ্যতে যেন তার পুনরাবৃত্তি না হয়, তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সুপ্রিম কোর্টের নেতৃত্বে এক বা একাধিক জাতীয় বিশেষজ্ঞ কমিশন গঠন করতে হবে। কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে উক্ত সমস্যাগুলির সমাধান এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

দেশের শিক্ষিত যুবকদের নিয়োগে অগ্রাধিকারের দাবি জানিয়ে বলা হয়, দেশে শিক্ষিত যুবকদের বেকরত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বেকারত্ব হ্রাস করার লক্ষ্যে কারিগরি শিক্ষাকে আরও বেশি সম্প্রসারণ করার নিমিত্তে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এই বেকারত্ব হ্রাস করার লক্ষ্যে প্রশিক্ষিত জনশক্তি বিদেশে রপ্তানীর জন্য কুটনৈতিক ও ব্যবসায়িক পদক্ষেপ জোরদার করতে হবে। এছাড়াও দেশের ব্যবসা ও শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেশের শিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত যুবকদের নিয়োগ নিশ্চিত করার জন্য আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

গুম ও খুন বন্ধের পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানিয়ে বলা হয়, দেশের সর্বত্র চরম বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য বিরাজ করছে। এই অবস্থা কারো কাম্য নয়। ন্যায় বিচার, সুশাসন এবং সাংবিধানিক অধিকার না থাকায় জনগণ হতাশাগ্রস্থ। বর্তমান সরকারের আমলে গুম, খুন, গুপ্তহত্যা, মাদক এবং ধর্ষণ মহামারি আকার ধারণ করেছে। জনগণের সরকার ব্যতীত এই ধরনের সমস্যা থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। এই ধরণের কর্মকাণ্ড বন্ধ করার জন্য অনতিবিলম্বে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে এবং জনগণকে আশ্বস্ত করতে হবে।
ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে বলা হয় অবৈধ পন্থায় নির্বাচন অনুষ্ঠান, অনৈতিক ও নির্মম ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্রকে হত্যা করার নীল নকশা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বিরোধী দলীয় নেতা কর্মীদের বিরুদ্ধে সমগ্র দেশে দায়েরকৃত গায়েবী মামলা, মিথ্যা মামলা, ষড়যন্ত্র মূলক রাজনৈতিক মামলা, অনতিবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্থদেরকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

লিগ্যাল এইড কমিটি গঠনের ষোঘণা: জাতীয় মুক্তি মঞ্চের পক্ষ থেকে আগামী তিন মাসের মধ্যে প্রতি জেলায় ‘লিগ্যাল এইড’ কমিটি গঠন করা হবে। এই কমিটির মাধ্যমে বিরোধী দলের নেতা/কর্মীদের মামলাগুলি পরিচালনার সার্বিক দায়িত্ব বহন করা হবে।
প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি ও হয়রানী বন্ধের দাবি: বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি, তাদের স্বাভাবিক জীবন যাপনে বাধা দান এবং বিদেশ গমনের সময় বিমান বন্দরে অহেতুক হয়রানি বন্ধ করার দাবি জানানো হয় মঞ্চের পক্ষ থেকে।
স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন, ভেজাল ও নকল ঔষধ বন্ধের দাবি: দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভঙ্গুর। চিকিৎসা ব্যবস্থার উপর দেশের প্রেসিডেন্টসহ যে কেউ আস্থা রাখতে পারছে না। বিধায়, বিত্তবান প্রায় সকলেই যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড এবং ভারতে চিকিৎসার জন্য অহরহ যাতায়াত করছেন। এতে দেশের অর্থনীতিতে এবং চিকিৎসা ব্যবস্থায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থা উন্নতির লক্ষ্যে সুপরিকল্পিত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

খাদ্যে ভেজালকারীদের মৃত্যুদণ্ড দাবি: ভেজাল খাদ্য মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। নতুন আইন করে ভেজাল খাদ্য সরবরাহের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের জন্য মৃত্যুদণ্ডের ব্যবস্থা করতে হবে।
কৃষকের ন্যায্যমূল্যের দাবি: অধিক ধান ফলনের কারণে বর্তমানে কৃষকরা দুর্দশাগ্রস্থ। এই ধরণের পরিস্থিতি কারো জন্য কাম্য নয়। প্রতি বছর নিয়মিতভাবে সরকারের পক্ষ থেকে ধান সংগ্রহ করার লক্ষ্য মাত্রা নির্ধারণ এবং কৃষককে ন্যায্য মূল্য প্রদানের লক্ষ্যে ধানের উপযুক্ত মূল্য নির্ধারণ করতে হবে।

অর্থনৈতিক সমতা ও সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার দাবি: জনগণের আয় ও ব্যয়ের সঙ্গে কোনো সামঞ্জস্য না থাকায় সমাজ ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে। সর্বত্র সামাজিক অবক্ষয় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নিম্নমধ্যবিত্ত এবং গরীবদের মধ্যে নীরব দুর্ভিক্ষ চলছে। এই ধরণের সোনার বাংলার জন্য জাতি মুক্তিযুদ্ধ করেনি। সমাজে অর্থনৈতিক সমতা এবং সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সঠিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

জাল ভোট প্রদানকারী ও সাহায্যকারীদের শাস্তির দাবি জানিয়ে বলা হয়, জাল ভোট প্রদান বা প্রদানকারীদের সাহায্য করার সঙ্গে যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত তাদের জন্য ন্যূনতম ১০ বছর সশ্রম কারাদন্ডের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট বাতিলের দাবি ও বন্ধ করে দেয়া মিডিয়া খুলে দেয়ার দাবি জানিয়ে বলা হয়, ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে সংসদে পাশকৃত ‘ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট ২০১৮’ কালো আইন হিসেবে বাতিল করতে হবে। এই আইনের মাধ্যমে জনগণের কণ্ঠ রোধ করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মাধ্যমে যে সকল সংবাদপত্র, টেলিভিশন এবং জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, তা অবিলম্বে খুলে দিতে হবে।

দুর্নীতি দমন আইনের বৈষম্য দূরীকরণের দাবি জানিয়ে বলা হয়, বর্তমান দুর্নীতি দমন আইনে দারুণ বৈষম্য রয়েছে। এই আইন শুধু অসহায় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হচ্ছে। আমরা মনে করি, প্রধানমন্ত্রীসহ সকল নাগরিকের বিরুদ্ধে দুদক স্বাধীনভাবে প্রয়োজনে তদন্ত করতে পারবে ও মামলা করতে পারবে। এই ধরণের বিধান রেখে আইন সংশোধন করতে হবে। দেশের সকল নাগরিকের জন্য আইন সমানভাবে প্রযোজ্য হতে হবে।

রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য সাংবিধান অনুযায়ী সুযোগ সৃস্টির দাবি জানিয়ে বলা হয়, প্রত্যেক রাজনৈতিক দলকে সাংবিধানিক পন্থায়, বিনা বাধায় নিজ নিজ দলের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে দিতে হবে। শান্তিপূর্ণ মিছিল ও জনসভা করার সুযোগ দিতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন- কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহীম বীর প্রতীক, জাগপার সভাপতি ব্যারিস্টার তাসমিয়া প্রধান, খেলাফত মসলিসের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব আহম্মেদ আলী তাহেরী, ডেমোক্রেটিক ন্যাশনাল মুভমেন্টের মহাসচিব মুহিব খান, এলডিপির সাধারণ সম্পাদক রেদোয়ান আহম্মেদ, যুগ্ম মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম, গত নির্বাচনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী গোলাম মাওলা রনি প্রমুখ। এর আগে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য মুক্তিযোদ্ধা ইসমাঈল হোসেন বেঈল অলি আহমেদের হাতে ফুল দিয়ে এলডিপিতে যোগদান করেন।