বাজেট বাস্তবায়ন যোগ্য নয়

২০১৯-২০ বাজেটে আয় ও ব্যয়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেই। ফলে রাজস্ব আদায়, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি ও অন্যসব বিষয়ের কোনোটিই বাস্তবায়নযোগ্য নয়।

অর্থনীতিতে অন্যতম সমস্যা বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়ানো। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে সেদিকে কোনো দিকনির্দেশনা নেই। এক্ষেত্রে ইজ অব ডুইং বিজনেস (সহজে ব্যবসা করার সূচক) অগ্রগতি ও সুশাসন কীভাবে নিশ্চিত হবে, সে বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ দেখিনি।

বিনিয়োগ বাড়াতে যে ধরনের সংস্কার এবং উৎসাহমূলক পদক্ষেপ দরকার, এবারের বাজেটে তা-ও নেই। ফলে বিনিয়োগ বাড়বে বলে আমি মনে করি না। বছর শেষে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধিতেও এর প্রভাব পড়বে।

বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম একটি সমস্যা হল দরিদ্রতা। আর এ দারিদ্র্যবিমোচনের বার্ষিক গড় হার কমছে। এক্ষেত্রে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এ সমস্যা সমাধানে বাজেটে কার্যকর পদক্ষেপ আশা করেছিলাম।

কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। অন্যদিকে বাংলাদেশের মতো অর্থনীতির জন্য সামাজিক নিরাপত্তা একটি অন্যতম ইস্যু। কিন্তু এবারের বাজেট এবং জিডিপির আনুপাতিক হারে তা বাড়েনি। এটি একটি অনাকাক্সিক্ষত বিষয়।

সহজে বললে, এবারের বাজেটেরও প্রতিশ্রুতি রাজনৈতিক। অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে দূরত্ব অনেক। দুর্বল অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর ঘোষিত হয়েছে বাজেট। ফলে এ বাজেট বাস্তবায়নযোগ্য নয়। সংশোধিত বাজেটে অনেক কিছু কমাতে হবে।

বাজেটের খারাপ দিক হল- প্রতিবছরই মানুষকে দেখাতে অনেক বড় বাজেট দেয়া হয়। উন্নয়ন বাজেট বিশাল আকারের হয়ে থাকে। কিন্তু বছর শেষে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা কমানো হয়। এটি যৌক্তিক নয়।

বাজেটে রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৩ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু চলতি বছরের সংশোধিত বাজেটে এ লক্ষ্যমাত্রা ৩ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা। এটি একেবারে অসম্ভব।

চলতি বছরের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করলে দেখা যাবে অর্থনীতির উল্লেখযোগ্য সূচকের মধ্যে বেশির ভাগ সূচক নিুমুখী। বিশেষ করে রাজস্ব আয়ে প্রবৃদ্ধি কমছে।

জিডিপি প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা ৮ দশমিক ২ শতাংশ ধরা হয়েছে। এ হারে প্রবৃদ্ধির জন্য জিডিপির ৩৫ শতাংশ বিনিয়োগ দরকার। কিন্তু এ পরিমাণ বিনিয়োগ সম্ভব নয়। এ বছর ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথা বলা হচ্ছে। এটা প্রশ্নবিদ্ধ।

এর প্রথম যুক্তি- জিডিপি বাড়লে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধির কথা; কিন্তু রাজস্ব আয় বাড়েনি। দ্বিতীয়- বিনিয়োগ বৃদ্ধি। জিডিপির আনুপাতিক হারে বিনিয়োগ বাড়েনি। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বাজেটে দুই লাখ দুই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের কথা বলা হয়েছে। এটি বাস্তবায়নের জন্য যে ধরনের প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা দরকার, এ মুহূর্তে সরকারের তা নেই।

সামগ্রিক অর্থনীতির আলোকে বাজেটের চ্যালেঞ্জ হল বিনিয়োগ বাড়ানো। দেশের মোট বিনিয়োগের ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ আসে বেসরকারি খাত থেকে। কিন্তু বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে।

আগামী অর্থবছরে বিনিয়োগ বাড়ানো সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এক্ষেত্রে সবার আগে অবকাঠামো দুর্বলতা দূর করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিবেশ বিনিয়োগবান্ধব করতে হবে।

এটি বলার কারণ হল, আপাতত রাজনীতিতে অস্থিরতা নেই। তবে যে কোনো সময় অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে- মানুষের মধ্যে এমন শঙ্কা রয়েছে। এর সঙ্গে নতুন করে যোগ হয়েছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির খারাপ অবস্থা। এ অবস্থায় বিনিয়োগকারীরা আস্থার সংকটে রয়েছে। ফলে নতুন করে বিনিয়োগ হচ্ছে না।

লেখক : সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা