এবারের ঈদ রাজশাহীতে : সা কা ম আনিছুর রহমান খান

ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের বার্ষিক উৎসব ঈদুল ফিতর ।

পৃথিবীর সকল ধর্মাবলম্বীদের জন্য রোজা রাখার নির্দেশনা রয়েছে। ধর্মভেদে এর নামকরণ ও প্রতিপালন পদ্ধতি পৃথক। মুসলমানদের জন্য রমজান মাসে রোজা পালন ফরজ। পবিত্র কোরান শরীফে বলা হয়েছে: ‘ ১৮৩। হে বিশ্বাষস্থাপনকারীগণ , তোমাদের উপর রোজাবিধিবদ্ধ হইল—যেরূপ তোমাদের পূর্ববর্তীগণের জন্য বিধিবদ্ধ হইয়াছিল—যেন তোমরা সংযত হও। ১৮৪। উহা নির্ধারিত কয়েক দিবস ; কিন্তু তোমাদের মধ্যে যে কেহ পীড়িত বা প্রবাসী হয়—তাহার জন্য অপর কোন দিবস হইতে গণনা করিবে এবং যাহারা উহাতে অক্ষম তাহারা তদ্পরিবর্তে একজন দরিদ্রকে ভোজ্য দান করিবে; অতএব যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় সৎকর্ম করে তাহার জন্য কল্যাণ; এবং তোমরা যদি বুঝিয়া থাক তবে রোজা রাখাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর। ১৮৫।

রমজান মাস—যাহার মধ্যে মানব কুলের পথপ্রদর্শক এবং সুপথের উজ্জ্বল নিদর্শন ও প্রভেদকারী কোরান অবতারিত হইয়াছে ; অতএব তোমাদের মধ্যে যে-ব্যক্তি সেই মাস প্রত্যক্ষ করে—সে যেন রোজা রাখে; এবং যে ব্যক্তি পীড়িত বা প্রবাসী—তাহার জন্য অপর কোন দিবস হইতে গণনা করিবে; আল্লাহ তোমাদের পক্ষে যাহা সুসাধ্য তাহাই ইচ্ছা করেন ও তোমাদের পক্ষে যাহা দুঃসাধ্য তাহা ইচ্ছা করেন না; এবং যেন তোমরা নির্ধারিত সংখ্যাপূরণ কর ও তোমাদিগকে যে সুপথ দেখাইয়াছেন তজ্জন্য তোমরা আল্লাহকে মহিমান্বিত কর এবং যেন তোমরা কৃতজ্ঞ হও। ….১৮৭। রোজার রজনীতে তোমাদের স্ত্রী সমক্ষে অনাবৃত হওয়া তোমাদের জন্য বৈধ করা হইল; তাহারা তোমাদের জন্য আবরণ এবং তোমরাও তাহাদের জন্য আবরণ; তোমরা যে নিজেদের ক্ষতি করিতে ছিলে, আল্লাহ তাহা পরিজ্ঞাত আছেন; এ জন্য তিনি তোমাদের প্রতি প্রত্যবৃত হইলেন এবং তোমাদিগকে ক্ষমা করিলেন; অতএব এক্ষণে তোমরা তাহাদের সহিত সম্মিলিত হও এবং আল্লাহ তোমাদের জন্য যাহা লিপিবদ্ধ করিয়াছেন তাহা অনুসন্ধান কর এবং প্রত্যুষে কৃষ্ণসূত্র হইতে শুভ্রসূত্র প্রকাশিত হওয়া পর্যন্ত তোমরা ভোজন ও পান কর; অতপর রাত্রি সমাগম পর্যন্ত তোমরা রোজা পূর্ণ কর ; এবং তোমরা মসজিদে ‘এতেকাফ’ করিবার সময় তাহাদের সহিত সংসর্গ করিবেনা, ইহাই আল্লাহর সীমা , অতএব তোমরা উহার নিকটবর্তী হইওনা ; এইরূপে আল্লাহ মানবগণের জন্য তাহার নিদর্শন বিবৃত করেন—-যেন তোমরা সংযত হও।’ (সুরা বকর)।

এই নির্দেশনার মাধ্যমে মুসলমান বালেগ নর-নারীর জন্য রমজান মাসে রোজা রাখা ফরজ করা হয়েছে। হযরতআবু হোরায়রা (রা) বলেনঃ ‘রাসুলুল্লাহ (সাঃ আঃ) বলেছেন , যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা এবং মিথ্যাচার ছাড়েনি, তার খানাপিনা ছেড়ে দেওয়াতে আল্লাহর কোনো কাজ নেই’। হযরত আয়েশা (রা) বলেনঃ ‘রাসুলুল্লাহ (সাঃ আঃ) রোজা অবস্থায়ও আমাদের চুম্বন করতেন ও আমাদের দেহে দেহ মিলাতেন; কিন্তু তিনি তোমাদের অপেক্ষা অধিকতর সংযমী ছিলেন।’ (হাদিসনং ঃ ১৯০২ ও ১৯০৩, মেশকাত শরীফ)। রমজান মাসে রোজা পালনের সাথে সাথে প্রতি রাতে তারাবীহর নামাজ পড়তে হয়, এই নামাজ সুন্নত। এভাবে রমজান মাসের দিনে ও রাতে মুসলমান নর-নারীদেরকে ইবাদত-বন্দেগীতেই মশগুল থাকতে হয়। শাওয়াল মাসের চাঁদ উদিত হবার সাথে সাথে রমজান মাসের সমাপ্তি ঘটে। সেই সাথে অবসান ঘটে রোজা পালনের। রমজান মাসের এক মাস রোজারাখাসহ ইবাদত-বন্দেগী ও কৃচ্ছতা সাধনের বিধান সফলভাবে প্রতিপালনের আনন্দের বার্তা বয়ে আনে শাওয়াল মাসের চাঁদ। এই দিনটা মুসলমান নর ও নারীদের জন্য আনন্দের। এই দিনে রোজা রাখা হারাম। এই দিনের আনন্দ পালন করতে হয় ধনী-নির্ধন সবাই মিলে। এ জন্য গরিবদের মাঝে ফিৎরা প্রদানের বিধান রয়েছে।

হযরত ইবনে উমর (রা) বলেন ঃ ‘রসুলুল্লাহ ( সাঃ আঃ ) মুসলমান দাস ও স্বাধীন ব্যক্তি পুরুষ ও রমনী এবং বালক-বালিকা ও বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের উপর ছদকায়ে ফিতর (রোজার ফিতর) এক-ছা যব নির্ধারণ করে দিয়েছেন । তিনি এটাও আদেশ দিয়েছেন যে , লোকদের (ঈদের) নামাজে যাওয়ার পূর্বেই যেন তা আদায় করা হয়। ’ (হাদিস নং ১৪০৫, বোখারী শরীফ)। হযরত ইবনে আব্বাস বলেন ঃ ‘ রাসুলুল্লাহ (সাঃ আঃ) সাদকায়ে ফিতর নির্ধারণ করেছেন রোজাকে অনর্থক কথা ও অশ্লীল ব্যবহার হতে পবিত্র করার এবং গরীবদের মুখে অন্ন দেবার জন্য।’ (হাদিসনং ১৭২৬, মেশকাত শরীফ)। ঈদের দিন সকালেও যে শিশু জন্ম গ্রহণ করবে তার জন্যও সাদকায়ে ফিতর আদায় করতে হবে।
ঈদের দিন সকালে উন্মুক্ত ময়দানে জামাতে দু’রাকাত নামাজ আদায় করতে হবে। হযরত আনাস ইবনে মালেক (রাঃ) বলেন ঃ ‘ রাসুলুল্লাহ (সাঃ আঃ) ঈদুল ফিতরের দিনে বেজোড় সংখ্যক খেজুর খেয়ে ঈদগাহে যেতেন।’ হযরত ইবনে উমর হতে বর্ণিত ঃ ‘ নবী করীম (সাঃ আঃ) যখন প্রত্যুষে ঈদগাহে যেতেন , তখন তাঁর সামনেই ছোট ছোট বর্শা নেওয়া হতো এবং সেগুলো তাঁর সামনেই ঈদগাহে রাখা হতো । তারপর তিনি তা সামনে রেখে নামাজ পড়তেন।’ হযরত উম্মে আতিয়্যাহ (রা) হতে বর্ণিত ঃ ‘ঈদের দিন আমাদেরকে ঘর হতে বের হওয়ার আদেশ দেওয়া হত। আমরা কুমারী বালিকা এমনকি ঋতুবতী নারীদেরকেও ঘর হতে বের করতাম । অতঃপর পুরুষদের পিছনে থেকে তাদের তাকবীরের সাথে সাথে তাকবীর পড়তাম এবং তাদের দোয়ার সাথে সাথে আমরাও ঐদিনের বরকত এবং গুনাহ হতে পবিত্রতা লাভের বাসনায় দোয়া করতাম।’ তিনি এ প্রসঙ্গে আরো বলেছেনঃ ‘ ঈদের উদ্দেশ্যে আমাদেরকে সাবালেগা পর্দানশীন মহিলাদেরকে নিয়ে যাবার জন্য আদেশ করা হত।’ হযরত হাফসা হতে বর্নিত ঃ ‘ ঈদগাহে ঋতুবতী মহিলাদেরকে পৃথক রাখা হত।’ হযরত ইবনে আব্বাস (রা) হতে বর্ণিতঃ ‘ আমি নবী করীম (সাঃ আঃ) এর সাথে ঈদুল ফিতর বা ঈদুল আজহার দিন বের হলাম । তিনি নামাজ আদায় করলেন তারপর খুৎবাহ্ দান করলেন , তারপর মহিলাদের নিকট গিয়ে উপদেশ দিলেন , নছীহত করলেন এবং তাদেরকে দান-ছদকা করতে আদেশ দিলেন।’ হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন বলেন ঃ ‘ নবী করীম (সাঃ আঃ) ঈদের দিন বাড়ি প্রত্যাবর্তনকালে ভিন্ন পথে আসতেন। ( হাদিস নং ৮৯৯, ৯১৫, ৯১৭, ৯১৮, ৯১৯ ও ৯২৯ বোখারী শরীফ)।

আমাদের সমাজে মহিলাদের ঈদগাহে নামাজ পড়ার প্রচলন নেই বললেই চলে। রাজধানী ঢাকাতে বিশেষ ব্যবস্থায় মহিলাগণ ঈদের জামাতে শরিক হন। বরিশালের উজিরপুর উপজেলায় অবস্থিত ‘গুঠিয়া বায়তুল আমান জামে মসজিদে’ ও ঝিনাইদহে ‘সার্কিট হাউস জামে মসজিদে’ মহিলাদের ঈদের জামাতে নামাজ পড়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
ঈদ ধনী-নির্ধন সকলের মিলিত উৎসব। কিন্তু বাংলাদেশে বৈষম্যমূলক সামাজিক ব্যবস্থার কারণে ঈদের দিনে এই বৈষম্য প্রকটভাবে দেখা যায়। কিছু উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা, সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যবসায়ী এবং ‘কোটারী’ভুক্ত রাজনীতিবিদের হাতে অঢেল সম্পদ থাকলেও ব্যাপক জনগোষ্ঠি অভাব-অনটনের মধ্যেই দিন কাটায়। এই জনগোষ্ঠির জীবনে ঈদ বাস্তবিক অর্থে আনন্দ বয়ে আনেনা। এ থেকে পরিত্রাণের জন্য আমাদেরকে উৎপাদনের সকল উৎসকে সামাজিক মালিকানায় আনতে হবে এবং এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে প্রদেশ গঠন করে ফেডারেল রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। বিচার ব্যবস্থাকে বিকেন্দ্রীকরণ করে প্রতিটি বৃহত্তর জেলায় হাইকোর্ট বেঞ্চ স্থাপন করতে হবে। বৃটিশ আমলে তাদের স্বার্থে প্রনীত ‘ফৌজদারী কার্যবিধি’(ঈড়ফব ড়ভ ঈৎরসরহধষ চৎড়পবফঁৎব ড়ভ ১৮৯৮) ; ‘দেওয়ানী কার্যবিধি ’ (ঈড়ফব ড়ভ ঈরারষ চৎড়পবফঁৎব ড়ভ ১৯০৮ ) ‘দেওয়ানী আদালত আইন’ ((ঈরারষ ঈড়ঁৎঃং অপঃ ড়ভ ১৮৮৭ ))সহ অন্যান্য আইনের ব্যাপক সংস্কার করে জেলা ও দায়রা জজসহ অধস্তন আদালতের বিচারকদের ‘বৈচারিক’ এখতিয়ার বাড়াতে হবে। এভাবেই শ্রমজীবী কর্মজীবী পেশাজীবী জনগণ তাদের ন্যায্য অধিকার অর্জন করতে পারবে। তখনই ঈদ প্রকৃত অর্থে তাদের জীবনে বয়ে আনবে অনাবিল আনন্দ।

বর্তমানে রাজশাহীর সমাজ জীবনে দেখা যায় পবিত্র ঈদ উল ফিতরকে কেন্দ্র করে হাট বাজার বিপনি বিতানে ক্রেতা সাধারণের উপচে পড়া ভিড়। একই সাথে রয়েছে ভিক্ষুক দের ব্যাপক আনা গোনা । অভাব কোন আইন মানতে সহায়তা করে না। নিরন্ন অভাবী মানুষেরাও করুণা ভিক্ষা করে , কেউ অভাবের তাড়নায় বিপথগামী হয়। এরফলে ক্রেতা সাধারণের কেউ বাজারে এসে বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে, আবার বিপথগামী অভাবী কেউ হাতে নাতে ধরা পড়ে গণপিটুনি খেয়ে ধিকৃত ও লাঞ্ছিত হয়। ফিতরা এদের অভাব মেটাতে পারে না , কারণ ফিতরা নির্ধারণের সময় তার পরিমাণ কত কম করা যায় সে দিকেই সবার নজর এবং সতর্কতা থাকে। জাকাত দেবার সময়ও সব চেয়ে নি¤œমানের শাড়ি লুঙ্গি বাছাই করা হয়। নেসাবীদের কেউ কেউ এই সব শাড়ি লুঙ্গি ঘটা করে বিতরণ করে । ভিড়ের মধ্যে পড়ে কোন কোন সময় পদ দলিত হয়ে কেউ কেউ ইহধাম ত্যাগ করে।

তারাবীহর পরে নেকবত মিয়াকে দেখা যায় নিক মৌরসী ভিটায় ফিরে এসে প্রপিতামহকে স্মরণ করে কান্নাকাটি করে এবং পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে মোনাজাত করে বলে এই মৌরসী ভিটা মাটি যেন রক্ষা পায় । এর কারণ হচ্ছে কিছু দিন হলো তার এবং তার প্রতিবেশীদের বাড়ী ঘর ‘সরকারী লোকজন’ মাপ জোক করছে । মুখে কিছু বলছে না , তবে লোক মুখে রটেছে এসব বাড়ী ঘরের অংশ বিশেষ সরকারের মালিকানাধীন না হলেও তা ভেঙ্গে দিয়ে রাস্তা বা অন্য কিছু করা হবে। এক অংশ ভাঙ্গা পড়লে গোটা বসত বাড়ীই বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। জনগণকে স্মৃতিময় বাস্তভিটা থেকে উচ্ছেদ বা আংশিক উচ্ছেদ করে জনস্বার্থ হাসিল হতে পারে না। ‘সরকারী লোক’ বলে পরিচয় দানকারী এসব লোকজনের কর্মকান্ড বিশেষ ব্যক্তি বা গোষ্ঠির স্বার্থ সিদ্ধির জন্য করা তা নিয়ে প্রতিবাদ মুখর মহল্লার জায়গীর আলী , নছরুদ্দিন, শহিদ খান, হোসনে আরা , ডেইজী বেগম প্রমুখ।

নদীর ভাঙ্গনে ভিটা মাটি হারিয়ে জরীপ উদ্দিন খাস জমিতে বাড়ী করে বাস করতো । নিজে রিকসা চালায় আর স্ত্রী পরিজান বাড়ী বাড়ী ঝি এর কাজ করে , দুজনের আয়ে তাদের সংসার চলছিল । পুত্র আতর আলী ও কন্যা নূর জাহান স্কুলে পড়াশুনা করতো। একদিন হঠাৎ সরকারী লোকজন এসে বাড়ী ঘর ভেঙ্গে দেয়। জরীপ-পরিজান পরিবারসহ অনেকেই এখন উদ্বাস্ত। খাস জমির উপরস্থ সবার বাড়ী ঘর ভাঙ্গলেও কারো কারো বাড়ী ঘরে অভিযান চালানো হয়নি , এ নিয়ে অনেক কথা রটেছে । ভুলু মুনশির নিজের বাড়ী ঘর থাকলেও রাস্তার পাশের সরকারী জমিতে সে চা এর দোকান দিয়ে সংসার চালাতো। তার দোকানটাও ভেঙ্গে দিয়েছে সরকারী লোকজন বুল ডোজার দিয়ে । আয়ের উৎস হারিয়ে সে আজ বেকার , অনাহারী।
প্রাগুক্ত জনগোষ্টির জীবনে এবারের ঈদ কি খুশীর বার্তা নিয়ে আসবে।
কল্যাণকর সুশাসিত অংশীদারিত্বের গণতান্ত্রিক দেশ গড়ার মধ্য দিয়েই সকল জনগোষ্ঠির জন্য আনন্দময় ঈদ উদযাপন সম্ভব ।
এবারের ঈদুল ফিতরে এই লক্ষ্য অর্জনের সংগ্রামের শপথ নিয়ে তার সফলতা কামনাই হোক ঈদের জামাতে আল্লাহর দরবারে আমাদের মোনাজাত।
লেখকঃসাবেক জেলা ও দায়রা জজ।