বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন:জাপাতে মনোনয়ন বানিজ‍্য কোটি কোটি টাকা

একাদশ জাতীয় সংসদে জাতীয় পার্টির (জাপা) মনোনয়নে সংরক্ষিত আসনে চারজন নারী এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। মনোনয়ন দেওয়ার আগে এদের প্রতিজন দলীয় তহবিলে ৫ কোটি করে টাকা দেবেন এই মর্মে তিন’শ টাকার ষ্টামে অঙ্গীকার নিয়েছে দলটি। চুক্তি অনুযায়ী তিনজন টাকা পরিশোধ করলেও একজন তা করেননি। ফলে তাকে দল থেকে কেন বহিস্কার করা হবে না তা জানতে কারণ দর্শানো নোটিশ দেয়া দিয়েছে জাপা। এনিয়ে দলটির অভ্যন্তরে তোলপাড় শুরু হয়েছে।

জাপা মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা এমপি বলেছেন, পার্টির চেয়ারম্যান আমাকে বলেছেন ১০ দিনের মধ্যে ওনাকে দল থেকে বহিষ্কার করে দিতে। বহিষ্কার করলে আমরা নির্বাচন কমিশনে (ইসিতে) চিঠি দিয়ে দেব, যেন ওনার সংসদ সদস্য পদ খারিজ করা হয়।

দৈনিক ইত্তেফাক জানায়, সংরক্ষিত মহিলা আসনে লিখিত চুক্তি করে জাপা মনোনয়ন দেওয়ার ঘটনা নিয়ে দলটির নেতাকর্মীরা বিব্রত, ক্ষুব্ধ। দলটির চারজন প্রেসিডিয়াম সদস্য বলেছেন, এই ধরনের ঘটনা নজিরবিহীন। মনোনয়ন বাণিজ্য কম-বেশি অনেক রাজনৈতিক দলেই হয়ে থাকে, কিন্তু এভাবে লিখিত দলিল করে শর্ত সাপেক্ষে মনোনয়ন দেওয়ার ঘটনা রাজনৈতিক দল ও রাজনীতিবিদদের জন্য লজ্জার। লিখিত অঙ্গীকার পূরণ না করায় সংরক্ষিত মহিলা আসনের সদস্য প্রফেসর মাসুদা এম রশীদ চৌধুরীকে শোকজ করা এবং অঙ্গীকার পূরণ না করলে তাকে দল থেকে বহিস্কারের হুমকির ঘটনা রাজনীতির জন্য কলঙ্কের।

জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য ও ঢাকা-৬ আসনের দলীয় সংসদ সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, যখন সংরক্ষিত মহিলা আসনে মনোনয়ন দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছিল, তখন আমি ছিলাম সৌদিআরবে। সেখান থেকে দলের তৎকালীন কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদের ও মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গাকে ফোন করে বলেছিলাম- আমি পাঁচ কোটি টাকা দেব, আমার মেয়েকে মনোনয়ন দিন। বলেছিলাম- স্যার (এইচএম এরশাদ) অসুস্থ, দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়টি দলের নামে নেই। যে চারজনকে মনোনয়ন দেওয়া হবে প্রত্যেকের কাছ থেকে পাঁচ কোটি করে ২০ কোটি টাকা দিয়ে সেটি পার্টির নামে দলিল করে সেখানে ‘এরশাদ ভবন’ নির্মাণ করার উদ্যোগ নিন। তারা দুজন আমাকে বলেছিলেন-ঠিক আছে। আমি এটাও বলেছিলাম, টাকাটা দলের ব্যাংক তহবিলে আমরা জমা দেব। দেশে ফিরেও তাদের দু’জনকে আমি একই কথা বলি। বলেছিলাম, পাঁচ কোটি টাকার কমে কিন্তু কাউকে মনোনয়ন দেওয়া যাবে না। আমার মেয়ে মনোনয়ন পেতে সাক্ষাতকারও দিয়েছিল। কিন্তু তাকে শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। সেই কারণে আমি ধরে নিয়েছি, হয়তো আরও বেশি টাকার প্রার্থী পাওয়া গেছে বিধায় আমার মেয়ে মনোনয়ন পায়নি।

বর্তমান সংসদে সংরক্ষিত মহিলা আসনে জাপার আরেক এমপি অধ্যাপিকা রওশন আরা মান্নান বলেন, লিখিত অঙ্গীকারে কী আছে কী নেই, সেটা বিষয় নয়। আমার সঙ্গে দলের যেই অঙ্গীকার ছিল আমি সেটা পূরণ করে দিয়েছি।

এদিকে, জাপা মহাসচিব ও সংসদের বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ মসিউর রহমান রাঙ্গা বলেছেন, জাপার ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করতেই দলীয় চিঠিটি নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। একটি গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই ভুল বোঝানো হয়েছে। তাছাড়া ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জি এম কাদের এমপির নেতৃত্বে আট সদস্য বিশিষ্ট কমিটি সবকিছু নির্ধারণ করেছে, যেখানে গোপন চুক্তির কোনো অবকাশ নেই। রাঙ্গা আরও বলেন, মাসুদা এম রশীদ চৌধুরী প্রায় দুই বছর ধরে জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবে নির্ধারিত দলীয় চাঁদা পরিশোধ করছেন না। পার্টিকে শক্তিশালী করতে তার নির্বাচনী এলাকার অফিস ভাড়া পরিশোধ করার কথা রয়েছে, যা তিনি এখনো পরিশোধ করেননি। এসব কারণেই পার্টি চেয়ারম্যানের নির্দেশে তাকে গঠনতন্ত্র মোতাবেক নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

মাসুদা রশীদ চৌধুরীকে গত ২০ মে সংসদ সদস্য (সংরক্ষিত) হওয়ার পর অঙ্গীকার ভঙ্গের নোটিশে স্বাক্ষর করেছেন রাঙ্গা। তিনি লিখেছেন, পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নির্দেশে আপনাকে জানাচ্ছি, একাদশ জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত মহিলা আসন নির্বাচনে জাতীয় পার্টির শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দের ফোরামে কিছু শর্ত সাপেক্ষে আপনাকে মনোনয়ন প্রদান করা হয়। যার কপি জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে সংরক্ষিত আছে। আপনার স্বাক্ষরিত পার্টি সংক্রান্ত অঙ্গীকারপত্রও আছে।

মশিউর রহমান রাঙা বলেন, সংরক্ষিত আসনে মহিলা এমপি হিসেবে যারা মনোনয়ন পেয়েছেন, তাদের কারো কারো সঙ্গে নির্বাচনের আগে দলের কিছু ছোটখাটো কমিটমেন্ট ছিল। বিষয়টি স্যার (এরশাদ), জি এম কাদের এবং ওই মনোনয়নের সঙ্গে আমরা যেই আটজন দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলাম সবাই জানেন।

তিনি বলেন, মাসুদা এম রশীদ চৌধুরী এমপি হওয়ার পর অঙ্গীকার রাখেননি। এখন ঈদের সময়। নানা খরচ রয়েছে। স্টাফদেও বোনাস দিতে হবে। দিতে পারছি না। স্যার আগে এই খরচ চালাতেন তিনি তো এখন আর পারছেন না। তাকে কয়েক বার মুখে বলছি কিন্তু টাকা দেননি। এবিষয় আমি স্যারের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি উনাকে নোটিশ দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবে মাসে ৫ হাজার টাকা করে যে পার্টির চাঁদা সেটিও তিনি দিচ্ছেন না। নির্বাচনের আগে একটা ফান্ট ক্রিয়েট করার কথা ছিলো, সেই টাকায় দল চলবে। সেখাসে অন্য সবাই ঠিক থাকলেও তিনি কোন টাকা দেননি।

এবিষয়ে বিবিসি’কে জিএম কাদের বলেছেন, এমপি হওয়ার জন্য কোনো শর্ত দেওয়া বা এ ধরনের বিষয় উল্লেখ করে চিঠি দেওয়ার বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। কেউ যদি এ ধরনের শর্তযুক্ত চিঠি দিয়ে থাকে আর কেউ যদি সেটি গ্রহণ করে সেটি তাদের বিষয়। এখানে জাপার কোনো দায় নেই। কারণ আইন বহির্ভূত কোনো প্রক্রিয়া আমাদের দল অনুসরণ করে না। জিএম কাদের এটাও বলেছেন, নেতাকর্মীদের মাসিক ফি প্রদানের বিষয়ে একটি চিঠির কথা আমি শুনেছি। তবে এতে অন্য কোনো বিষয় ছিল কি-না সেটি আমি জানি না।

এব্যাপারে মসিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, নোটিশের কোথাও আমি বলিনি যে, আমার সঙ্গে ব্যক্তিগত কোনো দেনাপাওনা আছে। এখানে আমার ব্যক্তিগত কিছু নেই। আটজনের কমিটিই সবকিছু করেছে। দলের চেয়ারম্যানের নির্দেশেই আমি মাসুদা এম রশীদ চৌধুরীকে নোটিশ দিয়েছি। কাজেই এখন একা আমার ঘাড়ে দায় চাপানোর কোনো সুযোগ নেই।
সূত্র:আমাদের সময়.কম