আমলাতন্ত্র, গণতন্ত্রের শত্রুই বটে

বহুকাল ধরে এ দেশের মানুষ আমলাতন্ত্রের অধীনে থেকেছে। আমলাতন্ত্রের স্বভাব এই যে, সে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানকে সহ্য করতে চায় না, হয় গ্রাস করে নেয়, নয় তো নষ্ট করে দেয়। আমলাতন্ত্রের অধীনে বিকল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন কখনো কার্যকর হয়নি এবং তা আমলাতন্ত্রের অধীনেই থেকেছে, বরাবর। করুণ হলেও সত্য এটা যে, এখানকার মানুষ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক
হওয়ার তুলনায় যে কোনো অফিসের পিয়ন হওয়াকে বড় মনে করেছে।
—————————————————————————–ইংরেজরা যখন চলে গেল তখন কার হাতে ক্ষমতা দিয়ে গেল তারা, পাকিস্তানে? না, আমলাদের হাতে দিয়ে গেল এটা আমরা হুট করে বলব না। কেননা ক্ষমতা তো তারা দিয়ে গেছে রাজনীতিকদের হাতেই, তবে কারা ছিলেন এই রাজনীতিক সেটা একটু দেখতে হবে।

প্রথম কথা, কংগ্রেস যেমনভাবে ইংরেজের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে মুসলিম লীগ তেমনভাবে করেনি। কংগ্রেসের প্রধান প্রতিপক্ষ ছিল ইংরেজ, লীগের কংগ্রেস। ফলে লীগ নেতৃত্ব ইংরেজের (যা ছিল মূলত আমলাতান্ত্রিক) বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেনি।

দ্বিতীয়ত, লীগ নেতারা আমলা না হলেও আমলামনস্ক ছিলেন। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পেশায় আইনজীবী ছিলেন, কিন্তু তিনি যে স্বাধীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী না হয়ে গভর্নর জেনারেল হলেন, এ ঘটনা মোটেই তাৎপর্যহীন নয়। তিনি মুসলিম লীগ ও তার নির্বাহী পরিষদের কথা বলতেন ঠিকই, কিন্তু মনের গভীরের কথাটিই মনে হয় একবার বলে ফেলেছিলেন, যখন বলেছেন যে, তিনি মুসলিম লীগ চেনেন না, পাকিস্তান তৈরি করেছেন তিনি তার ব্যক্তিগত সহকারী ও একটি টাইপরাইটারের সাহায্যে।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সময়ে মুসলিম আইসিএসের সংখ্যা ছিল অল্প, কিন্তু ফিন্যান্স সার্ভিসে দুজন ছিলেন যারা খুবই প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিলেন।

এরা হচ্ছেন গোলাম মোহাম্মদ ও চৌধুরী মোহাম্মদ আলী। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান নিহত হন সামরিক আমলাতন্ত্রের চক্রান্তে; তার মৃত্যুর পর বড় আমলা গোলাম মোহাম্মদ অর্থ সচিবের পদ থেকে উঠে গভর্নর জেনারেল হয়ে বসেন এবং নির্বাচিত গণপরিষদ ভেঙে দেন। এর পরে অপর প্রভাবশালী আমলা চৌধুরী মোহাম্মদ আলী (শুরুতেই যিনি ছিলেন পাকিস্তান সরকারের সেক্রেটারি জেনারেল) প্রধানমন্ত্রী হয়ে বসেন। বগুড়ার মোহাম্মদ আলী রাজনীতি ছেড়ে আমলা হয়েছিলেন, হয়ে ওয়াশিংটন গিয়েছিলেন রাষ্ট্রদূতের চাকরি নিয়ে, সেখান থেকে এসে তিনিও এক সময়ে প্রধানমন্ত্রী হলেন।

ইস্কান্দর মির্জা ছিলেন সামরিক আমলা, প্রথমে ছিলেন প্রতিরক্ষা সচিব, পরে হলেন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর এবং আরো পরে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট। এই আমলার অধীনে এ কে ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতো রাজনীতিক বিনা প্রতিবাদে ও স্বেচ্ছায় দিব্যি কাজ করেছেন। এসব বাইরের ঘটনা। ভেতরের পাকিস্তানের আসল শাসক সব সময়েই ছিল আমলাতন্ত্র। জিন্নাহ সাহেবকে পর্যন্ত এই আমলাতন্ত্র অবহেলা করেছে; তিনি মারা যান অবজ্ঞাতেই। ১৯৫৭ সালে সামরিক আমলাতন্ত্র চলে এল সরাসরি। বেসামরিক আমলাতন্ত্র ভূমিকা নিল সহযোগী শক্তির।

এই আমলাতন্ত্র ছিল সাম্রাজ্যবাদকবলিত। এর শিক্ষাদীক্ষা কতটা যে ছিল সাম্রাজ্যবাদমুখী তার একটি প্রমাণ আছে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে। আমরা জানি, ১৯৫৬ এবং ১৯৬২Ñ এই দুই সংবিধানেই উর্দু ও বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকার করে নেয়া হয়েছিল। কিন্তু ১৯৫৬-এর সংবিধানে বলা হয়েছিল, আরো বিশ বছর ইংরেজিই চলবে; ১৯৬২ সংবিধানে বলা হয়েছিল দশ বছর পরে ১৯৭২ সালে একটি কমিশন গঠন করা হবে যার বিবেচ্য বিষয় হবে ইংরেজির বদলে উর্দু ও বাংলা প্রচলন করা যায় কিনা। ইংরেজির প্রতি এই আকর্ষণ আমলাতন্ত্রেরই আদর্শ, যে আমলাতান্ত্রিক আদর্শ স্বাধীন বাংলাদেশে এখনো বিদ্যমান এবং যার দরুণ বাংলাদেশে বাংলাভাষা এখনো সর্বত্র প্রচলিত নয়।

আমলাতন্ত্র কীভাবে মানুষকে জব্দ করতে পারে তার একটি করুণ দৃষ্টান্ত এ কে ফজলুল হকের রাজনৈতিক জীবন। ১৯০৬ সালে তিনি যুক্ত ছিলেন মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠার সঙ্গে। এরপরেই তিনি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে গেলেন। তারপর পদোন্নতি না হওয়ায় ১৯১১ সালে ওকালতি শুরু করলেন। ১৯৩৭-এ তিনি বাংলার প্রধানমন্ত্রী, ১৯৪০-এ লাহোর প্রস্তাব যিনি উত্থাপন করেন। সেই হক সাহেবকে দেখি ১৯৪৭-এর পর ঢাকায় এসে মুসলিম লীগ সরকারের অধীনে অ্যাটর্নি জেনারেলের চাকরি গ্রহণ করেছেন।

১৯৫৪-এ তিনি যুক্তফ্রন্টের নেতা, পরে মুখ্যমন্ত্রী, তারপরে পদচ্যুত হলেন এবং অবশেষে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হলেন। এই যে একবার রাজনীতিক, একবার আমলা এবং শেষ পদ আমলারাই- এ গতিধারা অত্যন্ত মর্মান্তিক অবশ্যই, কিন্তু বোধকরি অস্বাভাবিক নয়, কেননা আমলাতন্ত্রের ক্ষমতা ছিল এমনকি অত্যন্ত শক্তিশালী মানুষকেও দুর্বল করে ফেলবার, রাজনীতিককে ডেপুটি এবং মুখ্যমন্ত্রীকে একবার অ্যাটর্নি জেনারেল ও আরেকবার গভর্নর করবার।

স্মরণীয় যে, সেকালে পূর্ববঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমীনের চেয়ে অনেক বেশি শক্তি রাখতেন মুখ্য সচিব আজিজ আহমদ, যিনি পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছিলেন। ১৯৭১-এ পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক বাহিনীর প্রধান ছিলেন সাহেবজাদা ইয়াকুব খান, পরে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হলেন পাকিস্তান সরকারের। আমাদের সামরিক প্রশাসক ছিলেন সামরিক আমলা জেনারেল টিক্কা খান, পরে তিনি গভর্নর হলেন পাঞ্জাবের।

১৯৫২ সালে ঢাকায় ছাত্রদের ওপর গুলি চালানোর ব্যাপারে উদ্যোগী ছিলেন যে পুলিশ অফিসার পরে তিনিই রাজসাক্ষী হন ভুট্টোর বিরুদ্ধে জিয়াউল হকের মামলায়। আইয়ুব খান শুরুতে পূর্ববঙ্গের জিওসি ছিলেন, পরে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হলেন। এ রকম অসংখ্য দৃষ্টান্ত দেয়া যাবে এ সত্য প্রমাণের যে, আমলারাই ছিলেন আসল শাসক- পাকিস্তানের।

সাতচল্লিশের পরে পূর্ববঙ্গের অবস্থা ছিল আরো করুণ। আইসিএস বলতে বাঙালিদের মধ্যে কেউ ছিল না; অবাঙালি আইসিএসরা এসে রাজত্ব শুরু করেছিল। সেকালের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিন্যাস আলোচনা করলে দেখা যাবে, সব ক্ষমতা আমলাদের হাতে। স্থানীয় আমলা স্থানীয় মুসলিম লীগ কর্মকর্তাদের কাজকর্মের ওপর রিপোর্ট পাঠাতেন ওপরে। দুটি ঘটনার উল্লেখ করা যায় বিশেষভাবে। একটি সিলেটের অপরটি বরিশালের। আসাম প্রাদেশিক মুসলিম লীগের এক সময়ের কাউন্সিলর ছিলেন কাজী মুহিবুর রহমান। ‘ব্যক্তিগত কারণে’ সিলেটের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন এবং তাকে জেলে পাঠিয়ে দেন। ব্যক্তিগত কারণটি নাকি এই যে, লোকটির ধৃষ্টতা হয়েছিল ম্যাজিস্ট্রেটের বিরুদ্ধে কমিশনারের কাছে বলার। মুহিবুর রহমান জেলে গেলেন ঠিকই, কিন্তু এই অপমান সহ্য করা তার পক্ষে কঠিন হলো। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন এবং কয়েকদিন পরে ভগ্ন হৃদয়ে মারা গেলেন। বরিশালের ঘটনাটি একটু ভিন্ন ধরনের। তবে ভেতরে একই। ১৯৪৮-এর ১৪ আগস্ট সেখানে স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের আয়োজন করা হয়েছিল, যেমনটি হওয়ার কথা। প্রশ্ন উঠল অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব কে করবেন। মুসলিম লীগের স্থানীয় নেতারা বলছেন, জেলা মুসলিম লীগের সভাপতিরই ওই সম্মান প্রাপ্য। কিন্তু ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট মনে করছেন, তারই সভাপতিত্ব করা উচিত। এই সমস্যার সমাধানের জন্য ম্যাজিস্ট্রেট গোপনে একটি টেলিগ্রাম পাঠালেন মুখ্য সচিবের কাছে, সচিব যাতে বলে দেন যে, ম্যাজিস্ট্রেটই ওই সম্মান পাবে। এই দুই ঘটনা দৃষ্টান্ত মাত্র। মূল ঘটনা হলো রাজনৈতিক শক্তির ওপর আমলাতান্ত্রিক শক্তির আধিপত্য। রাজনৈতিক শক্তি ছিল অসংগঠিত। আমলাতন্ত্র রাজনীতি করত না, কিন্তু করতও। করত এই অর্থে যে, প্রকৃত ক্ষমতা ছিল তাদের হাতেই। রাজনৈতিক ক্ষমতা পরিবর্তনশীল, আমলাতান্ত্রিক ক্ষমতা চিরস্থায়ী। জনগণ জানত সেটা। জনগণ রাজনীতিকদের বিশ্বাস করত না, আমলাদের করত। করত দুই কারণে। প্রথমত, আমলারা শক্তিশালী। দ্বিতীয়ত, আমলারা অস্থানীয়, সে কারণে রহস্যময় ও গৌরবান্বিত। রাজনীতিকরা স্থানীয়দের নিয়ে দলাদলি করে, আমলারা ‘নিরপেক্ষ’ থাকে। এই ধারণার অন্তরালে সত্য অবশ্যই ছিল এই রকমের যে, আমলাতন্ত্র অত্যন্ত সুগঠিত একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, যা মোটেই নিরপেক্ষ নয়।

বহুকাল ধরে এ দেশের মানুষ আমলাতন্ত্রের অধীনে থেকেছে। আমলাতন্ত্রের স্বভাব এই যে, সে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানকে সহ্য করতে চায় না, হয় গ্রাস করে নেয়, নয় তো নষ্ট করে দেয়। আমলাতন্ত্রের অধীনে বিকল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন কখনো কার্যকর হয়নি এবং তা আমলাতন্ত্রের অধীনেই থেকেছে, বরাবর। করুণ হলেও সত্য এটা যে, এখানকার মানুষ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার তুলনায় যে কোনো অফিসের পিয়ন হওয়াকে বড় মনে করেছে। যে কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে একজন আমলা যে মর্যাদা পেয়েছেন অন্য কোনো পেশার বা ব্যবসায়ের কোনো লোক তা পাননি, সে তিনি যেই হোন। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতেও এটি ব্যক্তিক্রম প্রতীয়মান হয়নি। স্বাধীন দেশেও আমলাতন্ত্র অত্যন্ত শক্তিমত্তায় দৃশ্যমান।

রাজনীতিকরা কিংবা ক্ষমতাসীন সরকারও বরাবরই অতীতের ধারাবাহিকতায় সামরিক, বেসামরিক, আমলাতন্ত্রের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। জনগণের ওপর নয়। সরকারের টিকে থাকার পেছনে জনগণ নয় আমলাদের ভূমিকাই প্রধান। তাই সর্বত্র আমলাতন্ত্রের জয়-জয়কার। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় আমলাতন্ত্র অন্তরায় অবশ্যই। সেটা পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসই সাক্ষ্য দেয়। আমাদের অবস্থাটাও যদি তথৈবচ হয় তাহলে গণতন্ত্রের অভিযাত্রা ব্যাহত তো হবেই, হবে বিপদাপন্নও, এ সত্যটি অস্বীকারের উপায় কিন্তু নেই।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।