শায়েস্তাগঞ্জে খোয়াই ও সুতাং নদীর বাঁধ হুমকির মুখে

শায়েস্তাগঞ্জের খোয়াই ও সুতাং নদী থেকে ড্রেজার মশিন দিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে হুমকির মুখে পড়েছে তিনটি ব্রিজ। কয়েকদিনের বৃষ্টিতে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সরকারদলীয় প্রভাবশালী কতিপয় লোক সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে জোরর্পূবক বালু উত্তোলন করছে। এতে একদিকে যেমন সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব গচ্ছা যাচ্ছে, অন্যদিকে শুকনো মৌসুমে ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর তীরবর্তী এলাকায় সাধারণ মানুষের ফসলি জমি, ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

এসব বালুমহাল থেকে প্রতিবছর অর্ধকোটি টাকা আয়ের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বে স্থানীয় প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাদের কারণে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।

পরিবেশের ভারসাম্য নষ্টসহ জেলা ও থানার সরকারী অবকাঠামো ধংসের পাশাপাশি বালু সরবরাহের কারণে গ্রামীন সড়ক পথ খানাখন্দের সৃষ্টির হয়ে সাধারণের চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বর্ষা মৌসুমে অসহনীয় দুর্ভোগ পোহাচ্ছে এলাকাবাসী। প্রতিদিনই খোয়াই বাঁধের নতুন নতুন স্থানে বাঁশের বেড়া বেঁধে দখল করে ভূমিহীনদের কাছে বিক্রি করে বিপুল অর্থ আয় করছে প্রভাবশালী মহল।

এসব ভূমি ক্রয় করে বাঁধের দুই তীরে গড়ে তোলা হচ্ছে অবৈধ বসতি।
নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ দখলের প্রতিযোগিতায় সহযোগিতা করছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চুনারুঘাট থেকে হবিগঞ্জ পর্যন্ত নদীর প্রায় অর্ধশত স্থান থেকে ট্রাক-ট্রাক্টর দিয়ে অবাধে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। খোয়াই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের কিনারা থেকে শুরু করে ব্রীজের কিনারা পর্যন্ত কোন কিছুই তোয়াক্কা করছে না এ মহলটি। এসব স্থানে ট্রাক-ট্রাক্টর উঠা নামা করার জন্য প্রতিরক্ষা বাঁধ কেটে তৈরী করা হয়েছে রাস্তা। ফলে প্রতিরক্ষা বাঁধের দুই তীরে শতাধিক স্পট মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।

প্রতিবছর বর্ষায় বাঁধ ভেঙ্গে তলিয়ে যায় হাজার হাজার একর ফসলি জমি। আগামী বর্ষায় জেলা শহর রক্ষা বাঁধসহ দুই তীরের অসংখ্য স্থানে ভাঙ্গনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ ভাঙ্গা বাঁধ সংস্কারের নামে প্রতি বছর লাখ লাখ টাকা লোটপাট হয়।

কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। কোন সরকারের আমলেই খোয়াই প্রতিরক্ষা বাঁধের কাঙ্খিত উন্নয়ন হয়নি। খোয়াই নদীর উৎপত্তিস্থল ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে। ভৌগলিক কারণে নদীটি ভারত সীমান্ত অতিক্রম করে চুনারুঘাট উপজেলা হয়ে জেলা সদর হবিগঞ্জের ওপর দিয়ে চলে গিয়ে বানিয়াচং লাখাই উপজেলা ছাড়িয়ে যুগযুগ ধরে খর¯্রােতা এ নদীটি হবিগঞ্জবাসির দুঃখে পরিণত হয়েছে। বর্ষাকালে সীমান্তের ওপার থেকে পাহাড়ি ঢল নেমে এসে খোয়াই রুদ্রমূর্তি ধারন করে।

কোথাও বাঁধ উপচে আবার কোথাও বাঁধ ভেঙ্গে তলিয়ে নেয় মানুষের সব সহায় সম্বল। আর গ্রীস্মে তলদেশ শুকিয়ে নদীটি পরিণত হয় মরা খালে। এ অবস্থায় খোয়াইয়ের ধংস লীলা এর বিরূপ প্রভাব থেকে নদীর দুই তীরের বিস্তীর্ন এলাকার ফসল এবং জানমাল রক্ষায় ১৯৬৯ সালে তৎকালীর সরকার একটি প্রকল্প প্রণয়ন করে। সে সময় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ খোয়াই নদীর স্থায়ী সমস্যা সমাধানের জন্য ৩৯ কোটি ৪১ লাখ ২৫ হাজার টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেয়।

প্রকল্প পরিকল্পনায় খোয়াই নদীর উভয় তীরে ৭৮ মাইল প্রতিরক্ষা বাধ, ৬টি স্থানে প্রতিরক্ষা দেয়াল নির্মান, ৬টি স্থানে নদীর বাঁক কেটে সোজা করা এবং আড়াআড়ি বাধ নির্মাণ, আখাউড়া-সিলেট রেলওয়ে সেকশনের শায়েস্তাগঞ্জে খোয়াই নদীর উপর রেল সেতু পুননির্মাণ, দুইটি পাইপ নির্গমন প্রণালী ও পাম্প স্টেশন স্থাপন, ৬৫ মাইল জুড়ে পানি নির্গমণ ব্যবস্থা নদীর গতিপথ পরিবর্তন প্লানিং প্লান্ট এবং ৩৭ মাইল সেচ পয়:নালী অন্তর্ভূক্ত করা হয়।

বন্যার কবল থেকে ফসলি জমি ও শহর রক্ষা এবং সেচ সুবিধা বৃদ্ধি করা ছিল প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য। এরপর থেকে কয়েক দফায় প্রায় ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। তবে ৪৩ বছরেও প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হয়নি। নদীর দুই তীরের ভুক্তভোগীরা জানান, অপরিকল্পিতভাবে নদীর প্রকল্পটি করানোর ফলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের পরও সুফল মিলছে না।

প্রকল্প বাস্তবায়নে নিয়োজিতদের বিরুদ্ধে ব্যাপক নানাবিধ অনিয়ম-দুর্নিতির অভিযোগ আনেন তারা। এদিকে শুষ্ক মৌসুমের শুরুতেই খর¯্রােতা খোয়াই পরিণত হয় মরা খালে। বিভিন্নস্থানে নদীতে চর জেগে ধু-ধু বালুচরে পরিণত হয়। ফলে সেচ কাজে মারাত্মক প্রতিবন্ধিকতা সৃষ্টি হয় অথচ এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে বন্যার কবল থেকে রক্ষা পাবে অর্ধশতাধিক হেক্টর জমির ফসল।

সরজমিনে বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখা গেছে, চুনারুঘাট উপজেলার বাল্লা থেকে জেলা সদর হবিগঞ্জ পর্যন্ত খোয়াই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধে অসংখ্য স্থান হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। বেশ কিছু স্থানে নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ নেই। বাঁধের বেশকিছু স্থান দুর্বল। এদিকে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের নতুন ব্রীজ পুরান ব্রীজ সিলেট-আখাউরা রেলপথের শায়েস্তাগঞ্জ রেল ব্রীজের মধ্যস্থান থেকে প্রতিদিন প্রায় ২৫-৩০ টি ছোট ড্রেজার মেশিন দিয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতারা দীর্ঘদিন ধরে বালু উত্তোলন করে আসছেন।

এ ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে শায়েস্তাগঞ্জ ইউনিয়নের ভূমি উপ-সহকারী মো. রেজাউল করিম বাদী হয়ে সদর থানায় সাত জনের নাম উল্লেখ সহ ৩০ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা করে এখন পর্যন্ত মামলার কোন উদ্দ্যোগ নেয়া হয়নি। মামলায় সরকারী নীতিমালা উপেক্ষা করে সংঘবদ্ধ চক্র বালূ পাচার চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়। মামলা হলেও এখন পর্যন্ত পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। তারা নির্বিঘেœ চালাচ্ছে বালূ উত্তোলন মহোৎসব।