‘সিরাজুল আলম খান (দাদা-ভাই)’- শুধু একটি নাম নয়, উনি একটি ‘ইন্সটিটিউশন’:বারিষ্টার ফারাহ খান

জনাব ‘সিরাজুল আলম খান (দাদা-ভাই)’- শুধু একটি নাম নয়, উনি একটি ‘ইন্সটিটিউশন’। আমাদের সশস্ত্র যুদ্ধের প্রধান সংগঠক ও স্বাধীন বাংলার রুপকার জনাব সিরাজুল আলম খান। তিনি কখনো হুকুম দিয়ে কিংবা জোর খাটিয়ে নয় বরং কাছে টেনে অনুপ্রেরনা দিয়ে এক এক করে হাজার হাজার মানুষ’কে আমাদের সশস্ত্র যুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করেছিলেন। যেই যুবক বয়সে যখন একটি ছেলে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে বেড়ায়, প্রেম করে প্রেমিকার হাতে হাত রেখে ঘুরে বেড়ায়, প্রেমিকার সাথে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখে, নিজের জীবন গড়ার স্বপ্ন দেখে, সেই সোনালী দিনগুলোতে জনাব সিরাজুল আলম খানের একমাত্র লক্ষ ছিল তাঁর মাতৃভূমি’কে পাকিস্তান থেকে মুক্ত করে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করা। ছেলে মেয়ের মধ্যে বিভেদ না করে, ছাত্র, শ্রমিক সাধারণ মানুষ সবাই’কে এক করে বাংলাদেশ’কে স্বাধীন করাই ছিল তাঁর ধ্যানে জ্ঞানে, এটাই ছিল যেন তাঁর বেঁচে থাকার একমাত্র উদ্দেশ্য। প্রায় সকল নেতাই চায় নিজের নাম হোক, জনগণ তাকে চিনুক আর নেতা হিসেবে হুজুর-হুজুর করুক, কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন একমাত্র নেতা শুধুমাত্র মনে হয় জনাব সিরাজুল আলম খানই যিনি সব সময়ই পর্দার আড়াল থেকেই কাজ করে গেছেন প্রচন্ড সাহসের সাথে। উনিই মনে হয় বাংলাদেশের ইতিহাসে একমাত্র উজ্জল নক্ষত্র যিনি কিনা সব সময়ই কাজ করে গেছেন অত্যন্ত প্রচার বিমুখ ভাবে।

আশে পাশে যা দেখছি তাতে আমি মোটামুটি নিশ্চিত বাংলাদেশে এখন হাতে গোনা দুই/চারজন রাজনীতিবিদ ছাড়া অন্য সবাই কোন না কোন ভাবে জনাব সিরাজুল আলম খানের বয়সে ছোট না হলেও রাজনৈতিক জ্ঞানে তাঁর শিষ্য তো বটেই। জনাব সিরাজুল আলম খান এমন একজন ব্যক্তি যিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতায় কে কি করেছেন এবং কার কি ভূমিকা ছিল তার সবই তাঁর নখদর্পনে। তাই ইতিহাসের বিন্দু থেকে সিন্দু জানা, আনাচে-কানাচে সব জানা এমন একজন ব্যক্তিকে আমাদের ‘ক্ষমতা ভিক্ষুক’ ‘স্বার্থ লোভী’ বর্তমান অধিকাংশ রাজনৈতিক নেতাদের সহ্য হওয়ার কথা নয়।

জনাব সিরাজুল আলম খান যতক্ষন ‘চুপ’ থাকবে ততক্ষনই আমাদের নতুন প্রজন্মের সাথে মিথ্যা বলে, নিজেদের মিথ্যা ত্যাগের গল্প শুনিয়ে আমাদের বাংলা মা’কে লুটে-পুটে খেতে সুবিধা হবে এই অসৎ সব রাজনৈতিক নেতাদের। আর জনাব সিরাজুল আলম খানের মুখ থেকে কথা বের হওয়া মানেই সত্য বেড়িয়ে আশা এবং এই প্রতারক স্বার্থ লোভী রাজনীতিবিদ’দের মুখোশ খুলে যাওয়া! কে কত বড় নেতা ছিলেন, বাস্তবে কার কেমন চিন্তা ছিল, কার আচরণ কি ছিল এবং পাক সেনাদের কাছ থেকে আমাদের দেশ স্বাধীন করা নিয়ে সত্যিকারে কার ভূমিকা কি ছিল তার সবই বেড়িয়ে আসবে। কারণ এই মুখোশধারী নেতাদের ভয় একটাই, জনাব সিরাজুল আলম খান যখন বলবেন তখন সব সত্যিই বলবেন কারন উনি উনার সারা জীবনে ক্ষমতা কিংবা টাকার লোভ তো দূরের কথা সত্যে এবং সৎ পথে থাকার বিনিময়ে নিজের জীবনের তোয়াক্কা পর্যন্ত করেননি। সুতরাং উনার মুখ খুলে গেলে আগুনের শিখার মত অনবরত অপ্রিয় সত্য বেড়িয়ে আসবে যা তাদের কারো জন্যই শুভকর হবে না।

বলা বাহুল্য, আমরা বর্তমানে দেখেছি তাই হয়েছে। জনাব সিরাজুল আলম খানের ভাষ্যে লেখা একটি বই “আমি সিরাজুল আলম খান: একটি রাজনৈতিক জীবনালেখ্য” হঠাৎ বইটির প্রকাশক বইটি বাজার থেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে। কোন যৌক্তিক ব্যাখ্যা কিংবা বিশ্বাস যোগ্য কারণ না দিয়েই শুধুমাত্র কয়েক লাইনের একটি সাদামাটা প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে প্রকাশক জানিয়েছেন, “….আমাদের প্রকাশিত শামসুদ্দিন পেয়ারা অনুলিখনকৃত ‘আমি সিরাজুল আলম খান : একটি রাজনৈতিক জীবনালেখ্য’ বইটি নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হওয়াতে আমরা বইটি বাজার থেকে প্রত্যাহার করে নিচ্ছি।”

আমি মনে করি মোটামুটি শিক্ষিত, কিছুটা বিবেকবান এবং বর্তমান বাংলাদেশ নিয়ে অল্প ধারণা সম্পন্ন যে কেউ বুঝতে পারবে জনাব সিরাজুল আলম খানের মত এমন একজন বর্ষীয়ান প্রবীণ দক্ষ রাজনৈতিক নেতার বই কেন প্রতাহার হতে পারে। সত্যিই কি শুধুমাত্র “বিতর্ক সৃষ্টি হওয়াতে” প্রকাশক বইটি প্রত্যাহার করেছে! আচ্ছা বলুন তো, আপনাদের কি মনে হয় আমরা সাধারণ জনগণ কিছুই বুঝিনা? বলুন তো, আমাদের’কে কেন এত বোকা মনে করেন? কেন মনে করেন শুধু আপনাদের বুদ্ধির স্থান মাথা আর আমাদের বুদ্ধির স্থান পায়ের নিচে! শোনেন, আমাদের চিন্তা- চেতনা বুদ্ধি কোনটিই হারিয়ে যাইনি, যদি কিছু হারিয়ে যেয়েই থাকে তবে তা হলো আপনাদের সৎ-সাহস, আপনাদের মনুষ্যত্ব এবং আপনাদের লজ্জা!!

আসল কথা হলো ‘আমি সিরাজুল আলম খান : একটি রাজনৈতিক জীবনালেখ্য’ বইটিতে অনেক অপ্রত্যাশিত ঘটনা প্রকাশিত হয়েছে যা সশস্ত্র যুদ্ধের ৫০তম বার্ষিকী সামনে রেখে প্রকাশ পাওয়াটা অত্যন্ত লজ্জার এবং ক্ষতিকারক বর্তমান সময়ে মহান স্বাধীনতা নিয়ে মিথ্যা গর্ব করা রাজনীতিবিদদের জন্য। এদের সবার জন্য জনাব সিরাজুল আলম খানের নির্ভয়ে সত্যি উন্মোচন করাটা কাল হয়ে দাড়িয়েছে এবং এই বিশাল নেতা এখন এদের সবার জন্য একটি অভিশাপ হয়ে দাড়িয়েছেন।

মনে রেখেন, মানুষের স্বাধীনতা নষ্ট করে, মানুষ’কে ভয় দেখিয়ে কিছুদিন রাজত্ব করা গেলেও মানুষের অধিকার হরণ করলে মানুষ আজ হোক আর কাল হোক প্রতিবাদী হয়ে উঠবেই। এটাই পৃথিবীর নিয়ম, এটাই বাস্তবতা। বিশেষ করে আমাদের নতুন প্রজন্ম’কে ‘নিয়ন্ত্রণ’ করতে চাওয়াটা বোকামি ছাড়া আর কিছুই না। ভয় ভীতি দেখিয়ে বই প্রত্যাহার করানোর কোন দরকার ছিল না, বরং আমাদের কে পড়তে দিতেন আমরা পড়ে আমাদের জ্ঞান-বুদ্ধি-যুক্তিবিদ্যা দিয়ে বের করতাম জনাব সিরাজুল আলম খানের বইটিতে কতটুকু যুক্তিকতা আছে কিংবা ইতিহাস বিকৃতি হয়েছে। এখন তো বরং মানুষের আগ্রাহ দ্বিগুন নয় আমি তো বলবো দশগুন বেড়ে গেছে এই বইটি নিয়ে। শুধু তাই নয় আপনাদের কল্যাণে তো দেখা যাচ্ছে এখন জনাব সিরাজুল আলম খানের আরো ‘সাপে বর’ হয়ে গেল, নতুন প্রজন্মের যারা জনাব সিরাজুল আলম খান (দাদা-ভাই) কে চিনতো না এখন তো তারাও উনা’কে খুঁজছে আর আগ্রহ সহকারে জানতে চাচ্ছে কে এই ‘সিরাজুল আলম খান’ এবং তাদের মুখে মুখেও এখন উনার নাম অগণিত বার উচ্চারিত হচ্ছে। নিশ্চয়ই আপনারা আপনাদের দুঃস্বপ্নেও এমনটি চাননি। একেই বুঝি বলে “রাখে আল্লাহ মারে কে”!!!


লেখক:বারিষ্টার ফারাহ খান